বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সীমা ছাড়িয়ে নকলনবিস পিন্টু সাহার কার্যক্রম। নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফতুল্লা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে নিজের রামরাজত্ব কায়েম করেছেন। তাকে ছাড়া সেখানে সেবা কার্যক্রম যেন অচল। তার সিন্ডিকেটের বাইরের কোনো কাজ হয় না। ফলে তার কাছে অফিসটি জিম্মি হয়ে পড়েছে। এখানে নাকি সে-ই সর্বেসর্বা। তার কথাই এখানে শেষ কথা! অথচ ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে তার নাম জড়িয়ে আছে। তাই তাকে আগে কেউ ঘাঁটাত না। কিন্তু চব্বিশের পালাবদলের পরও তার দাদাগিরি অব্যাহত।
সরেজমিন দেখা গেছে, ফতুল্লা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে নকলনবিস পিন্টু সাহার বিরাট একটি চক্র রয়েছে। যে চক্রে তার পরিবারের ১১ জন আত্মীয়-স্বজন আছে। তার পিন্টু সাহার কল্যাণে তারা এখানে কর্মরত। তারা মূলত চাকরির আড়ালে ফতুল্লা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে পিন্টু সাহার ফরমায়েস খাটে। তার হয়ে কাজ করে সাব রেজিস্ট্রি অফিসজুড়ে। এখানে কেউ কোনো কাজে এলে প্রথমেই তার লোকজন ঘিরে ধরে। তারপর আগতদের বাধ্য করে নকলনবিস পিন্টুর কাছে যেতে।
সাব রেজিস্ট্রি অফিসের একটি সূত্র জানায়, নকলনবিস পিন্টু গং অনেক গুরুতবপূর্ণ ফাইল গায়েব করে দেয়। পিয়নদের যোগসাজশে তারা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব সর্বনাশা কাজে লিপ্ত। এদের এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে তারা বেপরো। এই সর্বনাশা কাজে নিয়োজিতদের ব্যাপারে সরেজমিন তদন্তুপূর্বক আইনগত ব্রবস্থা গ্রহণ করা না হলে তারা যেমন নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাববে, তেমনি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে যাবে।
সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কজন কর্তাব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে পিন্টু সাহার কথাই চূড়ান্ত। জরুরি কাজে কেউ তাদের শরণাপন্ন হলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, ‘পিন্টুর সঙ্গে কথা হয়েছে? সে কী বলেছে!’ আর কথা হয়েছে বললে দ্বিতীয় কথা না বলে কাজ করে দেন। অন্যথায় কথা বলতে বলেন। এটা হলো সাব রেজিস্ট্রি অফিসময় পিন্টু সাহার অবাধ রামরাজত্বের কিঞ্চিত নমুনা। এখানে নাকি এখনো তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। পিন্টু সাহা নাকি এখানের দ্বিতীয় শামিম ওসমান।
পিন্টু সাহার বিষয়ে অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা বিব্রত বোধ করেন। ইনিয়ে-বিনিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, সাব রেজিস্ট্রার বা ঊর্ধ্বতন কেউ নয়- এখানের দন্ডমুন্ডের কর্তা পিন্টু সাহা! আর হবেই বা না কেন, ঘাটে ঘাটে তার লোক বসানো। পান থেকে চুন খসলেই তার কাছে খবর চলে আসে। বড় কর্তাদের ম্যানেজ করে এখানে সে তার সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, বড় কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন কর্মকর্তার ফাইল ও ফরমায়েশ খাটা লোকগুলো নকলনবিস পিন্টু সাহার স্বজন। কৌশলে সে এই লোকগুলো সব জায়গায় সেট করেছে। কোনো ফাইল নড়া-মাত্র পিন্টু সাহা সব খবর পেয়ে যায়। আর এর মাধ্যমে পিন্টু অবগত হয়ে যথাস্থানে হাজির হয়ে আগতদের উত্তম সেবা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে নজরানা দিতে বাধ্য করে। অনেকে বাধ্য হয়ে তা ফাঁদে পা দেয়। না দিয়েও উপাই নেই, কারণ দশ মিনিটের কাজ দশ মাসেও হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে তার দ্বারস্থ হয়।
সরকারি অফিসে একজন পিন্টু সাহার সীমাহীন বাড়াবাড়ি দিনকে দিন বেড়েই চলছে। পিন্টু গংয়ের এসব অতিরিক্ত খরচ ও হয়রানির কারণে সেবা গ্রহণকারীরা অতিষ্ঠ। সেবা গ্রহণকারীদের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেও খুব একটা ফল মিলছে না। তাই চলমান দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানি বন্ধে তারা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম অনলাইনে করার দাবি জানিয়ে আসছে। স্বচ্ছতার জন্য যা খুবই উত্তম পন্থা। অনলাইনে খাজনা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিন্তু সুফল মিলেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা দরকার বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করে।
দলিল রেজিস্ট্রি করা, দলিল লেখকদের লাইসেন্স পাওয়া, নকল উঠানো, দলিল সম্পাদনের পর উভয় পক্ষ রসিদ পাওয়াসহ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে মানুষের অনেক কাজ। আর এগুলো দ্রুত হাতে পাওয়ার জন্য এই অফিসে ভিড় লেগেই থাকে। এই ভিড় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত। আর এই ভিড়ই পিন্টু সাহার জন্য সোনায় সোহাগায় পরিণত। এ ভিড়কে কাজে লাগিয়ে পিন্ট সাহা আজ শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক। এই টাকা দিয়ে করেছে অঢেল সম্পদ। নিজের ও স্ত্রীর নামে রয়েছে বড় অঙ্কের ব্যাংক ব্যালেন্স। বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। আছে হুন্ডির সঙ্গে জড়িত থাকার অসংখ্য অভিযোগ। কিন্তু এতকিছু করেও পিন্টু গং ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ফতুল্লা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবিস পিন্টু সাহার এসব বহুরূপী অনৈতিক কাজ, অঢেল সম্পদ, বিদেশে অর্থ পাচার ও হুন্ডি ব্যবসার ব্যাপারে বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকের তদন্ত করা জরুরি। একজন পিন্টু সাহা অফিসে সেবাগ্রহণকারীদের জিম্মি করে বছরের পর বছর আর কত সেবার নামে অবাধ নৈরাজ্য চালিয়ে যাবে! এসব অবৈধ কাজ করেও পার পেয়ে যাবে? তা তো হতে পারে না। এর রাশ টেনে ধরা দরকার। সমাজের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে যাদের থলের বিড়াল বের করার দায়িত্ব, পিন্টু সাহার ব্যাপারে তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ সময়ের দাবি।
ফতুল্লা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে নকলনবিস পিন্টু সাহাসহ পিয়ন, ওমেদার এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যের ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন এবং এই ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

