গাজীপুরের শ্রীপুরে থানা পুলিশের অবহেলায় মৃত্যুর ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও এক নবজাতকে দাফন করতে পারেননি তার পরিবার। মঙ্গলবার (১১ ফেব্রæয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিওতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই নবজাতকের মৃত্যু হয়। এর আগে ২৯ জানুয়ারি দুপুর ২ টায় জমি সংক্রান্ত বিরোধে প্রতিপক্ষ রফিক ও তার ৪ জন সহযোগীরা গৃহবধূর বসত বাড়ীর উঠানে গিয়ে তাকে লাথি মরালে আট মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা গৃহবধূ আহত হয়। পরে স্বজনরা তাকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমিক চিকিৎসাধীন রাখে। এদিন রাতেই গৃহবধূর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শ্রীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ সুরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রতিপক্ষ রফিকের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে উল্টো গৃহবধূর বাড়ীতে গিয়ে তার স্বজনদের শাসিয়ে আসে। শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গৃহবধূর অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখে স্বজনরা। হাসপাতালের চিকিৎসক জানান অন্তঃস্বত্ত্বা গৃহবধূর অবস্থা ভালো না। ওই হাসপাতালে সিজার করতে বিলম্ব হওয়ায় গৃহবধূর স্বামী তার স্ত্রীকে ৭ ফেব্রুয়ারি একটি প্রাইভেট হাসাপাতালে নিয়ে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে নবজাতকের জন্ম দেয়। পরে নবজাতকের অবস্থার অবনতি হলে ওই দিনই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিওতে চিকিৎসাধীন রাখে। সেখানে চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এরপর ওইদিন রাতেই নবজাতকের লাশ নিয়ে থানায় আসলে পুলিশ নবজাতকের মা, বাবা ও স্বজনদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করেন ওই দম্পত্তি। অন্তঃস্বত্ত্বা গৃহবধূকে হামলার ঘটনায় নবজাতকের লাশ নিয়ে অভিযোগ দিতে চাইলে অভিযোগ না নিয়ে কেন থানায় আসলেন? বলে তাদেরকে থানা থেকে বের করে দেন। পরদিন বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা শুনতে পেয়ে ওই উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ সুরুজ্জামান গৃহবধূর স্বামীকে নবজাতকের লাশ নিয়ে থানায় আসতে বলেন। ভুক্তভোগী মাজাহারুল ইসলাম ও মিম আক্তার দম্পত্তি শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের উত্তর পেলাইদ গ্রামের বাসিন্দা। এটি তাদের দ্বিতীয় সন্তান (ছেলে)। অভিযুক্তরা হলন একই গ্রামের আব্দুল আউয়ালের ছেলে রফিক, রফিকের স্ত্রী আফরোজা, তাদের ছেলে আরিফ এবং রফিকের মামাসহ তাদের ৪/৫ জন সহযোগী। গৃহবধূ মিম আক্তার বলেন, ওদের (হামলাকারী) জন্য ১০ মাস ১০ দিনও পেটে রাখতে পারিনি আমার সন্তানকে। আমার প্রথম বাবু নরমাল ডেলিভারীর মাধ্যমে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তাদের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দ্বিতীয় সন্তানের জন্য আমার সিজার করতে হলো। ছোট বাচ্চাকে (প্রথম বাবুকে) বাড়ীতে রেখে আমি হাসপাতালে ১০দিন পড়ে রইলাম। সিজার করানের সময় রক্ত শুন্যতার কারণে আমি দুইদিন কানে শুনতে পাইনি। একটা মায়ের কাছ থেকে একটা শিশু চলে যাওয়া যে কত কষ্টের তা মা ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না। আমার বাড়ীতে এসে স্বামীকে দা, লাঠি, লোহার রড দিয়ে মারতে থাকলে আমি বাধা দেওয়ায় রফিক আমার তল পেটে একাধিকবার লাথি মারে। এসময় আমি অচেতন হয়ে পড়ে যাই। নবজাতকের ফুফু রিমি আক্তার বলেন, পুলিশ বলছে নবজাতকের লাশ নিয়ে থানায় আসার জন্য। আমরা লাশ নিয়ে থানায় অবস্থান করছি। নবজাতককে রাতের বেলা মর্গে রাখা যাবে না বলে জানান পুলিশ। আমাদেরকে লাশ নিয়ে থানায় অবস্থান করতে বলেছে পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে নবজাতকের লাশ নিয়ে গাজীপুর শহীদ তাজ উদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। অভিযুক্ত রফিক বলেন, তাদের সাথে আমাদের জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। আমরা গৃহবধূর পেটে লাথি দেয়নি। উল্টো তারা আমাকে মারধর করেছে। শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ সুরুজ্জামান বলেন, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে গৃহবধূর স্বজনদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। সাংবাদিকদেরকে থানায় তার সাথে দেখা করতে বলেন। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন মন্ডল বুধবার সন্ধ্যায় জানান, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে দারগো টাকা নেয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। নবজাতকের লাশ ময়না তদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজ উদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে।

