ঢাকাFriday , 22 May 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ‘অদক্ষ’: বিচারপতিদের মত

Link Copied!

tribunalনিজস্ব প্রতিবেদক : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্য সরবরাহে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। এমন অভিযোগ করেছেন খোদ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা। এসব মামলার শুনানি চলাকালে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা মামলার প্রসিকিউটর (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী) ও তদন্ত সংস্থাকে বারবার সতর্ক হয়ে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েও কিছুতেই কিছু না হওয়ায় নতুন মামলার পাশাপাশি পুরনো (রায় হওয়া) মামলাগুলো কতটুকু সুষ্টু তদন্তে পরিচালনা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
ইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার অদক্ষতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সদ্য আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুর মামলাটি। মামলাটির শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান। আর তার বিরোধীতা করে আসামিপক্ষে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার।
এ মামলার শুনানি চলাকালে আসামিপক্ষের আইনজীবী বিচারপতিদের সামনে তদন্ত সংস্থার অদক্ষতা প্রথম তুলে ধরেন।
মাহিদুর ও চুটুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের জেরা চলাকালীন সময়ে আইনজীবী আব্দুস সোবহান তরফদার ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘আসামী মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুসহ আরো কয়েকজনকে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংগঠিত অপরাধের মামলায় ১৯৭২ সালে সাজাপ্রাপ্ত হয়। সে সময় কলাবেরটরস স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল অর্ডার ১৯৭২ এর অধীনে তাদের বিরুদ্ধে ১১ (ক) ধারায় বিচার করা হয়। এ ছাড়াও দন্ডবিধির ৩৬৪/৩০২/১০৯ ধারা মোতাবেক তাদেরকে শাস্তি প্রদান করা হয়। আদালতের রায়ে মাহিদুর রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকিদেরকে বেকসুর খালাশ প্রদান করা হয়। পরে মাহিদুর রহমান তার সাজার বিরুদ্ধে এবং সরকারপক্ষের আইনজীবীরা বাকিদের সাজা চেয়ে হাইকোর্টে পৃথক দুটি আপিল করেন। হাইকোর্ট আপিল দুটি একসঙ্গে শুনে আসামি মাহিদুর রহমানের যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখেন এবং সরকারপক্ষের আপিল বাতিল ঘোষণা করেন।
অথচ দন্ডবিধি আইনে একই অপরাধের সাজা দুইবার হওয়ার কোনো বিধান না থাকা সত্ত্বেও একই অভিযোগে তদন্ত কর্মকর্তা এবং প্রসিকিউটররা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে তাদেরকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছে।
আসামিপক্ষের এমন সাবমিশনে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি প্রসিকিউটর সাইয়েদুর রহমানের ওপর ক্ষিপ্তভাব প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা এটা কি তদন্ত করে এনেছেন? বিচারকের (আসামীদেরকে) কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কেন সকল সুবিধা দেবেন না? আমাদের মনে রিজনেবল ডাউবট (যুক্তিযুক্ত সন্দেহ) হচ্ছে এর আগে অন্য মামলায় এমন ভুল হয়েছে কি না? আপনাদের (প্রসিকিউটরদের) কনডাক্ট (আচরণ) প্রমাণ করে তদন্ত অসম্পূর্ণ।’
এ সময় ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারপতিরা (বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান এবং বিচারপতি শাহিনুর রহমান) বলেন, ‘এমন অভিযোগে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড সাজা হতে পারে। আপনারা (প্রসিকিউটররা) কেন আগে আমাদেরকে এসব জানাননি।’
তবে বিচারপতিদের এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে প্রসিকিউটর সাইয়েদুল ইসলাম তাদেরকে বিষয়টি বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। যার ফলাফল হিসেবে উক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত তিনটি অভিযোগের মধ্যে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে তাদেরকে সাজা প্রদান করে অবশিষ্ট ৩ নম্বর অভিযোগে আসামিদের খালাস প্রদান করেন এবং ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে ‘অদক্ষ’ বলে মন্তব্য করেন।
তবে এমন সব অভিযোগ আর ভর্ৎসনার পরেও নিজেদের অদক্ষতা স্বীকার করতে নারাজ তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান। তিনি বলেন, ‘মাহিদুর ও চুটুর মামলার রায়ে তদন্ত সংস্থার অদক্ষতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে বলে যে অভিযোগ এসেছে, আমরা রায় দেখে বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখবো এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।’
শুধু এখানেই নয়। তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা এর আগেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আনিসুল হকের বাবা একেএম জহিরুল হক একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ছিলেন বলে জানিয়েছেন।
গত ২৪ মার্চ রাজধানীর ধানমণ্ডিস্থ সেফ হোম কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সানাউল হক সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। এসময় আব্দুল হান্নান খান সাংবাদিকদের জানান, একেএম জহিরুল হক একাত্তরে স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর অন্যতম শীর্ষনেতা ছিলেন। তার নাম রাজাকারের তালিকায় আছে। তা তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের জারি করা গেজেট নোটিফিকেশন দেখলেই জানা যাবে। তিনি বলেন, ‘আনিসুল হক মেয়র প্রার্থী হয়েছেন বলে তার বাবার বিরুদ্ধে একাত্তরের ভূমিকা সম্পর্কে তদন্ত করবো না আমি তা মনে করি না।’
পরে জ্যেষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক বলেন, ‘মেয়র প্রার্থী আনিসুল হকের বাবার বিরুদ্ধে একাত্তরের অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার যদি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় আমরা অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
তবে তিনি বলেন, ‘বাবার অপরাধের জন্য ছেলে দায়ী হবে কেন?’
সানাউল হক সাংবাদিকদের আরো বলেন, ‘আনিসুল হকের বাবা প্রথমে আনসার বাহিনীর সদস্য ছিলেন, পরে তাকে রাজাকার বাহিনীতে পাঠানো হয়। তখন পাকিস্তান সরকার গেজেটের মাধ্যমে আনসার বাহিনী থেকে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তর করে।’
তদন্ত কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিন ট্রাইব্যুনালের জ্যেষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক এক প্রেসনোটের মাধ্যমে বিষয়টি ‘ভুল তথ্য প্রকাশ’ নামে আক্ষা দেন। এই প্রেসনোটে তিনি আনিসুল হকের বাবার বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থার কাছে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কোনো তথ্য বা অভিযোগ নেই বরং তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রারম্ভেই দিনাজপুর জেলার অন্য সরকারি কর্তকর্তাদের সঙ্গে ভারতে যান এবং তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের অধীনে কর্মরত ছিলেন বলে জানানো হয়। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তাদের এমন ভুলের জন্য আনিসুল হক সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবাদ লিপি পাঠান। যার সূত্র ধরে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তাদেরকে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পলাতক সৈয়দ মো. হাসান আলী ওরফে হাছেন আলীকে নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ। মামলার শুনানি চলাকালীন সময়ে বিব্রতকর শুনানির কারণে প্রসিকিউটর মোহাম্মাদ আলীকে বারবার সতর্ক করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
এছাড়াও এ মামলার আসামী পলাতক থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়নি বলেও অভিযোগ করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। তিনি মামলার প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী ও তদন্ত কর্মকর্তা হরি দেবনাথকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এ মামলার আসামি পলাতক থাকায় আপনারা আসামির বিরুদ্ধে সুষ্ঠ তদন্ত না করে ইচ্ছামত শুনানি করে যাচ্ছেন। কিন্তু এভাবে করলে তো ট্রাইব্যুনালের বিচারব্যাবস্থা প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। তা ছাড়া আসামীরাও সঠিক বিচার পাবেনা।’
প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের আদেশের মাধ্যমে তদন্ত সংস্থার যে ভুল উঠে এসেছে তা আমাদের পরবর্তি মামলাগুলো পরিচালনায় সহায়ক হবে। আমরা তদন্ত সংস্থার সঙ্গে আরো সমন্বয় সৃষ্টি করে মামলায় যেন ভুলভাবে পরিচালনা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখবো।
এর আগে বহুবার ট্রাইব্যুনালে আসা মামলাগুলোতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তদন্ত সংস্থার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে মাহিদুর ও চুটুর মামলার মধ্য দিয়ে তদন্ত সংস্থাকে আঙ্গুল দিয়ে তাদের ভুল দেখিয়ে দেয়া হলো। তদন্ত সংস্থার ভুলের কারণে এর আগে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সাঈদীর মামলাটি আপিলে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় পায়। এর পরেও পুলিশ থেকে তদন্ত সংস্থায় নিয়োগ পাওয়া এসব তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের দক্ষতাকে কতটুকু প্রমাণ করতে পারবে তার ওপর নির্ভর করবে ট্রাইব্যুনালের পরবর্তি মামলাগুলোর রায়।