ঢাকাTuesday , 29 September 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাড়ে ১৭ বছর কারাগারে—হারিয়ে যাওয়া জীবনের আলো-ছায়ায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুন

গাজী আক্তার
September 29, 2026 9:25 pm
Link Copied!

রাজনীতির কঠিন সময়ে অনেক সম্পর্কই দূরত্বে হারিয়ে যায়। কেউ সময়ের সঙ্গে নিজের অবস্থান বদলে ফেলেন, কেউ আবার প্রতিকূলতার মধ্যেও ধরে রাখেন পুরোনো সম্পর্ক ও বিশ্বাস। গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের রাজনৈতিক জীবনের গল্পও তেমনই এক দীর্ঘ অপেক্ষা, কারাভোগ, মামলা ও সম্পর্কের নানা আলোচনায় ঘেরা।

২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের পর জীবনের সাড়ে ১৭ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। দীর্ঘ এই সময়ে তাঁকে একাধিক মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে কয়েকটি মামলায় তাঁর সাজা বাতিল হয়ে যায় এবং তিনি খালাস পান। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বিভিন্ন মামলায় জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি।

সাড়ে ১৭ বছর—ক্যালেন্ডারের হিসাবে কয়েক হাজার দিন। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে এটি প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময়। এই সময়ের মধ্যে একটি শিশু জন্ম নিয়ে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছে যায়, কেউ ক্যারিয়ার গড়ে, কেউ ব্যবসা দাঁড় করায়, আবার কেউ সন্তানের শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছে যাওয়ার সাক্ষী হন। আর মামুনের জীবনের সেই দীর্ঘ সময় কেটেছে কারাগারের দেয়ালের ভেতরে।

তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘিরে আলোচনা
গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই নানা আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যে তাঁদের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন সামনে আসে।

মামুনের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে তারেক রহমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বিভিন্ন সময়ে তাঁর নাম নানা অভিযোগের সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার কারণে মামুন নিজে এসব রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কিছু বলার সুযোগও পাননি।

তাঁদের আরও দাবি, তারেক রহমানের সঙ্গে মামুনের সম্পর্ক মূলত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক। অর্থপাচার কিংবা ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, সেসবের কয়েকটিতে পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়ে পরিবর্তন এসেছে।

মামুনের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে মোট ২২টি মামলা করা হয়েছিল। এসব মামলার মধ্যে কয়েকটির বিচারিক প্রক্রিয়া পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং সেখানেই আসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

একের পর এক মামলায় আইনি পরিবর্তন
২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্ট তাঁর তিন বছরের সাজা বাতিল করে তাঁকে খালাস দেন। একই বছরের ডিসেম্বরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া সাজা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে আপিল বিভাগ। ওই মামলায় তাঁর স্ত্রী শাহিনা ইয়াসমিনের সাজাও বাতিল হয়।

অর্থপাচার মামলাতেও আসে বড় ধরনের আইনি পরিবর্তন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট সাত বছরের কারাদণ্ডের রায় বাতিল করে মামুনকে খালাস দেন। পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগও ওই মামলায় তারেক রহমান ও গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে খালাস দেন।

এরপর অস্ত্র মামলায়ও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের দেওয়া ১০ বছরের সাজা বাতিল করে মামুনকে খালাস দেন। তাঁর আইনজীবীর দাবি, অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

অর্থাৎ, যেসব মামলায় একসময় তাঁকে দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল, পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেসব মামলার কয়েকটিতে এসেছে ভিন্ন আইনি ফলাফল।

মায়ের মৃত্যুর সময়ও ছিলেন কারাগারে
কারাজীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি ছিল তাঁর মায়ের মৃত্যু।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর মা মোসাম্মৎ হালিমা খাতুন মারা যান। তখনও কারাগারে ছিলেন মামুন। মায়ের মৃত্যুর পর প্যারোলে কয়েক ঘণ্টার জন্য মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি।

একজন সন্তানের জীবনে মায়ের শেষ মুহূর্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তা কোনো আদালতের নথিতে পরিমাপ করা যায় না। দীর্ঘ কারাজীবনের সঙ্গে তাই তাঁর মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটিও জড়িয়ে আছে এক গভীর ব্যক্তিগত বেদনা হিসেবে।

হারিয়ে যাওয়া সাড়ে ১৭টি বছর
সাড়ে ১৭ বছর শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটি একজন মানুষের জীবনের এমন একটি সময়, যখন পরিবার বদলে যায়, সন্তান বড় হয়, সমাজ বদলে যায়, রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টে যায়। অথচ কারাগারের ভেতরে থাকা মানুষের জীবন অনেকটা থেমে থাকে একই জায়গায়।

মামুনের ক্ষেত্রেও সেই দীর্ঘ সময় কেটেছে পরিবার থেকে দূরে, স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। বাইরে যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, সরকার এসেছে-গেছে, নানা ঘটনা ঘটেছে, তখন তিনি ছিলেন কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে।

২০২৪ সালে মুক্তির পর তাই তাঁর সামনে ছিল একেবারে বদলে যাওয়া বাস্তবতা। যে সময়টি হারিয়ে গেছে, তা আর ফিরে পাওয়ার সুযোগ নেই।

দুঃসময়ে সম্পর্ক ধরে রাখার দাবি
মামুনের ঘনিষ্ঠজন ও বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাই তাঁকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক চাপ ও হয়রানির মুখে ফেলেছিল। তাঁদের ভাষ্য, মামলা ও কারাভোগের মধ্যেও তিনি বিএনপির প্রতি তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করেননি।

তাঁদের কাছে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন একজন ‘বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত সৈনিক’। দীর্ঘ কারাভোগ, মামলা ও ব্যক্তিগত ক্ষতির পরও রাজনৈতিক সম্পর্ক ও দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য অটুট ছিল—এমনটাই মনে করেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা।

অন্যদিকে, তাঁর জীবন ও মামলাগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও কম হয়নি। ফলে মামুনের দীর্ঘ কারাজীবন শুধু ব্যক্তিগত জীবনের একটি অধ্যায় নয়; এটি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেরও আলোচিত একটি অংশ।

কারাগারের দরজা পেরিয়ে নতুন জীবন
সাড়ে ১৭ বছর পর কারাগারের দরজা পেরিয়ে মুক্ত জীবনে ফিরেছেন গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। এই সময়ে তাঁর বয়স বেড়েছে, বদলে গেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা, বদলে গেছে চারপাশের মানুষ ও পরিবেশ।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় হিসাবটি থেকে গেছে—হারিয়ে যাওয়া সাড়ে ১৭ বছর।

আদালতের রায় ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কোন মামলায় কী অভিযোগ ছিল, কোথায় সাজা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কোন আদালতে কী সিদ্ধান্ত এসেছে—সেসবও নথিভুক্ত থাকবে। কিন্তু একজন মানুষের জীবনের হারিয়ে যাওয়া সময়ের হিসাব কোনো আদালতের রায়ে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

কারাগারের দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে ফিরে আসা গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের গল্প তাই শুধু মামলা ও রাজনীতির গল্প নয়। এটি দীর্ঘ অপেক্ষা, নিঃসঙ্গতা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার এক দীর্ঘ অধ্যায়।

সাড়ে ১৭ বছর পর জীবনের আলোয় ফিরে এসে তাঁর সামনে এখন নতুন সময়। ইতিহাস তাঁর কারাজীবন, আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক—সবকিছুকেই নিজস্ব ভাষায় মূল্যায়ন করবে। আর সেই ইতিহাসে গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সাড়ে ১৭ বছর থেকে যাবে এক দীর্ঘ, আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে।