কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ উত্তরা ব্যাংক পিএলসির প্রধান কার্যালয় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। এতে নিয়মিত কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রবিউল হোসেন নিরাপত্তা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্ণরের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেছেন।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন ৬ আগস্ট থেকেই উত্তরা ব্যাংকটির দ্বিতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা আবু মোহাম্মদ আহসানুল হাবিব ও মোহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অবরোধ করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে আসতে পারছেন না এমডি ও সিইও মোহাম্মদ রবিউল হোসেনসহ অনেক কর্মকর্তা। এতে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির এমডি ও সিইও মোহাম্মদ রবিউল হোসেন নিরাপত্তা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর আহসান এইচ মনসুরের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেছেন। লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশি সহায়তা চেয়ে নিকটবর্তী মতিঝিল থানায় যোগাযোগ করলে জনবলসংকটের কথা জানিয়ে বলা হয়, এই মুহূর্তে কিছু করার নেই।
সোমবার (১৯ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা গেছে, মতিঝিলে সিটি টাওয়ারের কাছেই উত্তরা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের রিসিপশনে নিরাপত্তাকর্মীদের পাশে বসে আছেন দুজন তরুণ। নিরাপত্তাকর্মী এ সময় কোনো কথা বলতে ভয় পাচ্ছিলেন। একটু এগিয়ে বসে থাকা দুই তরুণের কাছাকাছি যেতেই একজন চলে যান। অন্যজন নিজেকে রাশেদ নাম পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি ব্যাংকটির আশুলিয়া শাখায় কর্মরত আছেন। তিনি এখানে কেন, জানতে চাইলে রাশেদ বলেন, ‘আমাদের দাবি দাওয়া আছে।’ দাবি দাওয়া কী কী, জানতে চাইলে তিনি মোহাম্মদ আহসানুল হাবিবের নাম উল্লেখ করে বলেন, উনি কথা বলবেন।’ মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে আহসানুল হাবিব বলেন, ‘আমাদের অনেক কথা আছে। আমি এই মুহূর্তে একটি মিটিংয়ে আছি। একটু পর কল দিয়ে বিস্তারিত জানাব।’ কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরও তিনি আর কিছু জানাননি। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দেওয়া অভিযোগে এমডি ও সিইও মোহাম্মদ রবিউল হোসেন উল্লেখ করেন, ‘গত ৬ আগস্ট থেকে ব্যাংকের শাখা পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বহিরাগতের সঙ্গে নিয়ে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ঢুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলেছেন, অফিসের আসবাব ভাঙচুর করছেন। আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন ও কর্মকর্তাদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছেন। ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে দিনাতিপাত করছেন। নিকটস্থ থানায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল না থাকায় সেখানে যোগাযোগ করেও তেমন কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।’ এমডি ও সিইও রবিউল হোসেন আরও বলেন, ‘ওই দিন সকালে ব্যাংকের সাবেক ও চাকরিচ্যুত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বহিরাগতদের নিয়ে ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ডদের বাধা না মেনে প্রধান কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। আমাকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করেন। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমাকে পদত্যাগ করতে বলেন। এ সময় আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তারা অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন। তাদের ইন্ধন দেন বর্তমানে ব্যাংকের চাকরিতে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা, যাদের নামে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে যুক্ত থাকা, অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরদিন ৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ওই কর্মকর্তারা শতাধিক বহিরাগতসহ সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের প্রতিটি ফ্লোরে গিয়ে মারমুখী আচরণ করেন। এরপর ৮ আগস্ট থেকেই তারা অফিস চলাকালে দল বেঁধে ব্যাংকের প্রধান ফটকে দায়িত্বরত গার্ডদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে ভেতরে অবস্থান করছেন। তারা অফিস সময়ের শুরুতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ঢোকার প্রধান ফটকের দরজা বন্ধ করে দেন। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যাংকে ঢুকতে না পেরে ফিরে যান। তারা প্রতিদিন নৈরাজ্য সৃষ্টি করছেন। আমি বাসায় অবস্থান করে দাপ্তরিক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি। এ পরিস্থিতিতে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যাংকটিকে বাঁচাতে ও সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় গভর্ণরের জরুরি হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।’ এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, বিষয়টি গভর্ণরের নজরে দেওয়া হয়েছে।

