গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদকে ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ উঠেছে। বিভাগটির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, তিনি বর্তমানে পদোন্নতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। চুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও আওয়ামী দোসর কায়কোবাদ এখন নতুন এক মিশন বাস্তবায়নে নেমেছেন। এই কাজে তাকে সহায়তা করছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঠিকাদার ও মিলেনিয়াম ট্রেডার্সের মালিক আলী আকবর, ঠিকাদার মোহনসহ আরও কয়েকজন সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি। এ ঘটনায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কায়কোবাদের সঙ্গে যুক্ত একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টেন্ডার-বণ্টন থেকে শুরু করে প্রকল্পের অর্থের সব ফ্লো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তার নেতৃত্বে ঠিকাদার ও কিছু স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তা নানারকম কমিশন ও সুবিধা নিয়ে সরকারি প্রকল্প থেকে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, কায়কোবাদের ঘনিষ্ঠ কিছু মিডিয়া কর্মী তার পক্ষে কাজ করছে। এই দালাল সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ শ্যালক, কেউ ছোট ভাই, আবার কেউ তার ব্যক্তিগত সাপ্লায়ার হিসেবে পরিচিত। তারা কায়কোবাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি আড়াল করতে তথ্য সন্ত্রাস ও দালালির মাধ্যমে সুবিধা অর্জন করছে। “বগলদাবা গোছের সাপ্তাহিক”, “অর্ধবার্ষিক দৈনিক” এবং “হঠাৎ অনলাইন নিউজ” পোর্টালগুলো ব্যবহার করে তারা প্রপাগাণ্ডা মূলক সংবাদ প্রকাশ করছে, যা কায়কোবাদের দুর্নীতিকে ঢেকে রাখে। সুত্র জানিয়েছে, কথিত দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি পত্রিকার সম্পাদক মোহন চক্র গত ৫ আগস্টে ছাত্র জনতার আন্দোলনের পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তাকে মামলা ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিলেন। এছাড়া, যারা অর্থ প্রদান করেনি তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছে আজকের দেশ ডটকম, নিউজ জনতা ডটকম, নতুন দিগন্ত নিউজ ডটকম, খবর জনতা ডটকম, দৈনিক সবুজ বিপ্লব, লাষ্ট নিউজ এবং দৈনিক পাঞ্জেরীসহ আরও বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম। তবে আলী আকবর-মোহন চক্রের সদস্যরা এই সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদকে প্রভাবিত করতে টাকার বিনিময়ে নানা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তারা কখনো বিজ্ঞাপন আকারে প্রতিবাদ প্রকাশ করে আবার কখনও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পক্ষে সংবাদ তৈরি করে তাদের অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এমন কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে প্রেস ও পাবলিক অ্যাক্টের বিপরীত এবং একজন সাংবাদিক বা মিডিয়া কর্মীর কাম্য হতে পারে না। অবশ্যই এই চক্র নিজেদের “সাংবাদিক পরিচয়” ব্যবহার করে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও হুমকি ছড়াচ্ছে। তারা কায়কোবাদের পক্ষে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদকে “তথ্য সন্ত্রাস” আখ্যা দিয়ে প্রিপেইড নিউজ করাচ্ছে। বিশ্বস্ত সূত্রের মতে, কায়কোবাদের নতুন মিশন বাস্তবায়নের জন্য এই চক্র ভয়ংকর পরিকল্পনা নিয়েছে। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা সাংবাদিকদের উপর চাপ, হুমকি এবং এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি আড়াল এবং সাংবাদিকদের উপর প্রভাব বিস্তার সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক। কায়েকবাদের নেতৃত্বে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিন্ডিকেট একাধিক বিভাগে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার, নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী। তারা প্রত্যেকটি টেন্ডার ও প্রকল্প থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নেন। সাধারণভাবে ঠিকাদারদের ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। এই চক্রের কারণে অধিদপ্তরের প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা নেই এবং কর্মকর্তারা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কায়কোবাদের অতীত কর্মকাণ্ডও দুর্নীতিমূলক। ইএম ডিভিশন-৭, ইএম সার্কেল-১ ও চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি প্রকল্পের প্রকৃত কাজ না করে ভুয়া প্রাক্কালন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া, বিদেশ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার ঢাকার মোহাম্মদপুরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং ধামরাইয়ে চলমান ১০ তলা ফাউন্ডেশন ভবন রয়েছে। দুদক, মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার নজর থাকা সত্ত্বেও কায়কোবাদ পদোন্নতির জন্য তৎপর। জানা গেছে, তিনি ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার চেষ্টা করছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারও তাকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য নানাভাবে সহায়তা করছেন। তবে সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অবস্থানের কারণে পদোন্নতি এখনও আটকে রয়েছে। কায়েকবাদের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকরা তাকে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নিয়োজিত রেখেছেন। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলমের সহায়তায় তিনি সরকারি প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তার এই ধাঁচের দুর্নীতি বহু বছর ধরে চলে আসছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কায়কোবাদের নেতৃত্বে প্রকল্পের তদারকি ও কাজের অগ্রগতি প্রায়শই প্রভাবিত হয়। তার অধীনে থাকা ইএম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীরা কাজ না করেও বিল নেন। এছাড়া তিনি মিডিয়ার কিছু অংশকে নিয়ন্ত্রণে রেখে নিজের অনিয়ম আড়াল করতে সফল হয়েছেন। কায়েকোবাদের এই দুর্নীতি চক্র ও মিডিয়ার সঙ্গে সমন্বয় সমগ্র গণপূর্ত অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে সরকারি প্রকল্পের মান ও জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে। এসব গুরুতর অভিযোগের ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

