আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীনের নতুন নিরাপত্তা আইন প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্র হংকং। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে কোন দিকে হাঁটছে হংকং? ৩০ জুন চীন কর্তৃপক্ষ হংকয়ের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় আসছে সব ধরনের সরকারবিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচি, থাকছে হংকংয়ে সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতি। ইতিমধ্যে এই আইন ব্যবহার করে গ্রেফতার করা হয়েছে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে।
অনেকে বলছেন, পাশাপাশি, চীনের বিশেষ অঞ্চলের মর্যাদায় থাকা হংকংয়ে গণতন্ত্রের দাবিদারদের আন্দোলনে বড় ধাক্কা এই আইন। গত সপ্তাহে হংকয়ের সংসদীয় নির্বাচনও পিছিয়ে দেয়া হয় আরও এক বছরের জন্য।
শুধু তাই নয়, হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যারি লাম মনে করেন, বর্তমান আইন ও মহামারিকালীন আরেকটি আইনের যুগ্ম ধাক্কায় কমতে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে এতদিন যাবৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হংকং।
‘এক দেশ, এক ব্যবস্থা’
পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মত, ২০৪৭ সাল পর্যন্ত হংকয়ের স্বায়ত্তশাসনের যে সুবিধা ছিল চীনের ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতিতে, তা বর্তমানে ভেঙে পড়ছে।
সম্প্রতি হংকংয়ের সঙ্গে তাদের বিশেষ বাণিজ্য সম্পর্কের ইতি টানতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দেন।এছাড়া আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সংস্থাও আস্তে আস্তে তাদের হংকং পাট চুকিয়ে আনছে নতুন আইনের অতি-নিয়ন্ত্রণের কারণে।
বার্লিনের জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্টেট এফেয়ার্সের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ হেরিবার্ট ডিটারের মতে, ইতিমধ্যে ডয়চে ব্যাংকের এশিয়া কার্যালয় হংকং থেকে সরিয়ে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ পদক্ষেপ থেকেই বোঝা যাচ্ছে কীভাবে হংকংয়ের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাণিজ্য সংস্থাগুলো তাদের নীতি বদলাচ্ছে।
একটি রাজনৈতিক আইন প্রণয়ণ কেন বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে, এই প্রশ্নে ডিটার বলেন, ‘ব্যাংকের কর্মকর্তা ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের কার্যকলাপে বাড়তি নজরদারি সম্ভব করবে এই আইন। কীভাবে সরকার তা করবে, এটা এখন স্পষ্ট না হলেও, আইনে এটা করার যথেষ্ট জায়গা রয়েছে।’
কোথায় দাঁড়িয়ে হংকং?
চীনের অর্থনীতিতে যতটা গুরুত্বপূর্ণ হংকং, তার চেয়ে অনেক বেশি তার মর্যাদা আন্তর্জাতিক বাজারে। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিউইয়র্ক ও লন্ডনের পরই বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র নিঃসন্দেহে হংকং। এতদিন যাবৎ হংকংয়ের স্বায়ত্বশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিম্নমূল্যের কর ও তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হংকংকে বানিয়েছিল ব্যবসার জন্য স্বর্গরাজ্য। চীনের ইউয়ানের বদলে হংকংয়ের বাজার চলত হংকং ডলারের হিসাবে।
ডিটার বলেন, ‘হংকং ছিল চীনের একমাত্র বাণিজ্যকেন্দ্র, যেখানে অর্থের চলাফেরায় কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না। এখানকার হংকং ডলারের বদলে এখন চীনা ইউয়ান সবকিছু আরও দামী ও জটিল করে তুলবে।’
হংকংয়ের এই মর্যাদাবদলের ফলে আন্তর্জাতিক লগ্নিকারী শক্তিদের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে বদল আসছে। ডিটারও এ বিষয়ে চিন্তিত। তিনি বলেন, ‘চীন সরকার কেন অস্ট্রেলিয়া, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মতো লগ্নিকারীদের পথ জটিল করছে, তা নিয়ে আমিও চিন্তিত। এর একটাই কারণ হতে পারে আমার মতে। হয়তো এভাবেই চীনের কমিউনিস্ট পার্টি চীনকে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্যুত করে রাখতে চায়। এর কোনো প্রমাণ আমি নথি দিয়ে দেখাতে পারব না। এটা শুধুই আমার একটা ধারণা।’
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে হংকংয়ের ওপর বিশেষ বাণিজিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিন্তু তা চীনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কে গুরুতর বদল আনবে না। প্রভাব যা পড়ার, তা থাকবে হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসিত বাজারের আন্তর্জাতিক মর্যাদার ওপর। ডি ডব্লিউ।

