জামালপুরের অন্যতম জনকল্যাণমুখী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘জামালপুর ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল, এখন একজন ব্যক্তির পকেট সংগঠনে পরিণত হয়েছে। গঠনতন্ত্র জালিয়াতি, সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন, কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম এবং সাধারণ রোগীদের জিম্মি করে বাণিজ্য করার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। খোদ সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিগত ২০ বছরের অধিক সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে কুক্ষিগত করে রেখেছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ তারিকুল ইসলাম।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হাসপাতালের অন্তরালে চলা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-
কে এই সাধারণ সম্পাদক :
এক সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও তিনি নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ঠিকাদারীকে। ঠিকাদারী করতে করতেই তিনি হয়ে উঠেন একজন রড সিমেন্টের ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক সফলতার সুবাদে তিনি সুযোগ পেয়ে যান তৎকালিন সময়ে মানব সেবার প্রত্যয়ে গড়ে উঠা জামালপুর ডায়াবেটিক সমিতিতে সদস্য হওয়ার। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তিনি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থেকে সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব পান। সবশেষ ২০০৭ সালের ডায়াবেটিক সমিতি কর্তৃক সংশোধিত এবং সমাজ সেবা অধিদপ্তর অনুমোদিত গঠনতন্ত্রে তিনি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বহাল থাকেন। বিগত দিনের হিসাব বাদ দিলেও ২০০৭ সালের পর থেকে অদ্যাবদি (প্রায় বিশ বৎসর) তিনি উক্ত পদে অধিষ্ট আছেন। দীর্ঘদিন যাবৎ একই পদে থাকার জন্য তিনি সময় ভেদে পরিবর্তন করতে থাকেন তার নৈতিকতা, হয়ে উঠেন দূর্নীতির মহারাজা, গড়ে তোলেন একচ্ছত্র সাম্রাজ্য।
অনুমোদিত মূল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, হাসপাতালের কমিটির মেয়াদ ২ বছর থাকার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তা অবৈধভাবে বাড়িয়ে ৩ বছর করা হয়। শুধু তাই নয়, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাধারণ সম্পাদক গত কয়েক বছরে অন্তত ৫ থেকে ৬ বার গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছেন। সর্বশেষ নিজের ইচ্ছামতো একটি পকেট গঠনতন্ত্র তৈরি করে নেন তিনি।
মূল গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে কোনো ব্যক্তি সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে পরপর দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারবেন না। কিন্তু বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নানা কূটকৌশল ও প্রভাব খাটিয়ে বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে এই পদটি দখল করে আছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
সরকারি অনুদান ও ফ্রি চিকিৎসার নামে প্রতারণা
জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাথে চুক্তিবদ্ধ। চুক্তি অনুযায়ী, হাসপাতালটি নির্মানে ব্যয়কৃত অর্থের ২০% দেয়ার কথা হাসপাতালের ( জামালপুর ডায়াবেটিকে সমিতি), বাকি ৮০% ব্যয় বহন করবে সমাজ সেবা অধিদপ্তর , কিন্তু প্রায় একযুগ হতে চলল এখন পযর্ন্ত সম্পূর্ন অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এই অর্থ পরিশোধের জটিলতার কারণে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিডির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানেও চলমান।
চুক্তিতে আরো উল্লেখ ছিল হাসপাতালে আগত ২৫% থেকে ৩০% রোগীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (ফ্রি) চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে কোনো রোগীকে ফ্রি দেখা তো হয়ই না, উল্টো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। ডায়াবেটিক রোগীদের সেবার উদ্দেশ্যে এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হলেও এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বাণিজ্যিক ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর সমপরিমাণ, অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। ফলে গরিব ও মধ্যবিত্ত রোগীরা এখানে এসে চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত খাত থেকে অনুদান হিসেবে আসা বিপুল পরিমাণ অর্থ ও চিকিৎসা সামগ্রীর কোনো সঠিক হিসাব বা যথার্থ ব্যবহার নেই। জামালপুর জেলা পরিষদ জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালে আগত রোগীদের জন্য একটি আইসিইউ তৈরীর লক্ষ্যে ৬০(ষাট) লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করলেও সাধারণ সম্পাদকের সদ্বইচ্ছার অভাবে এখনও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি হাসপাতালের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন আইসিইউ বিভাগটি, প্রাপ্ত এই অনুদানের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হয়না নিয়মতান্ত্রিক অডিট , আয়-ব্যয়ের হিসেবেও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’
নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের আয়-ব্যয়ের হিসাব সফটওয়্যার এর পাশাপাশি একটি রেজিস্ট্রি খাতায় লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এই হাসপাতালে তা করা হয় না। সফটওয়্যারে পরিবর্তন করলে সহজে তা বোঝা যায় না কিন্তু রেজিষ্ট খাতায় পরিবর্তন করতে হলে কাটাছেড়াঁ করতে হয় যা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। তাই হাসপাতালের অর্থনৈতিক দূর্নীতি ধামা চাপা দিতে সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশনা অনুযায়ী শুধুমাত্র সফটওয়্যারেই হিসাব সংরক্ষন করা হয়ে থাকে। আয় ব্যয় লিপিবদ্ধ করার জন্য নেই লেজার বা রেজিষ্টি খাতা ।
সরকার অনুমোদিত বা নিবন্ধিত অডিট ফার্ম দ্বারা প্রতি বৎসর অডিট করার নিয়ম থাকলেও জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ সম্পাদক এবং হাসপাতালের হিসাবরক্ষক তাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও নিজস্ব একজন ব্যক্তিকে দিয়ে নামমাত্র একটি ‘লোক দেখানো’ অডিট করিয়ে নেন। এর মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও লোপাট ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিচালকের ‘কনসালটেন্ট’জালিয়াতি ও বৈকালিক চেম্বার ব্যবসা
হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক নিজেকে ‘হেমাটোলজি কনসালটেন্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে রোগী দেখছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) স্বীকৃত নির্দিষ্ট উচ্চতর ডিগ্রি (যেমন: MD, FCPS ইত্যাদি) ছাড়া কেউ নামের পাশে ‘কনসালটেন্ট’ লিখতে পারেন না। তার এই ডিগ্রির বৈধতা নিয়েও উঠেছে বড় প্রশ্ন।
এছাড়া, প্রতিষ্ঠানের পূর্ণকালীন বেতনভুক্ত কর্মকর্তা হয়েও তিনি একই প্রতিষ্ঠানে বসে মোটা অঙ্কের ভিজিট বা পরামর্শ ফির বিনিময়ে বৈকালিক চেম্বার করছেন, যা সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও চিকিৎসানীতি পরিপন্থী। এই বিষয়ে জেলার সিভিল সার্জন মহোদয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগীরা।
স্টোর ও হিসাব বিভাগে ‘দুর্নীতির মহোৎসব’
হাসপাতালের প্রতিটি বিষয় সুচারু ভাবে সম্পন্ন করতে কার্যকারী কমিটির অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন উপ কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও সাধারণ সম্পাদক কমিটির কারো মতামতের তোয়াক্কা না করে নিজের খেয়াল খুশি মত তৈরী করেন বিভিন্ন উপ-কমিটি। আর সেই সব উপ-কমিটিতে রাখা হয় তার আজ্ঞাবাহকদের। হাসপাতালের কেনাকাটা বা স্টোর সেকশনে চলছে হরিলুট। এখানেও সেই আজ্ঞাবাহকদের কারণে নেই কোনো তদারকি। বাজার থেকে মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো পাকা রসিদ (Voucher) রাখা হয় না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে কোন কিছু ক্রয় করতে হলে নিতে হয় বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে কোটেশন বা দরপত্র, মানা হয়না সেনিয়ম । অধিকাংশ কেনাকাটার বিপরীতে কোনো পাকা ক্রয় রসিদ (Cash Memo/Invoice) নেই। সাদা কাগজে ভুয়া হিসাব লিখে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করছে স্টোর কিপার ও হিসাবরক্ষক সহ সাধারণ সম্পাদকের সিন্ডিকেট।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর মানসিক নির্যাতন ও বৈষম্য
হাসপাতালটিতে চলছে ‘দাস প্রথা’র আধুনিক রূপ। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতে চরম বৈষম্য। যোগ্যতা নয়, বরং সাধারণ সম্পাদকের ‘তোষামদকারী’ হওয়াই এখানে টিকে থাকার একমাত্র যোগ্যতার মাপকাঠি।
সাধারণ সম্পাদকের চামচামি করলে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা আকাশচুম্বী হয়। বিপরীতে, যারা সৎ ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন, তারা প্রতিনিয়ত অপমান, ভৎসনা এবং চাকরিচ্যুতির হুমকির শিকার হচ্ছে।
প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ ও তদন্তের দাবি
জামালপুর ডায়াবেটিকস জেনারেল হাসপাতালটি কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি একটি জনকল্যাণমুখী সামাজিক প্রতিষ্ঠান। জনগণের সুস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে জেলার এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি যেন ধ্বংস প্রাপ্ত হয়ে না যায় জেলা সিভিল সার্জন(C), জেলা প্রশাসক (DC) এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খতিয়ে দেখা। এই অপরাধমূলক সিন্ডিকেট ভেঙে হাসপাতালটিকে সাধারণ মানুষের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও কার্যকরী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের তীব্র দৃষ্টি আকর্ষণ করছে আপমর সাধারণ জনগণ।

