রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত আখিরা শাখা নদীর তীর সংরক্ষণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ১ আগষ্ট থেকে দুই দফায় এই কাজের প্রায় ৩০০ মিটারে ধ্বস নামে। পরতে পরতে সাজানো এই দুর্নীতির সাথে জড়িত রয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং পাউবো’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এমন ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আর স্থানীয়দের মধ্যে এই ভাঙ্গন নিয়ে বইছে ক্ষোভ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সরকারের ৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা জলে গেলেও নদীর তীর সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে বসেছে। ইতিমধ্যেই পাউবো কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজের ৫ কোটি টাকার বিল তুলেও নিয়েছে। যা রীতিমত অন্যায় বলে জানিয়েছেন পাউবোর এক সাবেক মহাপরিচালক। প্রকল্পের বিস্তারিত পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানিয়েছে, ‘নদীর তীর সংরক্ষণ, খালবিল পুনঃখনন ও জলাবদ্ধতা নিরসন (১ সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় পীরগঞ্জের চতরা ইউনিয়নে ৮০০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধের কাজ চলছে। ৫ কোটি ৩৮ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪৭ টাকার এই কাজটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা। কাজটি করছেন রংপুরের ঠিকাদার ভরত প্রসাদ। তিনি চিহ্নিতি আওয়ামী ঠিকাদার। স্থানীয়দের অভিযোগ সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও অনেক জায়গায় বসানো ব্লক ধ্বসে পড়েছে এবং ওয়াকওয়ের টাইলস উঠে যাচ্ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, বন্যার সময় এই বাঁধ টিকবে না। তাদের মতে, মাটি সঠিকভাবে ডাম্পিং না করায় তা নরম রয়েছে, যার ফলে সামান্য পানি পেলেই মাটি সরে যাচ্ছে এবং ব্লক ধসে পড়ছে। একজন স্থানীয় ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঠিকাদারের লোকজন তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে ব্লক তৈরি করে বসিয়ে দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তদারকি কর্মকর্তারা এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন। যার ফলে আজকে এই বাঁধে ভয়াবহ ধ্বস দেখা দিয়েছে। এ ব্যপারে চতরা এলাকার গফুর মিয়া বলেন, এ যাবত নদীর বাম পাশের প্রায় ৩০০ মিটার ব্লক দুবার ধ্বসে পড়ছে এবং ঠিকাদারের লোকজন সাথে সাথেই তা মেরামত করছে। কেন ধ্বসে পড়ছে তা জানতে চাইলে বলেন, নদীর পানিতে ব্লক ডাম্পিং নেই যে কারণে পানিতে ঢলে পড়ছে ব্লক। একই এলাকার তৌহিদুল ইসলাম জানান, জোড়াতালি দিয়ে করা হচ্ছে নদী সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ। ঠিকাদার কাজ শুরু করেছে বর্ষা মৌসুমে। ব্লকের কাজে ওই নদীর বালু মাটি ব্যবহার করা হয়েছে। বৃষ্টির কারণেও কিছু কিছু স্থানের ব্লক ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। নদী তীরবর্তী আশ্রয়ণ কেন্দ্রের বাসিন্দা পরিমল চন্দ্র বলেন, ‘নদীর সাইডের মাটি ঠিকভাবে শক্ত করে নেয়নি। পানির মধ্যে ব্লক বসিয়ে কাজ করছে ঠিকাদার। এ জন্য আমার ঘরের সামনে ব্লক ফাটল ধরেছে। তিনি বলেন, নদীর বাম তীর পুরোটাই ধ্বসে যাওয়ার ভয়ে আছি। কারণ এই সাইটের অনেক ব্লক এমনিতেই দেবে গেছে ও ফাঁকা হচ্ছে। তদারকি কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে কাজটি খারাপ হয়েছে। এই কাজটি রংপুরের হাসিবুর রহমান নামে এক ঠিকাদার পেলেও সেটি বাস্তবায়ন করছে রংপুরের ভরদ প্রসাদ নামে এক ঠিকাদার।
আস্থা নেই পাউবো’র তদন্তে-
পাউবোর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ জোনের নাম রংপুর। এই জোনে নদী শাসন, নদী খনন, তীর সংরক্ষণ কিংবা ইমার্জেন্সি কাজ সর্বক্ষেত্রেই অনিয়ম আর দুর্নীতি পাউবো কর্মকর্তারা এসব জেনেও নিরব থাকেন। মাঝেমধ্যে দু’একটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি হলেও তা শুধুমাত্র লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। মূলত পাউবো’র কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তদন্তে পাউবোর কর্মকর্তাদের দিয়েই গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। এতে করে অনায়াসেই পার পেয়ে যায় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। এতে করে সাধারণ মানুষের পাউবোর তদন্তে কোন আস্থা নেই। তারা চায়, পাউবোর অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে করানো হোক অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযান-
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর জোনের বিরুদ্ধে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে দুদক। গত ১১ সেপ্টেম্বর দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, রংপুর এই অভিযান চালায়। অভিযান চলাকালীন দুদক দল পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নের আখিরা শাখা নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য গ্রহণ করে। পরিদর্শন ও স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক দলের কাছে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হয়েছে। এ ব্যপারে স্থানীয়রা জানায়, এমন ভয়াবহ দুর্নীতি প্রমাণ পেয়েও দুদক যদি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও পাউবো’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়- তবে এটা হবে দুঃখজনক। তাদের মতে, দুদকের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রকল্পের দুর্নীতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে দুদক। এ ব্যপারে দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। সংগৃহীত তথ্য ও রেকর্ডপত্র সম্পূর্ণরূপে পর্যালোচনা করার পর এনফোর্সমেন্ট টিম বিস্তারিত প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করবে।
নামেই সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্প-
পাউবো’র এক কর্মকর্তা জানান, এটা নাকি সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্প! বাস্তবে এই প্রকল্পটি ঘিরে চলেছে দুর্নীতির মহোৎসব। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্পের দুই পাড়েই ধ্বসে গেছে। এতে করে সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পের সৌন্দর্য আর নেই। প্রকল্পটি দেখলে যে কেউ বলতে পারবেন যে, এখানে কতটা দুর্নীতি হয়েছে। চলতি বছর ১ আগষ্ট থেকে দুই দফায় এই কাজের প্রায় ৩০০ মিটারে ধসে পড়ে। এতে করে আখিরা নদীর উপর নির্মিত ব্রীজটিও এখন বড় ধরণের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এদিকে সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পটি সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়িঁয়েছে। তাদের শঙ্কা, নদীর পানি আরও বাড়লে বাঁধে বড় ধরণের ধ্বস নামতে পারে। এতে করে বাঁধ সংলগ্ন বাড়ীঘরগুলো ভাঙনের কবলে পড়বে। স্থানীয়দের মতে, এই কাজে দুর্নীতির সাথে জড়িত রয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং পাউবো’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পাউবো’র নির্দেশনা-
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশনা রয়েছে যে, বর্ষা মৌসুম শুরু হলে অর্থাৎ এপ্রিলের পর কোন প্রকল্পের কাজ করা যাবেনা। এই সময়টাতে কেবলমাত্র জরুরি কাজ চলবে। এ ব্যপারে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক ডিজি মোজাদ্দেদ আল ফারুক জানান, বর্ষা শুরু হলে জরুরি কাজ ছাড়া সব ধরনের মাটির কাজ না করার একটা নির্দেশনা থাকে। এমন একটা সময়ে আখিরা নদীর তীর সংরক্ষণের কাজ করাটা ঠিক হয়নি। তিনি আরও জানান, ঠিকাদারকে প্রায় ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করাটাও নিয়মবহির্ভূত হয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য-
আখিরা নদীর সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুরের প্রধান প্রকৌশলী সরফরাজ বান্দা বলেন, আমি নতুন এসেছি। এখন পর্যন্ত কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। তাছাড়া দুদকের অভিযানের বিষয়টিও আমাকে জানানো হয়নি। তবে কোন ধরণের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য-
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম এই কাজের ব্যপারে জানান, কাজ দেবে যাওয়ার বিযয়টি চিঠি দিয়ে ঠিকাদারকে জানানো হয়েছে। তারা মেরামতের কাজ করছে। ইতিপূর্বেওতো আরেক দফা ধ্বসে যায়- তখন কি করেছিলেন? জানতে চাইলে বলেন, ঠিকাদারই ওই কাজ মেরামত করে দিয়েছিল। এই যে বারবার ধসে যাচ্ছে এর কারণ কি? জানতে চাইলে বলেন, নকশায় ক্রটি রয়েছে। মাটিও দুর্বল। ক্রটিপূর্ণ নকশা এবং দুর্বল মাটি জেনেও কেন কাজ করার অনুমতি দিলেন? এ ব্যপারে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। এই প্রকল্পের কাজ নিয়ে শুরু থেকেই যেখানে এলাকাবাসী ক্ষোভ জানাচ্ছিল- সেখানে কাজ শেষ না হতেই ঠিকাদারকে কেন ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করলেন? জানতে চাইলে বলেন, ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মতো পরিশোধ করেছি। এই রকম দুর্বল ও নিম্নমানের কাজ জেনেও টাকা পরিশোধ করাটা কি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল? এর কোন সন্তোষজনক জবাব তিনি দেননি। শুধু বলেন, ঠিকাদারের ডিফেক্ট লাইবেলিটিজ পিরিয়ড ধরা আছে এক বছর। এরমধ্যে কোন সমস্যা হলে ঠিকাদার তার খরচে ঠিক করে দেবে।

