
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ হল মহাকাশে উৎক্ষেপিত কৃত্রিম উপগ্রহ। যেটি একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে। চাঁদ হল পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। চাদ পৃথিবীর কক্ষপথকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরছে। অন্যদিকে পৃথিবীও সূর্যের কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। তাই চাঁদ ও পৃথিবীকে বলা হয় প্রকৃতির স্যাটেলাইট। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা চাঁদ ও পৃথিবীর কক্ষপথের এই ঘুর্ণায়মানতার ধারণাকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম ভাবে মহাকাশে উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করছে।
মহাকাশে স্যাটেলাইট বসানোর মূল কাজটি হল এর উৎক্ষেপণ। সঠিক কক্ষপথে এটি বাসানো না হলে এটি যেমন কাজ করে না তেমনি কক্ষ পথ থেকে মহাকাশে হারিয়েও যেতে পারে। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা রকেট বা স্পেস শার্টল কার্গো বে’র মাধ্যমে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠান। স্যাটেলাইট পাঠানোর সময় রকেটকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইনার্শিয়াল গাইডেন্স সিস্টেম(আইজিএস)মেকানিজম ব্যবহার করা হয়।
পৃথিবীর অভিকর্ষ শক্তি পার হতে স্যাটেলাইটবাহী রকেটকে ঘন্টায় ২৫ হাজার ৩৯ মাইল ত্বরণে ছুটতে হয়। মহাকাশে স্যাটেলাইট স্থাপনের সময় কক্ষপথে আবর্তন গতি ও তার জড়তার ওপর পৃথিবীর অভিকর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হয়। নইলে ফের এটি পৃথিবীতে ফেরত চলে আসতে পারে। অথবা মহাকাশে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে পারে। এ জন্য ভূ-স্থির স্যাটেলাইটকে ১৫০ মাইল উচ্চতাবিশিষ্ট কক্ষপথে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ হাজার মাইল গতিতে পরিভ্রমণ করানো হয়। মূলত গতিবেগ কত হবে, তা নির্ভর করে স্যাটেলাইটটি পৃথিবী থেকে কত উচ্চতায় রয়েছে তার ওপর। পৃথিবী থেকে ২২ হাজার ২২৩ মাইল উপরে স্থাপিত স্যাটেলাইট ঘণ্টায় ৭০০ মাইল বেগে পৃথিবীকে আবর্তন করে। পৃথিবীর ঘুর্ণনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্যাটেলাইটও ২৪ ঘণ্টা ঘুরতে থাক। তবে ভূ-স্থির বা জিওস্টেশনারি উপগ্রহগুলো এক জায়গাতেই থাকে। এগুলো আবহাওয়া ও টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
পৃথিবীর কক্ষপথে স্যাটেলাইট উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে। সাধারণত ৮০ থেকে ১ হাজার ২০০ মাইল উচ্চতাবিশিষ্ট কক্ষপথে বিভিন্ন ধরনের স্যাটেলাইট পাঠানো হয়। কাজের ধরণের ওপর নির্ভর করে স্যাটেলাইটটি কত উচ্চতায় বসবে। যেমন উদ্ভিদ ও প্রাণি নিয়ে গবেষণা, বণ্যপ্রাণীর চড়ে বেড়ানো পর্যবেক্ষণ, অ্যাস্ট্রোনমি এবং পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার জন্য সায়েন্স স্যাটেলাইটকে বসানো হয়। এই স্যাটেলাইট ৩০ হাজার থেকে ৬ হাজার মাইল উচ্চতায় উৎক্ষেপিত হয়। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয় ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মাইল উচ্চতায়। এক এক ধরনের স্যাটেলাইটের বৈশিষ্ট্য ও গঠন প্রণালি একেক রকম। তবে সব স্যাটেলাইটের মধ্যেই সাধারণত কিছু মিল আছে। স্যাটেলাইটের শরীর ধাতু সংকরের ফ্রেম দিয়ে তৈরি। একে বলে বাস। এতেই স্যাটেলাইটের সব যন্ত্রপাতি থাকে। প্রত্যেক স্যাটেলাইটে থাকে সোলার সেল এবং শক্তি জমা রাখার জন্য ব্যাটারি। এর পাওয়ার সিস্টেম প্রসেসকে পৃথিবী থেকে সবসময় মনিটর করা হয়। স্যাটেলাইটে একটি অনবোর্ড কম্পিউটার থাকে যা একে নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন সিস্টেমকে মনিটর করে। স্যাটেলাইটের আরেকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল এর রেডিও সিস্টেম ও অ্যান্টেনা।
স্যাটেলাইট কিভাবে কাজ করে
স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ এমনভাবে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে যাতে করে এর গতির সেন্ট্রিফিউগাল বা কেন্দ্রবিমুখি শক্তি এটাকে বাইরের দিকে ছিটকে দিতে চায়। কিন্তু পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি একে পৃথিবীর আওতার বাইরে যেতে দেয় না। উভয় শক্তি কৃত্রিম উপগ্রহের ভারসাম্য বজায় রাখে। এভাবেই কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। মহাকাশে বায়ু নেই তাই একবার গতি দিলে এটি বাধাহীনভাবে পৃথিবীকে পরিক্রমণ করে।
স্যাটেলাইট টিভি ও বেতারসংকেত প্রেরণ এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহগুলো সাধারণত পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে বসানো হয়। স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে পাঠানো তথ্য গ্রহণ করে। এরপর এটি তথ্য বিবর্ধিত করে পুনরায় সংকেত পৃথিবীতে ফেরত পাঠায়।
কৃত্রিম উপগ্রহ দুইটি ভিন্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ ব্যবহার করে সিগনাল (তথ্য) গ্রহণ এবং পাঠানোর জন্য। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসা সিগনাল অনেক দুর্বল বা কম শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাই প্রথমে ডিস এন্টেনা ব্যবহার করে সিগনালকে কেন্দ্রীভূত করা হয়। এরপর রিসিভার দিয়ে সিগন্যাল গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয় ।
কৃত্রিম উপগ্রহের জ্বালানি
কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর উৎক্ষেপণের সময়ই পর্যাপ্ত জ্বালানি ভরে দেয়া হয়। কেননা, মহাকাশে রিফুয়েলিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। সম্প্রতি কিছু কিছু উপগ্রহ জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি ব্যবহার করছে। এদের গায়ে সৌরকোষ লাগানো থাকে, যা ব্যবহার করে এটি সূর্য থেকে তার প্রয়োজনীয় শক্তি গ্রহণ করে পরিচালিত হয়।
পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ
মহাকাশে প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন(রাশিয়া)। ‘স্পুটনিক-১’ নামের এই স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানো হয় ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর। ‘স্পুটনিক-১’ এর নকশা করেন ‘সের্গেই করালিওভ’ নামের একজন ইউক্রেনীয়। ‘স্পুটনিক-১’ এর সফল উৎক্ষেপনের পর একই বছর ‘স্পুটনিক-২’ নামে সোভিয়েত ইউনিয়ন আরেকটি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠায়। এটির মহাকাশচারী হিসেবে যাত্রী ছিল লাইকা নামের একটি কুকুর। যদিও কুকুরটি তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক আগেই মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য গবেষণা করে আমেরিকা। ১৯৪৫ সালে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনা সফল হয় ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। আমেরিকার প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘এক্সপ্লোরার-১’ এদিন মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়।
স্যাটেলাইটের ব্যবহার
প্রযুক্তি সভ্যতাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছে। মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। টেলিকমিউনিকেশনের কাজে স্যাটেলাইট সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেল তাদের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। তাছাড়া ইন্টারনেট সংযোগ, টেলিফোন সংযোগ, উড়ন্ত বিমানে নেটওয়ার্ক প্রদান, দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক প্রদান, জিপিএস সংযোগসহ বিভিন্ন কাজে কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহৃত হয়।
মহাকাশে ৪০টি দেশের হাজার খানেকেরও বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে। যার মধ্যে অব্যবহৃতই রয়েছে শ’খানেক। তবে মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অনেক দেশেরই নেই। মহাকাশে এই পর্যন্ত ছয়হাজার ছয়শ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপিত হয়েছে। যার মধ্যে তিনহাজার ছয়শটি স্যাটেলাইট কক্ষপথে রয়েছে।
মহাকাশে উড়বে বঙ্গবন্ধু-১
বাংলাদেশ মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ নামে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের উদ্যোগ নিয়েছে। ১৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছে থাকা ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ কক্ষপথটি ভাড়া নিতে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন(বিটিআরসি)।
বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণে মূল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (এসপিআই)। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে- উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য বাজার পর্যবেক্ষণ, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আইটিইউয়ের সঙ্গে তরঙ্গ সমন্বয়, স্যাটেলাইট সার্ভিস ডিজাইন, স্যাটেলাইট আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, সিস্টেম ডিজাইন, দরপত্র প্রস্তুত, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সুষ্ঠুভাবে উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণের কাজ করা।
ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থ ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লক্ষ টাকা। বাকি ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা যে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ করবে তারা সরবরাহ করবে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক মেয়াদ ধরা হয় ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। তবে ডিপিপি অনুমোদন পিছিয়ে যাওয়ায় এর বাস্তবায়নকাল পুনর্নির্ধারণ করা হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বর।

