রাজধানীর ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সহকারি (কেরানি) শাহাজাহান লস্করের বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের কারণে ডুবতে বসেছে রেজিস্ট্রি অফিসের সুনাম। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর কেরানি শাহজাহান লস্কর গত মে মাসে পিআরএলএ যান। অথচ অদৃশ্য শক্তি ও তার অবৈধ টাকার জোরে এখনও বহাল তবিয়তে ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে। আর এই সুযোগে সরকারি সকল কাজকর্ম করার সুযোগও পাচ্ছেন। অবসরে যাওয়া একজন কেরানি শাহজাহান লস্কর বিধি বহির্ভূতভাবে সরকারি চেয়ারে বসায় ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। তিনি জোর করে ঘুষের টাকা আদায় করছেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। কায়েম করেছেন রাম রাজত্ব। সূত্র জানায়, সরকারি চাকুরিকালিন অবসরে যাওয়া ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ কেরানি এখনও তার চেয়ার আগলে রেখেছেন কি ভাবে? এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মোহরার ও নকলনবিশদের মাঝে। আওয়ামী লীগের দোসর শাহাজান লস্করের অবৈধ টাকা ও ক্ষমতার জোরে সরকারি বিধিবিধান উপেক্ষা করে ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি এখনও অফিস করছেন। শুধু মাত্র সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন বলে সূত্র জানায়। তাদের আর্থিক দুনীতির কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে সরকারি সকল কার্যক্রম। সেখানে সেবা নিতে আসা দাতাগ্রহীতারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন তার নিকট। তার চাহিদা মাফিক ঘুষ দিতে হিমশিম খাচ্ছেন দাতাগ্রহীতারা। তার গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের বাইরে দলিল সম্পাদন করা কঠিন বিষয় বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এক কথায় হয়রানির আরেক নাম ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। সূত্রে জানা যায়, স্বৈরাচার পতিত লীগ সরকারের আমলে দাপট দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেন কেরানি শাহজাহান লস্কর। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন কেরানি শাহজাহান লস্কর। তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সাধারণ কর্মচারীদের মাঝে চলছে নানা গুঞ্জন। প্রশ্ন-কোন পথে ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কেরানি শাহজাহান লস্কর এত সম্পদের মালিক বনে গেছেন। আবার অনেকেই বলছেন তার কাছে রয়েছে আলাদীনের চেরাগ। তা না হলে সামান্য নকলনবিশ থেকে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এত সম্পদের মালিক হলেন শাহাজাহান লস্কর! সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে নকলনবিশ থেকে মোহরার পদে স্থানীয়ভাবে চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন তিনি। পদোন্নতি পেয়েই যোগদান করে পল্লবী সাব রেজিস্ট্রি অফিসে। সেখান চলে তার নেতৃত্বে কমিশন বাণিজ্য। দলিলের নকল তুলতে গেলে গুণতে হত তার চাহিদা মাফিক দলিল প্রতি ২শ’ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তার বেপরোয়া ঘুষ দুনীতির অভিযোগ এনে একাধিক নকলনবিশ সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার দীপক কুমার বিশ্বাসের নিকট গণসাক্ষর দিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ মোহরার শাহজাহান লস্করকে ধামরাইয়ের কালামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলী করা হয়। কালামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেই বেপরোয়া হয়ে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করেন শাহাজাহান লস্কর। পরবর্তীতে পদন্নোতি পেয়ে সহকারি (কেরানি) হিসেবে তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মতো লোভনীয় স্থানে পেয়ে যান সোনার খনি। সূত্র জানায়, দুর্নীতিবাজ তৎকালিন জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহারকে ম্যানেজ করে যোগদান করেন খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে । খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কেরানি হিসেবে যোগদান করায় আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি শাহজাহান লস্করকে। তার নেতৃত্বে কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে মহামারি আকার ধারণ করে। খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৩ বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দলিল লেখক দৈনিক পাঞ্জেরীর এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেন। খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পুনরায় তদবির করে ঢাকা জেলার ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কেরানি হিসেবে বদলী হয়ে যান। সেখানেও দলিল লেখকদের জিম্মি করে দলিল প্রতি ৫ হাজার থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয় শাহজাহান লস্করকে। বন্টননামা দলিল, হেবা দলিল, পাওয়ার অব এটর্নি দলিল ও কমিশন দলিলের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ গুণতে হয়। অত্যন্ত শান্ত ও ধূর্ত প্রকৃতির এই দুর্নীতিবাজ কর্মচারী শাহজাহান লস্কর অবৈধ টাকা আয় করে তা দেশের বাইরে ভিন্ন চ্যানেলে পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকে ঐ টাকা পুনরায় আমাদের দেশে আসে। যে কারণে তিনি লােকজনকে বুঝাতে সক্ষম হন যে উক্ত টাকা দেশের বাইরে থেকে আসে। সরকারের রাজস্ব লুট করে আরাম আয়েশ করছেন কেরানি শাহজাহান লস্কর। তিনি নকলনবিশ পদে পল্লবী সাব রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত থাকাকালিন একই দিনে বাড্ডা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দুটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেন। বাড্ডা মৌজায় ২১ নং ওয়ার্ডে ১১৮৬.৩৫ অযুতাংশে ১০ তলা ভবনের ৭ তলায় দক্ষিণ পূর্ব পাশের ৬-এ ও ৬ এর বি, নিচ তলার কার পার্কিংসহ। ইসলাম স্কাই টার্চ নামক ডেভেলপার কোম্পানি থেকে ক্রয় করেন এক কোটি সত্তর লক্ষ টাকা দিয়ে। যার দলিল নং ৭১৩৯/ ২০১৮ । তার স্ত্রী আয়েশা লস্করের নামের দলিল নং ৭১৪০/১৮ । এভাবে তিনি নামে বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। এছাড়াও রামপুরা একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার শিমপাড়া বাজার এলাকায়। সেখানেও নামে বেনামে গড়েছেন তুলেছেন অঢেল সম্পদ। নারী কেলেংকারীতেও পিছিয়ে নেই তিনি। স্ত্রীকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে অন্য নারীদের নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন বলেও সূত্র জানায়। কেরানি শাহজাহান লস্করের ছেলেকে ইটালিতে পড়াশুনার জন্য পাঠিয়েছেন। এছাড়া তার স্ত্রী ও কন্যা লন্ডনে বসবাস করছেন। একাধিক সূত্র জানায়, লন্ডনেও কয়েক কোটি টাকা দিয়ে বাড়ি ক্রয় করে বসবাস করছেন তার স্ত্রী ও কন্যা। একজন সামান্য নকলনবিশ থেকে কেরানি শাহজাহান লস্কর এত ধন সম্পদের হলেন কি ভাবে? এ প্রশ্ন এখন দেশবাসীর। দুদকসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এসব অভিযোগের ব্যাপারে দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও স্বেচ্ছাচারি অবসরে যাওয়া এই কর্মচারী শাহজাহান লস্কারের মোবাইলে বারবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

