রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে কোনো প্রভাব পড়েনি খুলনার খুচরা বাজারগুলোতে। এরই মধ্যে গত বছরের তুলনায় রমজানে কলাসহ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ইফতার-পণ্য ও নিত্যপণ্যের দাম হাঁকা হচ্ছে ইচ্ছামতো। প্রায় ভোক্তা-অধিকারের অভিযান চললেও খুলনায় বাজার সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, যা ইতিমধ্যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে খুলনার একাধিক খুচরা বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের খুলনার রোজার বাজার বেশি বেসামাল। গত বছরের তুলনায় এবার খুলনার বাজারে রোজার পণ্যর দাম দ্বিগুণের বেশি। কলা, বরই, খিরাই, কাঁচা মরিচ, ডিম, আলু ও বিভিন্ন ধরনের মসলা জাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে দিগুন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খিরাই কেজিতে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, বরই কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেরেছে, মরিচ ২৫ থেকে ৩০ টাকা, আলু ১০ থেকে ১৫ টাকা, প্রকারভেদে বিভিন্ন মসলা কেজিতে ২০০-৩০০ টাকা ও প্রতি পিচ ডিমে ৫০-৮০ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে। রোজা শুরুতেই হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।
রোজার সময় কলার চাহিদা সবসময়ই । রোজাদাররা ইফতারে ও সেহরির সময় কলা খেয়ে থাকে। খুলনার পাইকারি কলার আরতে গিয়ে দেখা যায় , কাঠালি কলা ১০০ পিস ৬০০- ৭০০ টাকা , পিস পরে ৬-৭ টাকা করে আর খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৯ থেকে ১০ টাকা পিস। চাঁপা কলা ১০০ পিস ৩৫০- ৪৫০ টাকা , পিস পরে ৩.৫০ / ৪.৫০ পয়সা আর খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৬ থেকে ৭ টাকা পিস। সাগর কলা ১০০ পিস ৪৫০ – ৫৫০ টাকা , পিস পরে ৪.৫০ থেকে ৫.৫০ পয়সা যা খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকা। বরই বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি।
খুলনা সোনাডাঙা পাইকারি কাচাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, খিরাই পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা কেজি। যা মাত্র ৪ / ৫ দিন আগে ছিল ৩৫-৪০ টাকা কেজি। পাইকারিতে ২০ টাকা কেজির আলু বিক্রি হচ্ছে ২৯-৩০ টাকা, ৪৫ টাকা দরের কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি। মাঝারি সাইজের একপিচ লেবু বিক্রি হচ্ছে ১০/১২ টাকায়। একই সাথে দাম বেড়েছে বরবটি, পেঁপে, ঢেড়স, পটল, সজিনা ও লাউসহ অন্যান্য সবজির দাম। এসব সবজি খুচরা বাজারে প্রকারভেদে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
সপ্তাহের ব্যবধানে খুলনায় প্রতিটি ডিমের দাম ৫০-৮০ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ায় এমনিতেই বিপাকে পড়েছে খুলনার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এর মধ্যে রমজানের শুরুতেই ডিমের দাম বাড়ায় অস্বস্তি বেড়েছে তাদের।
রমজানের অন্যতম ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ খেজুর। নিত্যপণ্যের পাশাপাশি তাই খেজুর কিনতে খুলনার দোকানে দোকানে ভিড় করছেন ক্রেতারা। গত বছরের তুলনায় এ বছর খেজুরের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ বছর কেজিপ্রতি মানভেদে খেজুরের দাম বেড়েছে ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।খুলনার বড়বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এ বছর মাঝারি মানের কামরাঙা মরিয়ম খেজুর প্রতি কেজি ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিয়ম ৮৫০ ও ইরানি মরিয়ম ১ হাজার টাকা। বাজারে তিউনিসিয়ান খেজুর প্রতি কেজি ৬০০ টাকা, সৌদি আম্বার খেজুর ২ হাজার ২০০, আজোয়া (ছোট) খেজুর ১ হাজার ২০০, মদিনার সুগাই খেজুর ১ হাজার ২০০ ও মেগজল আম্বার খেজুর ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া নাখাল মরিয়ম খেজুর ৫৫০, জিহাদি খেজুর ৫০০, সুকাই খেজুর ৪৫০, লিবিয়ান খেজুর ৫০০, বরই খেজুর ৫০০, ঢালাকাচা খেজুর ৫২০ ও দাবাস খেজুর ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে এসব খেজুর গত বছরের চেয়ে কেজি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রায় সব ফল গত ১৫ দিনের ব্যবধানে ২০ থেকে ৬০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। কমলা, মাল্টা, আঙুর ও আপেলের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০-৬০ টাকা পর্যন্ত। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ক্রাউন আপেল বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০, ফুজি আপেল ২৯০ থেকে ৩০০, মিসরের মাল্টা ২৬০ থেকে ২৭০ টাকা। ভারতের সাদা আঙুর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আনার ও আঙুর কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে। মাঝারি আকারের আনার ৩২০ থেকে ৩৪০, কালো আঙুর ৩০০ থেকে ৩২০ এবং সাদা আঙুর ২১০ থেকে ২২০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। চায়না কমলা বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকায়। রোজায় ইফতারের আরেকটি জনপ্রিয় ফল আনারস। অন্যান্য বছর রসালো এ ফলটি মোটামুটি ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকলেও এবার এরও দাম বেশি। বড় সাইজের একটি আনারস খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকার বেশি দামে। একই আনারস এক বছর আগে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। গ্রীষ্মের ফল তরমুজের বেচাকেনাও শুরু হয়েছে অল্প পরিসরে।খুলনার বিক্রেতারা প্রতি কেজির দর রাখছেন ৮০ থেকে ৯০ টাকা। সে হিসেবে মাঝারি আকারের একটি তরমুজের দাম পড়ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
পেয়ারার কেজি সপ্তাহ দু-একের ব্যবধানে ১৫-২০ টাকা বেড়েছে। আগে ছিল ৫০-৬০ টাকা, এখন ৭০-৮০ টাকা। বেদানা ৩৫০-৪০০, আতা ৪৫০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড বরই ১০০ থেকে ১৩০ টাকা দরে।
ইফতারে লেবুর শরবতের চাহিদা অনেক। সব শ্রেণির মানুষই ইফতারে কমবেশি লেবুর শরবত পান করে। তবে এবার লেবুর শরবত পান যেন বিলাসিতা। ৩০-৪০ টাকা হালির লেবু এখন খুলনায় বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়। কিছু কিছু জায়গায় পিস ২০ টাকা।
রোজার খুলনার মাছের বাজারও এবার গরম। পাঙাশ, কই, রুই, কাতলাসহ প্রায় সব ধরনের মাছের কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে।
এদিকে খুলনার দোকানগুলোতে মশলা দামও বেড়েছে। কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে ছোট এলাচ বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া ভারতীয় ছোট এলাচ ২ হাজার ৪০০ টাকা, লবঙ্গ প্রতি কেজি ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং দারুচিনি বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকা কেজি। যদিও দুই সপ্তাহ আগেও একই প্রতিষ্ঠানে মার্কিন ছোট এলাচ বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ২০০ টাকা, ভারতীয় ছোট এলাচ ২ হাজার ২০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ২০০ টাকা ও দারুচিনি বিক্রি হয়েছে ৩৩০ টাকা কেজি দরে।
খুলনার বড়বাজারে এক ক্রেতা তারিক তাহরিম জানান ,মন্ত্রীরা বলছেন বাজার নিয়ন্ত্রণে আছে অথচ বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি। শুধু লেবুর ডজনই ১০০ টাকার বেশি। খেজুরের দাম প্রায় দু-তিন গুণ বেড়েছে। মন্ত্রী বলছেন বরই দিয়ে ইফতার করার জন্য। সেই বরইয়ের দাম এখন প্রায় ২০০ টাকা। সরকার যেসব কথা বলেছে আমরা বাজারে এর প্রতিফলন দেখিনি।
খুলনার বানরগাতি বাজারের এক ক্রেতা রাবেয়া আক্তার টুম্পা জানান, রমজানের আগেই ডিমসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ বিপাকে পড়েছে। যাদের মাছ মাংস কেনার সামর্থ্য নেই তারা অন্তত ডিম বা সবজি দিয়ে সংসারের চাহিদা মেটায়। কিন্তু রমজান শুরুর আগেই হঠাৎ ডিমসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। যা নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারকে আরো চাপে ফেলে দিয়েছে।

