সজীব আহমেদ : এগারো বছর (২০০৯ সালের) আগে বিদ্যুতের অভাবে দেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, শিল্প, বাণিজ্য ছিল স্থবির এবং জনজীবনে লোডশেডিং ছিল অসহনীয়। বর্তমান সরকার দেশে অবোকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সক্ষমতা অর্জন দূরদর্শী, সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বিদ্যুৎ খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দেশের প্রতিটি ঘরে শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে ২০২১ সালের মধ্যে, এগার বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ঘোষণা অনেকটা স্বপ্ন মনে হলেও কাঙক্ষিত লক্ষ্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ। ইতোমধ্যে গ্রিড এলাকায় দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। পাহাড়, কিছু দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন অফগ্রিডের ১ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে গেলেই শতাভাগ বিদ্যুতের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। এটি মুজিববর্ষের মধ্যেই বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হবে। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের ফলেই মাত্র এগারো বছরেই বিদ্যুৎ খাতে বড় বিপ্লব ঘটেছে। বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় লোডশেডিং শূণ্যের কোটায় নেমে এসেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় একটি প্রসারও হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের আগে এই (শতভাগ বিদ্যুৎ) লক্ষ্য পূরণে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতাও ছিল। এর মধ্যে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বিদ্যুতের লাইন নেয়া ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আবার মানুষ নিজের গ্রাম, আদিনিবাস ছেড়ে ‘মাঠে-প্রান্তরে’ কিংবা নতুন সড়কের পাশে বাড়িঘর তৈরি করছে। ফলে বিদ্যুতের বর্ধিত চাহিদার জোগান দেয়ার পাশপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন স্থাপনসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিদ্যুৎ বিভাগকে এগোতে হচ্ছে। এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সাফল্যের দৃষ্টান্তও রেখেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। মাত্র ১১ বছরেই বিদ্যুৎ খাতে যে বিপ্লব ঘটেছে সেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র দূরদর্শীতায় ও প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগ খাতের সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, ‘স্বাধীনতার ৩৯ বছরে (১৯৭১-২০০৯) যেখানে ৪৭ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে, সেখানে ২০২১ সালের মধ্যে অর্থাৎ মাত্র ১২ (২০০৯-২০২১) বছরে অবশিষ্ট ৫৩ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার ঘোষণা ‘স্বপ্নের’ মতোই মনে হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে মাত্র এগার বছরে আরো ৫২ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশের ৯৯ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। বাকি ১ শতাংশ অফগ্রিড এলাকায় মুজিববর্ষেই সম্পন্ন করে শতভাগ বিদ্যুৎ ঘোষণা করা হবে। সে লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।’
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য মতে, ‘২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্য ছিল ২৭টি। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৪০টি। মাত্র ১১ বছরে ১১৩ টি বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪,৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে উৎপাদন ২৪,০০০ মেগাওয়াট (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্যসহ)। ১১ বছর আগে দেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক ছিল ১ কোটি ৮ লাখ। বর্তমানে বিদ্যুতের গ্রাহকসংখ্যা ৩ কোটি ৮৯ লাখ। আগে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ ছিল না, বর্তমানে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। গ্রিড সাবস্টেশন ক্ষমতা ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ, সেটা বেড়ে এখন হয়েছে ৪৭ হাজার ৮২৪ এমভিএ। সঞ্চালন লাইন ছিল ৮ হাজার সার্কিট কিলোমিটার, সেটা এখন ১২ হাজার ৪৪৪ সার্কিট কিলোমিটার। বিতরণ লাইন ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার। বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৯ শতাংশে। ১১ বছর আগে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১২ কিলোওয়াট ঘণ্টায়। বিতরণ সিষ্টেম লস ছিল ১৪.৩৩ শতাংশ, এখন কমে হয়েছে ৮.৭৩ শতাংশ।’
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে ১১ বছর আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থবিরতা দেখা দেয়। পরিস্থিতির উত্তরণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার মিশ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্যাসের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়। সরকার তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সৌর, বায়ু, বায়োগ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোগ নেয়। সরকারের ধারাবাহিকতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। নীতিমালা সহজ করায় বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিও বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। তা দেশের বিদ্যুৎ খাতকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেয়।’
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘২০০৯ সালে বিদ্যুতের বিধ্বস্ত একটি সেক্টরকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শীতায়, তাঁর সাহসীকতা ও সততার উপর ভিত্তি করে মাত্র ১১ বছরেই বিদ্যুৎ খাত এখন সফলতার খাতে। এ অগ্রগতি সারা বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে। এখন চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি। আমাদের প্রায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় চলে এসেছে। নেতৃত্ব যদি সঠিক থাকে কর্মীবাহিনীও কাজ করতে সাচ্ছন্দবোধ করে। সেটাই হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। এ সময়ে যে দু’জন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, বিশেষ করে নসরুল হামিদ ইয়াং এনার্জেটিক এবং অত্যন্ত পজেটিভ। উনার নেতৃত্বে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীবাহিনী কাজ করেছে বলেই বিদ্যুৎ খাত এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে। আমাদের উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী উনি একজন পণ্ডিত মানুষ। উনার অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এখনো সেটা চলমান আছে। এখনো কিছু অসম্পূর্ণতা রয়েগেছে, যেমন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ। এখন এসব জায়গাগুলোতে আমরা কাজ করছি। প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের নেতৃত্বে কর্মীবাহিনীর এ টিমের মাধ্যমে অতিদ্রুত পরিপূর্ণতা অর্জন করবে।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘সারা বাংলাদেশের ১০০ শতাংশ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাচ্ছে এটা বিদ্যুৎ খাতের বড় বিল্পব। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা বিরল। ২০০৯ সালের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওয়াদা ছিল শতভাগ বিদ্যুতায়ন করা হবে। আওয়ামী লীগের ইশতেহার অনুযায়ী বাস্তবায়ন হচ্ছে। গ্রিড এলাকায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। মুজিববর্ষের মধ্যেই অফগ্রিড এলাকায় বাকি ১ শতাংশ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। মাত্র ১১ বছরেই বিদ্যুৎ খাতে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে এর কারণ হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর আস্থাশীল হয়ে বিদেশিরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করেছে। একটা স্বৈরাচারী সরকারের কাছে বিদেশিরা কখনো এ আস্থা পায়নি। তাই ইনভেস্টও করেনি।’
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সময়েই বিদ্যুতের গ্রাহকদের স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। দেশের সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জ্বালানি সেবা নিশ্চিত রাখতে কাজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহক সেবার মান বাড়াতে বিদ্যুৎ বিভাগের সব দপ্তর, প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিংয়ের (ইআরপি) আওতায় নিয়ে আসার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের ৯৯ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায়। এতো বড় সেবা খাত সঠিকভাবে পরিচালনা করতে দ্রুত ডিজিটাল সেবা দিতে হবে। ইআরপি সিস্টেম চালু হলে কেন্দ্রীয় ভাবেই সব মনিটর করা যাবে। গ্রাহকের সেবার মানও বৃদ্ধি পাবে।’

