ঢাকাSunday , 4 January 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঢাকায় গ্যাসের ভয়াবহ সংকট
অবৈধ সংযোগে ‘সিস্টেম লস’, ভারসাম্যহীন তিতাস

Link Copied!

ঢাকায় আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। বাসাবাড়িতে ঠিকমতো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অবস্থা নাজুক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলা জ্বালিয়ে রেখেও রান্না সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ ‘সিস্টেম লস’। গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় অবৈধ সংযোগ ও লিকেজের কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস অপচয় হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈধ গ্রাহকদের ওপর। নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও অনেক গ্রাহক প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড বিভিন্ন সময়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে অভিযান চালালেও বাস্তব পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। অভিযান চলাকালীন কিছু অবৈধ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার নতুন করে সংযোগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আর এর সঙ্গে তিতাসের কিছু আসাধু কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ আছে দীর্ঘদিনের। অবৈধ সংযোগে সিস্টেম লসে তাই ভারসাম্যহীন অবস্থায় তিতাস। তবে ঠিক কত সংখ্যক অবৈধ সংযোগ রয়েছে তার হিসাব মেলানোও অসম্ভব। কেননা অভিযান আর সংযোগ বিচ্ছিন্নের লুকোচুরি খেলায় প্রতিনিয়ত এই সংখ্যা পরিবর্তন হয়।
এদিকে, গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তবে বাড়তি খরচের কারণে অনেক পরিবারই সেই বিকল্পে যেতে পারছে না। ফলে রান্না নিয়ে প্রতিদিনই অনিশ্চয়তায় পড়ছেন নগরবাসী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান নয়, গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত মনিটরিং এবং অবৈধ সংযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে। একই সঙ্গে সিস্টেম লস কমাতে কার্যকর সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন তারা। গ্যাস সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রাজধানীর জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর বাড্ডা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাসাবো, উত্তরা, লালবাগ, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, শ্যামপুর, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে।
বাড্ডার বাসিন্দা নওরিন ইসলাম বলেন, ঠিকমতো বাসায় গ্যাস থাকে না। চুলায় রান্না বসিয়ে ঘণ্টার পর ঘল্টা অপেক্ষা করতে হয়৷ মাংস রান্না করতে চার ঘণ্টা সময় লাগে। ভাত রান্না করতে দুই ঘণ্টা সময় চলে যায়। দীর্ঘদিন ধরে একই অবস্থা। গত কয়েকদিনে সমস্যা আরও বেড়েছে।
মিরপুরের গৃহিণী সোমা আক্তার বলেন, লাইনে গ্যাস থাকে না বললেই চলে। নিভু নিভু করে চুলা জ্বলে৷ মাঝেমধ্যে বৈদ্যুতিক হিটারে রান্না করতে হয়৷ এতে খরচও বাড়ে। গ্যাসের এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। এর কি সমাধান হবে না?
তিতাসের তথ্য বলছে, তিতাসের সব গ্রাহক মিলিয়ে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ১৯০০ থেকে ২০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সেখানে তিতাস পাচ্ছে ১৫০০ মিলিয়ন ঘটফুটের মতো গ্যাস। দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিনিয় ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে৷ আবার রাজধানী ঢাকায় চাহিদা ৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো সেখানে পর্যাপ্ত সরবরাহ করেও সিস্টেম লসের কারণে বৈধ গ্রাহকরা গ্যাস পাচ্ছেন না।
তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। রাজধানীতে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হলেও অবৈধ সংযোগে সিস্টেম লসের কারণে বৈধ গ্রাহকরা ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছে না।
তারা বলছেন, নিয়মিত অভিযান চললেও পরবর্তীতে আবারও অবৈধ সংযোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে দৃশ্যমান তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না।
তিতাসের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৭৪ হাজার ২৫টি অবৈধ সংযোগ ও এক লাখ ৫৮ হাজার ১৪৬টি বার্নার বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। একই সময়ে ৩১০.৭ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ করা হয়েছে।
তিতাসের আপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের সব মিলিয়ে চাহিদা প্রায় দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। আমরা পাচ্ছি এক হাজা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। ঢাকায় গ্যাসের চাহিদা ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। ঢাকার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হচ্ছে কিন্তু অবৈধ সংযোগের কারণে সমস্যাটা হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাসাবাড়িতে গ্যাস আমরা সবসময় দিতে পারছি না। ইন্ডাস্ট্রিতে সবসময় গ্যাসের ব্যবস্থা আমরা করেছি৷ বাসা-বাড়িতে ওভাবে দেওয়া যাচ্ছে না। সিস্টেম লসের কারণে আমরা অনেকটা রেশনিং টাইপের দিচ্ছি।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জাগো নিউজকে বলেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে কাজ চলছে। লাইন কাটা হচ্ছে।
জানতে চাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, রাষ্ট্র এগুলো অ্যালাউ করছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব। মানুষ তাদের পয়সা দিয়ে বেতন দিচ্ছে, তারা বেতন খাচ্ছে-বেতন নিচ্ছে। সুখে আরাম-আয়েশ করছে। গ্যাস সংকট কমানোর জন্য এমন চুরি তারা প্রটেক্ট করে না। এই চুরির জন্য দায়-দায়িত্ব সব তাদের। তাদের বিচার করার মতো সক্ষমতা যদি দেশ-জাতি অর্জন করে তাহলে স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ফলপ্রসূ হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যে একটা সার্বভৌম জাতি এটা কোনো দিক থেকেই প্রমাণ করতে পারছি না। আমরা দুর্বৃত্তদের হাতে জিম্মি হয়ে গেছি। তারা আমাদের জিম্মি করে লুণ্ঠন করছে। এক দিকে তিতাসের কথা বলতেছে অন্যদিকে এলপিজির কথা আসতেছে। আরেক দিকে চিনি, ভোজ্য তেলের দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে শতশত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নিয়ে যাচ্ছে। একটা সার্বভৌম সভ্য দেশে এটা হতে পারে না, হয় না।’
ড. শামসুল আলম বলেন, এটা শুধু তিতাস না এটা সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। রাষ্ট্রকে সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্র অসচেতন বলেই রাষ্ট্র অক্ষম। আর রাষ্ট্র অক্ষম বলেই এরকম বিশৃঙ্খলা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।