নরসিংদী প্রতিনিধি : নরসিংদীতে পাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য কমছে না। নানা প্রতারণার ফাঁদ পেতে এসব চক্র দিনের পর দিন মানুষ পাচার করছে। দালালদের প্রলোভনে কেউ কেউ হচ্ছেন জিম্মি, কেউবা আবার সর্বশান্ত। আবার কেউ ফিরছেন লাশ হয়ে। ঠেকানো যাচ্ছে তাদের। এসব কারণে দুর্ঘটনায় পতিত কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের স্বজনদের আহাজারী-উৎকণ্ঠা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। পরিবারের লোকজন আপনজনকে ফেরত পাওয়ার অনিশ্চিত শঙ্কায় অপেক্ষমান।
নরসিংদী সদর উপজেলার ভাগদী এলাকার জাহিদুল। দুই ভাই মা-বাবা আর ছোট বোনের সংসারের হাল ধরতে ১৯ বছর বয়সে ৭ মাস আগে অবৈধ পথে পাড়ি জমায় মলোয়েশিয়ায়। কিন্তু দালালের দৌরাত্ম্য পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে পেরেছেন কি না! তার খবর কেউ যানে না। বৃদ্ধ বাবা-মা টাকার মায়া ভুলে এখন কেবল তাদের ছেলের সন্ধান চায়। কারো কারো পক্ষ থেকে আবার বলা হচ্ছে তিনি মালোয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন।অভিবাসীমালোয়েশিয়ায় নিখোঁজ জাহিদুলের বাবা জানায়, তার ছেলের সঙ্গে গত ৭ মাস ধরে কোনো কথা বলতে পারছেন না। হত দরিদ্র পরিবার হলেও তারা টাকার মায়া ছেড়ে এখন তাদের ছোট ছেলেকে ফেরত চায়। সেই সঙ্গে তার বাবা বিল্লাল খন্দকার ও ভাই ইমরান খন্দকারও একই দাবি জানিয়েছেন।
নরসিংদীর সদর, শিবপুর ও রায়পুরা উপজেলা এখন যেন পাচারকারীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। দিনদিন বেড়েই চলেছে পাচারকৃত মানুষের সংখ্যা। এদের কারো ভাগ্যে জুটেছে মর্মান্তিক মৃত্যু। আবার কারো মিলছে না কোনো হদিস। বিদেশে স্বামীর মৃত্যুর খবরে বাঁধ ভাঙা কান্না তাই গৃহিণীর চোখে। কেউ ভাই হারিয়ে দিশেহারা।
শিবপুরের খাদিজার স্বামী হান্নান দুই সন্তান রেখে মালোয়েশিয়ায় গিয়ে নিহত হয়েছেন। এখন তার পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও কেবল কান্নাকেই শেষ সম্বল হিসেবে বেছে নিয়েছেন খাদিজা।অভিবাসীতেমনি আরেক বোন রায়পুরা উপজেলার আদিয়াবাদ এলাকার শাহিনুর। তার ছোট ভাই আরমান অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া এ শিক্ষার্থী দালালের খপ্পরে পড়ে পাড়ি জমিয়েছেন মলোয়েশিয়ায়। কিন্তু মাঝ পথে থাইল্যান্ডে গিয়ে জিম্মি হয়েছেন দালালের হাতে। সেই সঙ্গে একাধিকবার দালালের হাতে টাকা তুলে দিয়েও খোঁজ মিলছে না তার সহোদর ও চাচাতো ভাইয়ের। এমন অনেক ছেলে হারা মা-বাবা, ভাই-বোনসহ আত্মীয় স্বজন রয়েছেন যারা তাদের স্বজনদের ফিরে আসার না জানা শঙ্কায় অপেক্ষমান। তাদের খবর আমাদের এমন কি পুলিশের খাতায়ও নেই।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালে জেলায় মানবপাচার মামলা হয়েছে ৩২টি, আর এবছর মাত্র ৪ মাসেই মামলা হয়েছে ১৩টি। যা প্রকৃত পাচার সংখ্যার তুলনায় নগন্য।
মানবপাচার রোধে গণমাধ্যমসহ সীমান্ত এলাকার আইনশৃংখলা বাহিনীকে আরো কঠোর দায়িত্ব পালন করতে হবে উল্লেখ করে জেলা পুলিশের কর্ণধার পুলিশ সুপার আমেনা বেগম বলেন, ‘মূলত যারা অবৈধ পথে মালোয়েশিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছে তারা কোনোভাবে কিছু টাকা সংগ্রহ করতে পারলেই অজান্তে এমনকি পরিবারকেও না জানিয়ে বিদেশ পাড়ি জমায়। দালালদের খপ্পরে পড়ে কেউ জিম্মি হচ্ছে, কেউ নিহত হচ্ছে আবার কারো কোনো খবর পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে তিনি দায়ী করলেন সচেতনতাকে। যদি সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায় তাহলে এমন সমস্য দূর করা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন তিনি। অভিজ্ঞ মহলের মতে, মানবপাচারকে নির্মূল করতে হলে এসব চক্রের মূলহোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির বিধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে ভূক্তভোগী পরিবারের দাবি অন্তত তাদের স্বজনদের ফিরিয়ে আনা হোক।

