নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্লগার রাজীব হত্যা মামলায় ৮ আসামির বিচার শুরু হয়েছে ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে।
বুধবার ওই আদালতের বিচারক মো. রুহুল আমিন চার্জ গঠনের আদেশ দিলে এই বিচার শুরু হয়। আগামী ২১ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।
চার্জ গঠনকৃত অপর আসামিরা হলেন- নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল বিন নাইম ওরফে দিপু (২২), মাকসুদুল হাসান অনিক (২৬), এহসানুর রেজা রুম্মান (২৩), মো. নাঈম সিকদার ওরফে ইরাদ (১৯), নাফির ইমতিয়াজ (২২), সাদমান ইয়াছির মাহমুদ (২০), রেদোয়ানুল আজাদ রানা (৩০) ও আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের প্রধান শায়খুল হাদীস মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানী। আসামিদের মধ্যে রানা পলাতক।
গত ২৮ জানয়ারি আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের প্রধান শায়খুল হাদীস মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/১০৯/৩৪ ধারায় অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
১১ মাসের মাথায় মামলার তদন্ত শেষে মাথায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নিবারণ চন্দ্র বর্মন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. মাইনুল ইসলাম। মামলা ভিন্ন খাতে নেয়ার অভিযোগে তদন্তভার থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাত শিক্ষার্থী ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি মুহাম্মদ জসীমউদ্দিন রাহমানীর জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। গ্রেপ্তার হওয়া নর্থ সাউথের ছয় শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ, আদালতে দেয়া তাদের জবানবন্দি ও তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আসামিরা জসীমউদ্দিন রাহমানীর বই পড়ে, সরাসরি তার বয়ান ও খুতবায় অংশ নিয়ে ‘নাস্তিক ব্লগার’দের খুন করতে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হন।
বুধবার শুধু আদেশের জন্য ধার্য থাকলেও উভয় পক্ষের আইনজীবীরা শুনানিতেও অংশ নেন। নতুন করে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের প্রধান শায়খুল হাদীস মুফতি জসীমউদ্দিন রাহমানীর অব্যাহতি চেয়ে তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট তৌহিদুল ইসলাম শুনানি করেন।
গত ৮ মার্চ চার্জ গঠনের বিষয়ে উভয়পক্ষের আইনজীবীরা শুনানি করলেও বিচারক আদেশের জন্য আজ বুধবার দিন ধার্য করেন।
ওইদিন আগে রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আবু আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের জন্য শুনানি করেন। এপর আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন কাজল, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা, অ্যাডভোকেট এম এ খায়রুল হক লিটন ও অ্যাডভোকেট মো. ফারুকসহ অন্যান্য আইনজীবীরা শুনানি করেন।
শুনানিকালে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন না করে তাদেরকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য আবেদন জানান।
মুফতী জসীম ছাড়া অন্য আসামিরা সবাই নর্থ সাউথের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বহিষ্কার করেছে।
জেলহাজতে থাকা আসামিরা সবাই হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে মুফতি জসীম তার দেয়া স্বীকারোক্তিতে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার না করলেও স্বীকারোক্তি দেয়া অন্য আসামিরা রাহমানীর নির্দেশেই রাজীবকে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
এছাড়া হত্যার আগে যে দোকান থেকে আসামিরা সিমকার্ড ও চাপাতি-ছুরি কিনেছিলেন, দোকান মালিকেরা এ বিষয়ে আদালতে সাক্ষি হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মামলার বাদী ও নিহতের বাবা নিজামউদ্দিন, ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজন, পুলিশ ও চিকিৎসকসহ ৫৫ জনকে মামলার অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয়েছে। ৭৮ প্রকার আলামতের উদ্ধারের কথা উল্লেখ রয়েছে।
আসামিদের স্বীকারোক্তি মতে রাজীব যেভাবে খুন হয়:
রাজীবকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামাজ কক্ষে নামাজ পড়তে গিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হয়। সেই সময় বাংলাদেশ ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রানা তাদের জানায় জনৈক ব্লগার ‘থাবা বাবা’ ইসলাম ও মহানবী (স.) এর নামে বাজে কথা লিখছে। তাকে হত্যা করতে হবে। না হলে ইসলাম ও ঈমান রক্ষা করা যাবে না। এভাবেই রানা তাদের রাজীবকে হত্যার জন্য উদ্বুব্ধ করে। সেই মোতাবেক থাবা বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা।
রাজীবকে হত্যার জন্য তারা দু’টি গ্রুপ তৈরি করে। একটি ‘ইনটেল’ গ্রুপ ও অন্যটি ‘এক্সিকিউশন’ গ্রুপ। দুই গ্রুপে ৩ জন করে ৬ জন সদস্য ছিল।
ইনটেল গ্রুপ রাজীবের ব্লগে ও ফেসবুকে ঢুকে ‘থাবা বাবা’ ব্লগ থেকে তার ছবি সংগ্রহ করে। এরপর একদিন ‘ইনটেল গ্রুপ’ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে গিয়ে রাজীবকে শনাক্ত করে আসে। ওই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা রাজীবকে রেকি করা শুরু করে। ওইদিন ইনটেল গ্রুপের দুই সদস্য রাজীবের সঙ্গে বাসে উঠে। একজন সাইকেলযোগে বাসে রাজীবকে অনুসরণ করে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত গিয়ে তার বাসা চিনে আসে। বাসা চিহ্নিত করার পর ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে নিয়মিত রেকি করা শুরু করে। এসময় তারা রাজীবকে হত্যার জন্য ঢাকার নর্দ্দা থেকে চাপাতি-ছুরি ও নতুন মোবাইলের সিম ও সেট কিনে।
ঘটনার দিন এক্সিকিউশন গ্রুপের সদস্যরা বিকেল ৪টার দিকে পল্লবীর পলাশ নগরে রাজীবদের বাসার গলিতে অবস্থান নেয়। স্কুল ব্যাগ, ক্রিকেটের ব্যাট ও বল ইত্যাদি সঙ্গে রাখে। ইচ্ছাকৃতভাবে ক্রিকেট খেলার নামে তারা বল রাজীবদের বাসায় ফেলে দেয়। পরে বল আনার নাম করে পুনরায় নিশ্চিত হয় সেটি রাজীবের বাসা কি না। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে পৌনে ৮টার দিকে রাজীব যখন পল্লবীর বাসার দিকে যাচ্ছিলেন তখন ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে অনুসরণ করে। বাসার গেটের কাছাকাছি পৌঁছার পর এক্সিকিউশন গ্রুপের রানা তাকে রিকশা থেকে ধাক্কা দেয়। ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপু চাপাতি দিয়ে গলা থেকে মাথা আলাদা করার জন্য কোপ দেয়। কোপে রাজীব মারাত্মক আহত হয়ে চিৎকার করে দেয়ালের ওপর পড়ে যান। তারপর ফয়সাল রাজীবকে চাপাতি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। আসামি অনিকও তার হাতে থাকা ছোরা দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। ওই সময় কেউ একজন খুন খুন বলে চিৎকার করে এগিয়ে আসতে দেখে তারা পালিয়ে যায়।
রাজীবকে হত্যা করার সময় আসামি দীপের এলোপাথাড়ি কোপের একটি কোপ অনিকের পায়ে লাগে। এতে তার পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের কিছু অংশ কেটে যায়। তাই যাওয়ার সময় অনিক রুম্মানের সঙ্গে কাকরাইল এলাকায় জুতাজোড়া খুলে জাতীয় চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তরের পুকুর পাড়ে ফেলে যায়।
উল্লেখ্য, গত ১৫ বছর ফেব্রুয়ারি বাসায় ফেরার পথে পল্লবীর কালশীর পলাশনগরে অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে নিহত হন শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্ত রাজীব হায়দার শোভন।

