নীলফামারীতে এ বছর নানা জাতের বিপুল পরিমাণ বেগুন উৎপাদন হয়েছে। বেগুনসহ অন্যান্য সবজির পাইকারি বাজার বসে জেলা শহরের আনসার ক্যাম্প সবজি বাজারে। প্রতিদিন সকাল ছয়টায় বসে আর দুপুর ২টায় শেষ হয় পাইকারি বাজার। এ বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মণ বেগুন যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন হাট বাজারে। ২০-২৫ টাকা কেজি দরে কৃষকের কাছে থেকে বেগুন কিনছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা (আড়তদাররা)। তবে এই বেগুনই ১০০ গজ দূরে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে। হাত বদলেই প্রতিকেজি বেগুনের দাম ১৫-২০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়িরা। শুধু বেগুনেই নয়, আলু, মুলা, পাতা কপি, ফুল কপি, বরবটি, শিম, ধুনে পাতা, লাল শাক, গাজর, লাউসহ প্রত্যেকটি সবজিতে ভোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। লাগামহীনভাবে চলছে এসব সবজির বাজার। বৃহম্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) সকালে নীলফামারী শহরের ওই পাইকারী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাম গঞ্জ থেকে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য আলু, বেগুন, মরিচ, পেঁয়াজসহ অন্য সবজি রিকসা, ভ্যানগাড়ী, অটোরিকসা ও রিকসায় করে পাইকারী বাজারে বিক্রি করতে আসেন ওই বাজারে। সেখান থেকে আড়তদাররা (পাইকাররা) সবজি কিনে দ্ধিগুন দামে ভোক্তা ও খুচরা ব্যবসায়ির কাছে বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।
জেলা সদরের কুন্দুপুকর ইউনিয়নের পাটকামড়ি গ্রামের কৃষক ইউনুস আলী (৪৬) জানান, ‘এবার দেড় বিঘা জমিতে বেগুনের চাষ করেছি। ফলনও হয়েছে বাম্পার। পুঁজি ঘাটিয়ে হাঁড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে আবাদ করে বাজারে এলেই পাইকারী ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে লস করে বিক্রি করতে হয়। তাদের একচেটিয়া ব্যবসায় কৃষক নিরুপায়। তারা যেদামে কিনবে আমাদের সেই দামে দিতে হবে। খুচরা ব্যাবসায়ি, আড়তদারদের হাত বদলে কৃষক ও ভোক্তরা হচ্ছে ভোগান্তির শিকার।’তিনি বলেন, ‘আড়তদার কৃষকদের কাছ থেকে লম্বা বেগুন ১৩ থেকে ১৪ টাকা কেজি দরে অর্থাৎ ৫২০ থেকে ৫৬০ টাকা মণ দরে কিনছে। অথচ এই বেগুনে সুবিধা নিচ্ছে আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। দ্ধিগুন দামে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছে তারা। হাত বদলে ১৪ টাকার বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকা।’
একই গ্রামের বেগুন চাষি ওবায়দুল ইসলাম (৪৫) জানান, ‘আজকে নীলফামারী আনসার ক্যাম্প পাইকারী বাজারে ৫০ কেজি গোল বেগুন নিয়ে আসি। সেখানে প্রতিকেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাদ্য হয়েছি। আর আড়ত থেকে কিনে পাশেই ১০০ গজ দূরে খুচরা বাজারে ওই বেগুন ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ কৃষক ব্যবসায়িদের কাছে জিম্মি।’ বেগুন চাষিরা বলছেন, বেগুনের বাজার একেকদিন একেক রকম হয়। তবে কৃষকের চেয়ে ব্যবসায়িরা বেশী লাভবান হচ্ছে। কৃষক প্রতিমন বেগুন বিক্রি করছে ৫২০ থেকে ৫৬০ টাকা। প্রকার ভেদে ওই বেগুন খুচরায় বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা মন দরে। সদর উপজেলার টুপামারী ইউনিয়নের রামগঞ্জ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিকেজি লম্বা বেগুন ৩০-৩৫ টাকা ও প্রতিকেজি গোল বেগুন ৪৫-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ কৃষকরা প্রকার ভেদে প্রতিকেজি বেগুনে লস করছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। অপরদিকে, খুচরা ব্যবসায়িরা লাভ করছেন প্রতি কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা। জেলা শহরের কিচেন মার্কেটের খুচরা ব্যবসায়ি নুর ইসলাম বলেন, ‘উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারের সরবারহ কম। এছাড়াও কাঁচা সবজি বিক্রি না হলে পচে যায়, খুচরা বিক্রিতে কম হয় ও বাসি হলে ঘাটতি হয়। তাই কেজি প্রতি কিছু লাভ করতেই হবে। তবে কিছু দিন পর আরও সরবারহ বাড়বে। তখন বাজারে বেগুনসহ সবজির দাম কমে আসবে।’ জেলা শহরের কিচেন মার্কেটে গোল বেগুন কিনতে এসে গৃহিনী সুফিয়া বেগম বলেন, ‘এই মৌসুমে শীতের সবজিতে বাজার সয়লব অথচ অল্প আয়ের মানুষ সবজি কিনতে এসে দিশাহারা হয়ে পড়েছে। গোল বেগুনের চপ তৈরী করতে চেয়েছিলাম, কিন্ত ৫০ টাকা কেজিতে বেগুন খাওয়ার সামর্থ নেই। তাই বেগুন না নিয়ে ফিরে যাচ্ছি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক আহমেদ বলেন, ‘এবার সদরে এক হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে সবজির চাষ হয়েছে। এ বছর বেগুনের ফলন ও বেগুন চাষ দুটিই বেশ ভালো হয়েছে। গত বছরের চেয়ে এবার বাজারে সরবারহ প্রচুর। তবে কৃষক ভাল দাম পাচ্ছে না। তিনি বলেন, হাইব্রিড জাতের বেগুন বেশী চাষ হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে বেগুন চাষিদের সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

