অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : আয়করকে রাজস্ব আহরণের প্রধান খাত ধরে গত কয়েক বছরের মতো আগামী অর্থবছরের জন্যও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাজস্ব আহরণের চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটির টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআর কর্তৃপক্ষ এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বললেও, এটিকে অবাস্তব বলে মনে করেছেন অর্থনীতবীদরা। তারা মনে করছেন, করের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনায় এ লক্ষ্যমাত্রাকে এনবিআর ইতিবাচক দেখলেও তা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও একটি অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে এনবিআর।
এনবিআর সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার এ লক্ষ্যমাত্রা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনের পর তা অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবনায় পেশের জন্য প্রস্তুত করা হবে। রাজস্ব আহরণের ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আয়কর খাতে ৬৫ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাটে ৬৩ হাজার ৯০২ কোটি টাকা ও আমদানি রপ্তানি পর্যায়ে শুল্ক খাতে ৪৬ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় কখনো হয়নি, এবারেও হবে না। আসলে এখনকার বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা। কেননা আপনারা দেখেছেন, গত কয়েক বছর ধরে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও শেষ বেলায় এসে তা থেকে সরে এসেছে এনবিআর।’
দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে পরে কমাতে হয়েছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির বিচার করে ১৫ কোটি টাকা কমাতে হয়েছে। এরপরও এবার ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা অবাস্তবের ধারাবাহিকা রক্ষারই নামান্তর।
মির্জা আজিজুলের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে এক এনবিআর কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েক বছর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। তবে আগের সব বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি বেশ ভালো ছিল। আগামী অর্থবছর থেকে রাজস্ব আহরণের সব ক্ষেত্রে সহজতর ও ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। করের আওতা বাড়ানো হবে। আর রাজস্ব আহরণে গতি বাড়ানোর জন্যই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব।
এনবিআর সূত্র মতে, চলতি বছরের শুরুতে ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল এনবিআর। এর মধ্যে মূসকে ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, আয়করে ৫৬ হাজার ৫৮০ কোটি, শুল্কে ৩৫ হাজার ৭২০ কোটি ও অন্যান্য কর বাবদ ৯২০ হাজার কোটি টাকা। পরে বছরের প্রথম ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৭ শতাংশ অর্জিত হওয়ায় তা থেকে সরে আসে তারা। এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ১৪ হাজার ৭২০ কোটি টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১১ হাজার কোটি কমিয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যা বছরের শুরুতে নেওয়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ দশমিক ০৮৮ শতাংশ কম। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ লাখ ১২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৬১৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সে বছর ঘাটতি ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।

