স্পোর্টস ডেস্ক : বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বিমানবন্দর কোনটা? রোববার কয়েক ঘণ্টার জন্য উত্তরটা স্রেফ লাস ভেগাস। পাখির চোখে দেখলে বিমানবন্দরে দাঁড়ানো প্রাইভেট জেটের সারির সঙ্গে সাইকেল স্ট্যান্ডের পার্থক্য পাওয়া যাবে না।
একটা বক্সিং লড়াইকে ঘিরে পুরো দুনিয়া যেন হঠাৎই মেতে উঠেছিল। লাস ভেগাসের এমজিএম এরিনায় দুনিয়ার বিখ্যাত কে উপস্থিত ছিলেন না? অস্কার, গ্র্যামি, এমি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেরা তিনটে উৎসবের দ্যুতি যোগ করা যাক। যে জৌলুস ধরা পড়বে, তার সঙ্গেই তুলনা হচ্ছিল রবিবারের এমজিএম এরিনাকে।
অভিনয়, ফ্যাশন, ক্রীড়া, সঙ্গীত জগতের রথি-মহারথিদের কে ছিলেন না রবিবারের ‘সিন সিটি’তে? ডেনজেল ওয়াশিংটন, বেন অ্যাফ্লেক, রবার্ট ডি নিরো, ড্রিউ ব্যারিমোর, জাস্টিন বিবার, বিয়ন্সে, জেজে, প্যারিস হিলটন, স্টেফি গ্রাফ, আন্দ্রে আগাসি… ইত্যাদি ইত্যাদি।
মোট ৩০ কোটি ডলার। মানে, ২৩৫০ কোটি টাকা! ‘শতাব্দীর সেরা’ তকমা পাওয়া বক্সিং-যুদ্ধের মোট মূল্য। লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত ফ্লয়েড মেওয়েদার বনাম ম্যানি প্যাকিয়া ‘র মধ্যে অনুষ্ঠিত হলো এই যুদ্ধ। লড়াই-পূর্ববর্তী চুক্তি অনুযায়ী দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ভাগ হয়েছে এই ৩০ কোটি।
প্যাকিয়াও পেয়েছেন প্রায় ১০ কোটি। আর মেওয়েদার প্রায় ২০ কোটি ডলার (ফলাফল যা-ই হোক, এই টাকাটাই পেতেন দু’জনে)! খেলাধুলার দুনিয়ায় স্রেফ একটা বক্সিং বাউটে এত টাকা কোনও দিন পেয়েছেন কেউ? লিওনেল মেসির সারা বছরের পারিশ্রমিক পাঁচ মিনিটে বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর এক সপ্তাহের পারিশ্রমিক মাত্র চার সেকেন্ডে জেতার সুযোগ কখনও এসেছে? উত্তরট অবশ্যই— ‘না’।
সেটাই এবার করে দেখালেন মেওয়েদার। বারো রাউন্ডের লড়াইয়ের পর টানা ৪৭ ম্যাচ অপরাজিত এই মার্কিন বক্সারের কাছেই শেষ পর্যন্ত হার মানলেন ফিলিপিন্সের প্যাকিয়াও। ওয়েল্টারওয়েট বক্সিংয়ে যিনি ৮টি বিভাগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তবে ৩৬ মিনিটের যুদ্ধের শেষে পরিসংখ্যান গেল মেওয়েদারের পক্ষে— ১১৮-১১০, ১১৬-১১২, ১১৬-১১২।
অবশ্য যুদ্ধটা শুধু মেওয়েদার জিতলেন বললে ভুল হবে। একটা বক্সিং ম্যাচ ঘিরে দুনিয়া-জোড়া এমন উন্মাদনা সেই টাইসন-হোলিফিল্ড যুগের পর খুব একটা দেখা যায়নি। সর্বকালের সেরা প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ আলি আর জো ফ্রেজারের বক্সিং লড়াইকেও হার মানিয়ে ফেলেছে যেন ফ্লয়েড বনাম ম্যানি প্যাকিয়াও! আর দুই চ্যাম্পিয়ন বক্সার? তারাও তো ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে। গত পাঁচ বছর ধরে দু’জনকে রিংয়ে নামানোর চেষ্টা চলেছে, প্রবল চাপ এসেছে ভক্তদের তরফ থেকে। তবু ব্যাপারটা হতে হতেও হয়ে ওঠেনি। রবিবার যে শেষ পর্যন্ত হল, তার কৃতিত্বটা সংগঠকরাই পাচ্ছেন। ৩০ কোটি ডলার উঠেছে। তারকা-সমাবেশেও উৎসাহের সুনামি। আর কী চাই?
তবে দুনিয়াজোড়া যে লড়াইকে ঘিরে মেতে উঠেছিল সেটা খুব বেশি মন ভরাতে পারেনি দর্শকদের। মহাযুদ্ধের টানা উসুল হল কি না- প্রশ্ন উঠেই যাচ্ছে। কোনও সার্বিক মুগ্ধতার প্রতিচ্ছবি ছিল না এ লড়াইয়ে। ‘মানি’ বনাম ‘প্যাকম্যান’ (যথাক্রমে মেওয়েদার ও প্যাকিয়াওয়ের প্রসিদ্ধ ডাকনাম) লড়াই শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মাইক টাইসনের টুইট— ‘এই ম্যাচটার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছিলাম… চূড়ান্ত হতাশ।’
অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী ভারতের বক্সার বিজেন্দ্র সিংহ বললেন, ‘যে হাইপ উঠেছিল সে রকম বাউট হয়নি।’ কেউ লিখলেন, ‘মেওয়েদার অসাধারণ লড়ে। কিন্তু এই লড়াইটা প্রচণ্ড একঘেয়ে লেগেছে।’ কেউ আবার লিখলেন, ‘এবার কি বিয়ন্সে পারফর্ম করবে? না হলে তো…।’
কারও কারও যে মন ভরেনি তা নয়। সেটাই দেখা যাচ্ছে কয়েকজন বিশ্বখ্যাত বক্সারের টুইট থেকে। বিশ্বখ্যাত বক্সার আমির খান লিখলেন, ‘ওয়েলডান ফ্লয়েড মেওয়েদার। দারুণ পারফরম্যান্স। ইজিওয়ার্ক।’ আরেক বিখ্যাত বক্সার সুগার রে লিওনার্ড বলেন, ‘হোয়াট এ ফাইট। ফ্লয়েড মেওয়েদারকে শুভেচ্ছা। বক্সড ওয়েল।’ পল ম্যালিগনাগ্গি লিখেছেন, ‘মানি পাকিওয়ারের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। কী সব বিষয় নিয়ে বিতর্ক তোলা হচ্ছে? পাকিয়াওয়ের চোটের অজুহাত হাস্যকর।’
ফিলিপিন্সবাসীর চোখে অবশ্য জিতেছেন তাদের নায়কই। ৪০ ডিগ্রির গরমেও স্টেডিয়াম, পার্ক, সিনেমা হলের স্ক্রিনে প্যাকিয়াওয়ের লড়াই দেখতে ভিড় করেছেন তারা। প্যাকম্যান তো শুধুই বক্সার নন— একাধারে ফিলিপিন্সের সাংসদ, গায়ক, বাস্কেটবল কোচ (এমনকী সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দৌড়ে রয়েছেন)।
ম্যানিলার বছর উনিশের ছাত্র থেকে চল্লিশের শপিংমল কর্মচারীও ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, ‘আমরা একেবারেই এই ফল মানছি না। প্যাকম্যান তো একাই লড়াই করে গেল। বদলে কিছুই পেল না। আমরা চাই লড়াইটা ফের হোক।’
দাবিটা প্যাকম্যানের টিমের পক্ষ থেকেও উঠেছে। তাদের বক্তব্য, ডান কাঁধে চোটের জন্য একটা হাত প্রায় নাড়াতেই পারেননি প্যাকিয়াও। চোটটা কিছুদিন আগেই লেগেছিল। দিন দু’য়েক জিমেও যেতে পারেননি। তাই সম্পূর্ণ সুস্থ প্যাকিয়াওয়ের সঙ্গে ফের মেওয়েদারের লড়াইয়ের দাবি জোরালো হচ্ছে। এ দিকে পাক বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বক্সার আমির খান বলে দিয়েছেন, তিনি চ্যালেঞ্জ করতে চান মেওয়েদারকে।

