নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উঠতি সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে ফায়দা নিতে পারে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা। তালিকাভূক্ত সাত শতাধিক উঠতি সন্ত্রাসী এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এমন শঙ্কা এবং চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনা করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে ‘ব্লকরেইড’ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার রাত থেকে ঢাকার আটটি ক্রাইম জোনে কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে এ অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযানের সন্দেহভাজনদের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী অথবা নির্বাচনী প্রচারণা কাজে অংশ নিলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে মেয়র পদে মনোনয়ন কিনেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহনগরের আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল আওয়াল মিন্টু, দলের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম। এছাড়া কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র কিনেছেন বিএনপি-জামায়াতের শতাধিক নেতা। যাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে ফৌজদারি মামলা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া স্বাক্ষরিত ‘ব্লকরেইড অভিযান’ পরিচালনার নির্দেশাবলী রাজধানীর ডিসি, এডিসি, ওসিসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া অভিযান পরিচালনার কপি পাঠানো হয়েছে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। এর আগেও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাশকতারোধ করতে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালানো হয়।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তালিকাভূক্ত উঠতি সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে রাজধানীতে অভিযান চলছে। সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করে অভিযান আরো জোড়দার করা হয়েছে। অভিযানে সন্দেহভাজনদের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী অথবা নির্বাচনী প্রচারণা কাজে অংশ নিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আদালত থেকে জামিন নিয়ে তারা নির্বাচনী কাজে অংশ নিতে পারবেন। অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সব সময় অভিযান চালানো হয়। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধী গ্রেপ্তার, সন্ত্রাস দমন, মাদকবিরোধী অভিযান, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধিদের অপতৎপরতা বন্ধসহ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রুটিন ওয়ার্ক।’
ডিএমপি সূত্র জানায়, কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে গত মঙ্গলবার থেকে সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চলছে। শুরু হওয়া এই অভিযান পরিচালনার নেতৃত্বে থাকছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রতিটি বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার এডিসি। থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাবও অভিযানে অংশ নিচ্ছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ডিএমপি কমিশনারের স্বাক্ষরিত চিঠিতে রাজধানীর কোন কোন থানা এলাকায় কবে, কখন ব্লকরেইড অভিযান পরিচালনা করা হবে- তার দিনক্ষণ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জোড়ালোভাবে এই অভিযান চলবে। প্রতিটি থানা এলাকার বাসাবাড়ি, বস্তি, শিবিরের ছাত্রাবাস ও ছিন্নমূল ভবঘুরের উপর বিশেষ নজরদারির নির্দেশ রয়েছে।
জানা গেছে, রাজধানীর ৪৯ থানাভিত্তিক অপরাধীদের একটি তালিকা করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগ অবৈধ অস্ত্রধারী। এর আগে সাত শতাধিক উঠতি সন্ত্রাসীদের তালিকা করা হয়। তাদের বেশিরভাগ এখনও অধরা। এসব অপরাধীরা সিটি করপোরেশন নির্বানের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে। তাদের ধরতে ‘ব্লকরেইড’ অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য থাকবে, প্রতিটি থানার তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসীসহ সব ধরনের অপরাধী এমনকি জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করা। একই সঙ্গে যেসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে তাদেরকেও গ্রেপ্তার করার বিষয় অভিযানে প্রাধান্য পাবে।
র্যাবের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘জঙ্গিরা এখনো নির্মূল হয়নি। জঙ্গিদের সঙ্গে ইসলামি দলের নেতাকর্তীদের বরাবরই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়া জঙ্গিরা বরাবরই ভয়ঙ্কর। তাদের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীসহ অন্যান্য অপরাধীদের ধরতে বরাবরই র্যাব তৎপর রয়েছে। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে এসব অপরাধীদের অপতৎপরতা বাড়তে পারে। এসব সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য কৌশলে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।’
সূত্র জানায়, আসন্ন সিটি করপোরেশন ঘিরে বিএনপি-জামায়াতের ডাকা অবরোধ-হরতালের প্রভাব কিছুটা কমলেও অপরাধীরা থেমে নেই। কারণ প্রভাবশালীরা বরাবরই অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোটা অঙ্কের অবৈধ অর্থ ব্যয় করে। এরাই চলমান হরতাল-অবরোধের সময় পেট্রোলবোমা হামলায় বিপুল অর্থ দিয়ে সন্ত্রাসীসহ অভাবি মানুষজনকে ব্যবহার করে। নাশকতাকারীদের বেশিরভাগ এখনো অধরা। আর যাতে আগুনে পুড়িয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা না হয় তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। সেই সঙ্গে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে ‘ব্লকরেইড’ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

