বন্যা-খড়া নেই, পণ্যের ঘাটতি নেই, উৎপাদনেও ঘাটতি নেই। সড়কে চাঁদাবাজিও নেই। এমনকি সরবরাহব্যবস্থাও স্বাভাবিক। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে, দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি পজেটিভ। সর্বোপরি দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পর দেশের সবকিছুই ভালো যাচ্ছে। কিন্তু বাজারে নিত্য পণ্যের দাম এখনো লাগামহীন। পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে এখনও সক্রিয় ভারতে পলায়নকারী শেখ হাসিনার সিন্ডিকেট। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনও এই সিন্ডিকেট শেখ হাসিনা সরকারকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সহযোগীতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। এমনকি ওই সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের জঙ্গী বা মাদকাসক্ত বলে উসকে দিয়ে দেশে হত্যাযজ্ঞ চালাতে সমর্থন দিয়েছে। আবার শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যাযজ্ঞকে স্বাভাবিক কর্মকান্ড হিসেবেও আখ্যা দিয়েছে। একসময়ে এভাবে হাসিনা সরকারকে সমর্থন অনদিকে সিন্ডিকেট করে পণ্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে অবৈধভাবে অর্থ কামিয়ে তা আওয়ামী লীগের কোষাগারে জমা দিতেন। মাঝ থেকে ভোক্তাকে শুষে নিয়েছেন। এতে ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে লাগামহীন। কারণ ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘ সময় ধরে চলমান অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষের আয় বাড়েনি। আর সুযোগ নিয়ে ভোক্তাকে জিম্মি করে পণ্য মূল্যের দাম বাড়িয়ে করপোরেট সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
ক্ষমতা ছেড়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালালেও তার গড়া সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে এখনো বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেটের হোতা হলো- এস আলম, বসুন্ধরা, সিটি, মেঘনাসহ বিভিন্ন সময়ে সরকারের দালাল হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ। এই সিন্ডিকেটটি নিজেরা অবৈধবাবে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করে যেমন পাচার করেছেন, তেমনি শত অন্যায়-অবিচার বা দেশব্যাপি হত্যাযজ্ঞ চালালেও আওয়ামী লীগ সরকারকে অন্ধের মত সমর্থন দিয়ে গেছেন। আর তাই হাসিনা ভারতে পলায়ন করলেও তার স্বার্থ হাসিলে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে বাজার ব্যবস্থাকে এখনো অস্থিতিশীল করে রেখেছে এই করপোরেট চক্র।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সপ্তাহখানেক ঘাপটি মেরে থাকার আবার বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমেছে। তারপরও কেন বাজার অস্থিতিশীল হবে। তাই বাজার ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে করপোরেট সিন্ডিকেট ভাঙ্গা এবং দায়ীদেরকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। যাতে করে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরণের সিন্ডিকেট করে ভোক্তাদের ঠকাতে না পারে। এছাড়া সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ, পাইকারি বাজারে কয়েলি প্রথার বিলোপ ও নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভোক্তা অধিদপ্তরের পাশাপাশি নিয়মিত সাধারণ শিক্ষার্থীরাও যাতে বাজার তদারকিতে অংশগ্রহণ করে সেই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের বাজার তদারকিতে সুফল দেখা গেছে। ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বাজার তদারকির পরামর্শ দিয়েছেন। গত রোববার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। পণ্যের দাম কমাতে এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। এ ছাড়া অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পরই বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে দ্রব্যমূল্য কমানোর উদ্যোগ নেবে অন্তর্বর্তী সরকার। অবশ্য এখন থেকে কেউ সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ালে ছাত্ররা নিজেরাই তাদেরকে খুঁজে বের যথোপযুক্ত শাস্তি দেবে বলে জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নের্তৃবৃন্দ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজো কমটির সদস্য আকরাম হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, ছাত্ররা দেশ সংস্কারের কাজে নেমেছে। মাত্র ১০ দিন হলো। রাষ্ট্র ক্ষমতার সিন্ডিকেট যেহেতু ছাত্ররা ভাঙতে পেরেছে, তেমনি বাজার সিন্ডিকেটও ভেঙ্গে ফেলবো।
হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম সপ্তাহে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ভোক্তা অধিদফতরের তদারকির কারণে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম একটু কমে এলেও চলতি সপ্তাহে ফের বাড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম। এছাড়াও নিত্যপণ্যের বাজারে চাল, চিনি, পেঁয়াজ ও ডিমের দাম বেড়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দাম বেড়ে প্রতিকেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩২০-৩৫০ টাকায়। প্রতিকেজি পেঁয়াজে ১০ টাকা দাম বেড়ে ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের প্রধান খাদ্য চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২-৪ টাকা পর্যন্ত। একটি করপোরেট সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন থেকে চালের দাম লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে চলছেন।
সূত্র মতে, দীর্ঘদিন থেকে নিত্যপণ্যের বাজার লাগামহীন। করোনার সময় সরবরাহ সঙ্কট দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। মাঝে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাতে দাম বাড়িয়েছে। অবশ্য যতটুকু না আন্তর্জাতিক বাজার বা ডলারের দামের প্রভাব পড়েছে, এর চেয়ে বেশি বেড়েছে সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে। সবজির দামের সঙ্গে ডলার ও আন্তর্জাতিক বাজার খুব বেশি সম্পৃক্ত নয়। কেবল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহণ ভাড়া ও কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে এতে। কিন্তু গত এক বছরে সবজির দাম বেড়েছে বেপরোয়া গতিতে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, আটা-ময়দা-চিনি, পেঁয়াজ-রসুন-আদা, মাছ-গোশতসহ সব পণ্যের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা।
শিল্পপণ্যের দামও বাড়ছে আকাশছোঁয়া গতিতে। চার প্যাকেটের নুডলসের দাম ছিল ৫০ টাকা। এখন তা বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে। ১৭ টাকার কাপড় কাচা হুইল সাবান এখন ৩০ টাকা, আর ৩৫ টাকার শরীরে ব্যবহার করা সাবান এখন ৬৫ টাকা, ৬০ টাকা দামের চানাচুরের প্যাকেট এখন ৯০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। অথচ ডলার, কাঁচামাল ও পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম এত বাড়ার কথা নয়। সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণেই এগুলোর দাম বেশি মাত্রায় বেড়েছে। এর প্রভাবে একদিকে মানুষের আয় কমেছে, অন্যদিকে পণ্যমূল্য বাড়ায় ব্যয় বেড়েছে লাগামহীনভাবে। এতে দেশে গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে গত জুলাই মাসে। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাসটিতে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে যায়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে মূল্যস্ফীতিও যেন লাফ দিয়ে বেড়ে গেছে। এত দিন ধরে মূল্যস্ফীতির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছিলেন অর্থনীতিবিদেরা। বিবিএসের হিসাবে, গত জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি জুলাই মাসে বেড়ে ১৪ শতাংশ ছাড়াল। যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভোক্তা অধিদফতর মাঝে অভিযান চালিয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পণ্যের আমদানি অনুমতি না দেয়ায় আরও কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরদিকে এতোদিন কৃষি সচিব বা মন্ত্রী গল্প করতেন দেশে এটার বাম্পার ফলন হয়েছে। ওটার বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষির ১৯টি বিভাগ পণ্য উৎপাদন ও বাজারযাত বা সরবরাহে কাজ করলেও সঠিক তথ্য কখনও প্রদাণ করেনি বলেই বাজারে নানামুখী সঙ্কট তৈরি হয়েছে। একইভাবে প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ডিজি যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ বা সরবরাহে কাজ করার কথা তারাই এস আলম, বসুন্ধরা, সিটি, মেঘনা ও কাজী ফার্মের কাছ উৎকোচ নিয়ে দাম বাড়তে সাহায্য করেছেন। আবার সরকারের সচিব এবং অনেক মহাপরিচালক দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সিন্ডিকেট করে এসব প্রতিষ্ঠানকে দাম বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়ে পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগও নিয়েছেন। এভাবেই সিন্ডিকেট দাম বাড়ানোর সুযোগ পেতো বলে জানান সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা। এদিকে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনা ভারতে পলায়নের পর পণ্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিদফতর গত ৬ আগস্ট থেকে মাঠে থাকলেও বিএসটিআই, কৃষি, প্রাণি সম্পদ বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের কোন পদক্ষেপ নজরে পড়েনি।
সূত্র মতে, হাসিনা সরকারের সিন্ডিকেট একসময় একেক পণ্যকে টার্গেট করে দাম বাড়িয়ে নিজেরা যেমন লাভবান হয়েছেন আবার বড় অঙ্কের অর্থ হাসিনার ব্যক্তিগত কোষাগারে দিয়েছেন। এর মধ্যে পান-সুপারি থেকে শুরু করে চাল-ডাল, পেঁয়াজ কিছুই বাদ যায়নি। নিত্যপণ্যের বাজারের সিন্ডিকেট এখনও আগের চক্রের হাতেই রয়ে গেছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেছেন, দীর্ঘদিন থেকে চেষ্টা করছি নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র যখন সহযোগীতা করে সিন্ডিকেটকে তখন কিছু করার থাকে না। তিনি বলেন, সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে এস আলম, বসুন্ধরা, সিটি, মেঘনা ও কাজী ফার্মে যখন অভিযানের জন্য লোক পাঠিয়েছি আমাকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে ডেকে সাবেক মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস গালিগালাজ পর্যন্ত করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর প্রথমদিন থেকেই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করে যাচ্ছি। যেহেতু পুলিশ, রাজনৈতিক দল ও সিটি করপোরেশনের চাঁদাবাজি বন্ধ হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের হস্তক্ষেপও থাকছে না, তাই এখন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই বাজার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

