বাগেরহাটে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড গ্রামীণ ও শহুরে জনজীবনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। টেকসই সড়ক, ব্রিজ ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জীবনমান ব্যাপকভাবে উন্নত হয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং সেতু-কালভার্ট স্থাপনের পাশাপাশি পরিবেশ বান্ধব আলোকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও আধুনিক নাগরিক সুবিধার আওতায় আসছেন। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গ্রোথ সেন্টার এলজিইডির মাধ্যমে বাগেরহাটের বিভিন্ন উপজেলায় নতুন পাকা রাস্তা ও মহাসড়কের সংযোগ সড়ক নির্মিত হয়েছে। এতে গ্রোথ সেন্টার ও হাট-বাজারগুলোর সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা খুব সহজেই তাদের উৎপাদিত ফসল ও পণ্য সরাসরি বাজারে নিয়ে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, যা দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র বাগেরহাট একটি উপকূলীয় জেলা হওয়ায় এখানকার জনজীবন প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কথা মাথায় রেখে উপকূলবর্তী এলাকায় বহু বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র (সাইক্লোন শেল্টার) নির্মাণ করা হয়েছে। দুর্যোগকালীন জানমাল রক্ষার পাশাপাশি এগুলো সাধারণ সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এলাকার শিক্ষা প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবা সহজীকরণ উপজেলা পর্যায়ে দৃষ্টিনন্দন উপজেলা কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের কাজও বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি। ফলে সাধারণ মানুষ একই ছাদের নিচে সব ধরনের স্থানীয় নাগরিক ও সরকারি সেবা সহজেই গ্রহণ করতে পারছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, একসময় কাঁচা ও চলাচল-অযোগ্য অনেক সড়ক এখন পাকা ও প্রশস্ত হয়েছে। এতে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সময় ও খরচ কমেছে। গ্রামীণ বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কে আধুনিক এলইডি বাতি স্থাপনের ফলে রাতেও নিরাপদে চলাচল করতে পারছেন মানুষ।
বাগেরহাট জেলার পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত প্রকৌশলীরা জানান, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জনগণের চাহিদা ও এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে গ্রামীণ জীবনমান আরও উন্নত হয়। অপরদিকে বাগেরহাট এলজিইডি সূত্র জানায়, বাগেরহাট জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় মোট ১২৬টি সড়কের উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন ও চলমান রয়েছে। যার মোট দৈর্ঘ্য ১২৯.৯৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে ইউনিয়ন সড়ক ১২টি, যার দৈর্ঘ্য ২০.৭২৩ কিলোমিটার, উপজেলা সড়ক ৮টি, যার দৈর্ঘ্য ২২.৬৫২ কিলোমিটার, ইউনিয়ন সংযোগ সড়ক ১৪টি, যার দৈর্ঘ্য ১৪.৫৭ কিলোমিটার এবং গ্রামীণ সড়ক ৯২টি, যার দৈর্ঘ্য ৭২.০৪ কিলোমিটার। এছাড়া ৩২টি সড়কের মেরামত কাজ করা হয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য ৬১.৫৫ কিলোমিটার। সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি যোগাযোগ অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে ৫৯টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য ১,৭২৮ মিটার। এছাড়া ৬টি ঘাটলা এবং ৩২টি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে, যার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ১২৯.৬ মিটার। প্রকল্পটি ১ জুলাই ২০২৩ সালে অনুমোদিত হয়। এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯১৬ কোটি টাকা এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৩ জুন ২০২৭ সালে। বাগেরহাট জেলার ৪টি সংসদীয় আসনের আওতাধীন ৯টি উপজেলায় এলজিইডির মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
যদিও জেলার বিভিন্ন এলাকায় এলজিইডির মাধ্যমে অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তবুও প্রয়োজনের তুলনায় সেগুলো পর্যাপ্ত ছিল না। সুন্দরবন-সংলগ্ন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এ জেলার দীর্ঘদিনের অবহেলিত যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বর্তমান প্রকল্পটি নতুন গতি সঞ্চার করেছে। উন্নত সড়ক ও সেতু যোগাযোগের ফলে কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বাগেরহাট জেলা পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবু কামাল দৈনিক পাঞ্জেরী বলেন, গ্রামীণ জনপদের অবকাঠামো উন্নয়নে এলজিইডি ব্যাপক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। উক্ত প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাট জেলায় উপরোক্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়বে বলে আশা করি। উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রকৌশলীরা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

