ডাঃ আব্দুল মালেক ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার একজন নির্লোভ, আদর্শবাদী ও জ্ঞানী রাজনীতিবিদ। তিনি রাজনীতির অঙ্গনে একজন নীতি-আদর্শে অবিচল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় যখন দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ ক্ষমতা ও অর্থের লোভে দল বদল এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে রাজনীতি ব্যবহার করছিলেন, তখন ডঃ মালেক নিজের আদর্শ থেকে সরে আসেননি। পাকিস্তান বিরোধী বক্তব্য “তোমরা খাও দুধ কলা আর আমরা খাই আইয়ুবের ” এর কারণে ডাঃ আব্দুল মালেককে জেলে যেতে হয়েছিল। তাকে সেই সময় বহু নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। ডাঃ মালেক একজন পেশাদার ডাক্তার ছিলেন, কিন্তু তিনি চিকিৎসা পেশা ত্যাগ করে দেশের স্বার্থে পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দলের প্রতি তাঁর একাগ্রতা ও নিষ্ঠা এতটাই ছিল যে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দলের কাজ চালিয়ে গেছেন। ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সাধারণ মানুষকে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এক সময় তার বক্তব্য শুনতে দুরদুরান্ত থেকে ছুটে আসতো সাধারণ মানুষেরা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি উজ্জ্বল দিক হলো-ন্যাপ দলের হয়ে তিনি রাশিয়া সফর করার সুযোগ পেয়েছিলেন। যখন অনেকেই অর্থ ও ক্ষমতার লোভে দল বদল করে এমপি ও মন্ত্রী হচ্ছিলেন, তখন ডাঃ মালেক তাঁর নীতিতে অবিচল থেকে রাজনীতি করে গেছেন। তাঁর এই নীতিগত অবস্থান তাঁকে সবার মাঝে আলাদা করে তুলেছিল। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে আর্থিক অনটন ছিল দুঃখজনক। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে তাঁর মেয়ে, স্কুল শিক্ষিকা স্মিতা, অকালেই মারা যান। এই ঘটনা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ডঃ মালেক ন্যাপ দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হন। তবে তাঁর সাংসদ জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কেয়ারটেকার সরকারের বিল পাশের পর সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে তিনি অল্প সময়ের জন্যই সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ডঃ মালেক আর কখনো সংসদ সদস্য হতে পারেননি। বার্ধক্যজনিত রোগ ও শারীরিক দুর্বলতায় তাঁর শেষ জীবন কাটে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁওসহ পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। ডা: আব্দুল মালেক ছিলেন এক নির্লোভ রাজনীতিবিদের প্রতীক। তাঁর জীবন থেকে অনেকেই নৈতিকতা, আদর্শ ও ত্যাগের শিক্ষা নিয়েছেন অনেক স্থানীয় নেতারা ।

