পটুয়াখালী প্রতিনিধি :পানির কথা বললেই হয়তো নদী অথবা খালের কথা মনে পরবে। কিন্তু সেই নদীতেই আজ আর পানি নেই। অপরিকল্পিত উন্নয়নের থাবায় নিশ্বেস হতে চলেছে এক সময়ে অলিগলির মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলো। আর সবার মুখে তাই এখন একই কথা ‘পানিতে আর পানি নাই’।
পটুয়াখালীর কমলাপুর ইউনিয়নের ভূড়িয়া নদী। স্থানীয়রা জানান, প্রায় ত্রিশ বছর আগে ভূড়িয়া নদী ছিল তীরবর্তী মানুষের জীবন জীবিকার উপায়। সরব ছিল ওই নদীর নৌপথ। লোহালিয়া থেকে আলাদা হয়ে উত্তর দিকে বহমান ভূড়িয়া নদীকে কেন্দ্র করে সহজ ছিল বগাসহ পটুয়াখালী বিভিন্ন এলাকার সাথে নৌ-যোগাযোগ। ওই নদীকে কেন্দ্র করে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে হাটবাজার। প্রায় দুই হাজারের অধিক জেলের জীবিকা ছিল ভূড়িয়াকে ঘিরে। কিন্তু নদীনে শাসন করার নামে ভূড়িয়া নদীর কাশিপুর নামক স্থানে বাঁধ দেয়া হয়েছে। এর ফলে এখন এর নাম হয়েছে কাশিপুর বাঁধ। তবে এখন এই নদীতে নেই পানি, নেই নৌ-চলাচল, জেলেদের তোড়জোড় নিভে গেছে বহু আগে। ফলে স্থানীয় হাটবাজারে পাওয়া যায় না ভূড়িয়া নদীর তাজা মাছ। ওই নদী তীরবর্তী কৃষকরাও অনুভব করেন ভূড়িয়া নদীটি মরে যাওয়ার অভাব। প্রায় ত্রিশ বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীটির বুকে বাঁধ দেয়। বাঁধ দিয়ে ভূড়িয়াকে মেরে ফেলার কারণে ওই নদী তীরবর্তী প্রায় ২৭ গ্রামে এখন আর জোয়ার ভাটার খবর পৌঁছে না। পানির অভাবে ওই নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ৯টি খালও এখন পানি শূন্য। এক বাঁধে বিপর্যয় নেমে এসেছে গ্রামের পর গ্রামে।
এই এলাকার গৃহস্থবাড়ির বউ রহিমা খাতুন বলেন, ‘এই চৌত্র-বৈশাখ মাসে পুহুরে (পুকুর) পানি থাহেনা, আগে আমরা খালের পানিতেই ল্যাদা গুরা গারার খাতা ধুইতাম, কিন্তু এহন খালে পানি নাই, খালি হোডা। বাধ্য হইয়া পানির অভাবে খাতা ধুইনা, রোউদে হুগাইয়াই (শুকিয়ে) রাইতে হেই খাতায় আবার পোলাপান ঘুম ল্যাডাই (ঘুম পরান)।’
স্থানীয় কৃষক সোবাহান মৃধা জানান, পানির অভাবে এই এলাকার কৃষকরা এখন আর রবি শস্য আবাদ করতে পারে না। ভবিষ্যতে এই এলাকায় পানির অভাবে হাহাকার লাগবে বলেও জানান তিনি। তবে কাশিপুর বাঁধ নির্মাণের ফলে চলাচল সহজ হলেও, এই বাঁধের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার মানষের রুটি রুজি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কতৃপক্ষ শুধু ভূড়িয়া নদীকেই হত্যা করেনি, ভূড়িয়া নদীর বাঁধ থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে পার্শ্ববর্তী শৌলা নদীকেও হত্যা করা হয়েছে। শুধু হত্যাই নয় রীতিমতো সরকারের টাকা লুটপাটের উৎসবে পরিনত হয়েছে এটি। তাইতো শুধু শৌলা নদীর উপরই একই স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে গার্ডার ব্রিজ, মাটির বাঁধ এবং স্লুইজ গেট।
জানা গেছে, এলজিইডির তত্ত্বাবধায়নে ওই শৌলা নদীর ওপর ২০১০ সালের ১ আগস্ট ৬০ দশমিক ৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ৬ দশমিক ৯ মিটার প্রস্থ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় করা হয় এক কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৯ টাকা। ওই সময়ে নির্মানাধীন ব্রিজ থেকে মাত্র শতফুট দূরত্বে দক্ষিণপার্শ্বে নদীর ওপর বাঁধ দেয়ার কাজ শুরু হয়। ২০১১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাঁধ নির্মাণের দরপত্রের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড। ব্লু-বার্ড নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫৭ লাখ ৯৫ হাজার ৬৬৫ টাকা ৭০ পয়সা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করা হয়। বাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ১১০ মিটার। এছাড়াও নদীতে বাঁধের প্রায় ২৫০ ফুট দক্ষিণপার্শ্বে এর আগে তৈরি করা হয়েছিল স্লুইস গেট। একদিকে বাঁধ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে নদী। অপরদিকে একই নদীর ওপর প্রায় ২৫০ ফুট ব্যাবধানে তৈরি করা হয়েছে ব্রিজ, বাঁধ ও স্লুইস গেট। ফলে উন্নয়নের নামে শুধুই হয়েছে অর্থ অপচয়। ওই বাঁধের ফলে শৌলা নদী এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো এখন মরতে বসেছে।
পটুয়াখালী জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ছোট বড় প্রায় একশত নদী ও খালের ওপর বাঁধ দিয়ে হত্যা করেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাঙ্গাবালী উপজেলার চরগঙ্গা নদীর ওপর মধুখালি বাঁধ, রামনাবাঁধ নদীর চালিতাবুনিয়া চরলতা বাঁধ, গলাচিপা উপজেলার বোয়ালিয়া, পানপট্টি, উলানিয়া, গোলখালী, আমখোলা, গজালিয়া ও চরকাজল নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে একদিকে নদী মরে গিয়ে জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে, ফসল উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে, বিভিন্ন এলাকার সাথে নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং পেশা হারাচ্ছে নদীর ওপর নির্ভরশীল খেটে খাওয়া মানুষরা। অপরদিকে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষের উপকারের স্বার্থে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বেরিবাঁধ হচ্ছে। তবে আমরা কোনো নদীতে বাঁধ দিচ্ছি না। এমনটি হলে কাগজপত্র দেখতে হবে।’
এদিকে মূল নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকা ছোটো নদী গুলোতে অপরিকল্পিত বাঁধ দেয়ার ফলে হুমকির মুখে পড়ছে বড় নদীগুলো। এরই ফল যেনো লোহালিয়া নদী। স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের সময় লোহালিয়া নদীর সঙ্গে পায়রা নদীর সংযোগ নদী বহালগাছিয়ার খালটি বাঁধ দিয়ে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয় হয়। ফলে বর্তমানে ২নং বাধঘাটের বিপরীতে লোহালিয়া পাড়ে বহালগাচিয়া নদীর মুখে বিশাল ডুবো চর জেগে উঠেছে। এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে এই নদীতে নৌ-যান চলাচল। এরপরই আছে লোহালিয়ার আর এক সংযোগ খাল শৌলা নদী, যেখানেও বাঁধ দেয়া হয়েছে। আর সর্বশেষ ভূড়িয়া নদীর কাশিপুরে বাঁধ দেয়া যেনো নদীর হাত-পাগুলো পঙ্গু করে দেয়া। এখন লোহালিয়ার সঙ্গে কোনো বড় খালের সংযোগ না থাকায় ও নদীর শ্রুত কমে যাওয়ায় দিন দিন মৃত্যুর দিকেই হাঁটছে নদীটি।
জেলা মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউডের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ‘নদী-নালা সমৃদ্ধ পটুয়াখালী অঞ্চল। প্রাকৃতিক এ ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে বাঁধাগ্রস্ত করার পরিনতি স্বাভাবিকভাবেই ভয়াবহ। প্রাকৃতিক পানি প্রবাহকে বাঁধাগ্রস্ত করার প্রক্রিয়া থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে কৃষি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিপর্যস্ত হবে পরিবেশ।’

