বিনোদন ডেস্ক : সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে সিনেমার দায়িত্ব কতটুকু তা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন মত আছে। অনেকে বলেন সমাজের প্রতি সিনেমার কোনো দায় নেই।
দায় থাকুক আর না থাকুক সিনেমা শিল্প হয়ে ওঠার দায় কখনো এড়াতে পারে না। তা সে এফডিসি কেন্দ্রিক চটুল সিনেমাই হোক কিংবা অন্য সিনেমাই হোক। শিল্পগুণে কতটুকু উতরে গেলো দিনশেষে তার হিসেব কিছুটা হলেও করেন দর্শক, সমালোচক ও সিনেমা সংশ্লিষ্টরা।
অজ্ঞাতনামা সিনেমাটি তৌকির আহমেদের চতুর্থ সিনেমা। তাই বলা যায় চলচ্চিত্রকার হিসেবে তৌকির আহমেদ নতুন না।
অজ্ঞাতনামার বিষয়বস্তু আমাদের একেবারে কাছের। রেমিট্যান্স নির্ভর এই বাংলাদেশের মানুষের কাছে আদম রপ্তানি বা পাচার খুব পরিচিত একটা ব্যাপার। গল্প সিলেকশনে তৌকির যে খুব বেশি একটা ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছেন তা বলা যায় না। বরং পরিচিত পরিবেশ থেকেই গল্প নির্ধারণ করেছেন। আর সে কারণে এই সিনেমা নির্মাণে চলচ্চিত্রকারের চ্যালেঞ্জটাও একটু বেশিই ছিল। সেই চ্যালেঞ্জ কতটুকু নিতে পেরেছেন তৌকির আহমেদ সে বিষয়ে পরে যাচ্ছি। তার আগে কিছু কথা বলতে চাই।
অনেকেই অভিযোগ করেন মূল ধারার সিনেমা বলতে জোড়াতালি দেওয়া কাহিনী, সংলাপের দুর্বলতা, তিন/চারটা গান, সেক্স আর ভায়োলেন্স। হয়তো আরো কিছু বিষয় বাদ পড়েছে। তবে মোটা দাগে এই রকম অভিযোগ আগাগোড়াই। আমি ব্যক্তিগতভাবে অবশ্য এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে। সব সিনেমা কেন দর্শকদের ভাল লাগতে হবে। দর্শকদের কাছে সব সিনেমাকে কেন সুপার ডুপার হিট হতে হবে। প্রচুর সিনেমা হবে। এর মধ্য থেকে গুটি কয়েক ভাল সিনেমা হলেই ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়াবে।
এবার আসি ‘অজ্ঞাতনামা’ চলচ্চিত্রের বিষয়ে। অজ্ঞাতনামা শিরোনামের সিনেমাটি তৌকির আহমেদ বেশ যত্ন নিয়ে বানিয়েছেন। অবশ্য সব নির্মাতাই তা করেন। তবে অজ্ঞাতনামার কাহিনী, চিত্রনাট্য, নির্মাণশৈলী, অভিনয়শিল্পী ও দৃশ্যায়নের দিক থেকে সিনেমাটিক হয়ে উঠেছে বলেই আমার মনে হয়েছে। একজন মধ্যম মানের দর্শক হিসেবে সিনেমাটি দেখে আমি সন্তুষ্ট। অভিনেতা অভিনেত্রী কাস্টিংয়ের ব্যাপারে তৌকির বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। তবে সিনেমার সবচেয়ে বাজে দিক মনে হয়েছে মিউজিক। কোনোভাবেই মিউজিক যেন খাপ খায়নি গল্পের সঙ্গে, গল্প বলার ঢঙ্গের সঙ্গে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর থেকে শুরু করে টাইটেলে কার্ডের সঙ্গীতকে কোন বিবেচনাতেই মেলাতে পারিনি সিনেমার বিষয়বস্তুর সঙ্গে । কণ্ঠসঙ্গীতেরও একই অবস্থা। টাইটেল সঙ্গীতের অবস্থা যেমন দৈন্য, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরেও তেমনি দৈন্য। কানে এবং চোখে ভাল লাগেনি। আবহসঙ্গীতের কারণে কখনো কখনো গল্পের মূল থিম থেকে যেন ছিটকে পড়েছি।
নির্মাতা তৌকির খুব সচেতনভাবে গল্পের প্রয়োজনে কিছু রাজনৈতিক ব্যাপারও তুলে ধরেছেন বলে মনে হয়েছে। তবে ন্যারেটিভের সঙ্গে ডিটেলিংয়ের অভাব রয়ে গেছে। হালকাভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরলে অনেক তুলে ধরা যাবে। কিন্তু এতে গভীরের ক্ষত দেখা যায় না। অজ্ঞাতনামার রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোর ক্ষেত্রে দায়সারা ও গোজামিল মনে হয়েছে। সংলাপের ব্যাপারে তৌকির আরো বেশি যত্ন নিতে পারতেন। কিছু কিছু জায়গায় অতিরঞ্জিত সংলাপের প্রয়োগ বরং বেখাপ্পা লেগেছে। আর অভিনয়ের ক্ষেত্রে মোশাররফ করিম পরিচিত টাইপ ক্যারেক্টার থেকে বের হতে পারেননি। নিপুন অভিনয় করছেন, মাঝে মাঝে তা যেন বুঝিয়ে দিয়েছেন দর্শকদের। মানে অতিরিক্ত করেছেন। অজ্ঞাতনামায় সবচেয়ে ভাল লেগেছে শহিদুজ্জামানের অভিনয়। যদিও তার অঙ্গসজ্জার ব্যাপারে কোথাও কোথাও বেখাপ্পা লেগেছে। ফজলুর রহমান বাবু ও শতাব্দী ওয়াদুদ ভালো অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে ফজলুর রহমান বাবুর অভিনয় দুর্দান্ত লেগেছে। দুএক জায়গায় গল্পের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক কিছু দৃশ্য টোটাল সিনেমার ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়েছে। তবে সহযোগী ক্যারেক্টারগুলির গলা যেন সব সময় টিপে ধরে রেখেছেন তৌকির।
বাংলাদেশের সিনেমা সংক্রান্ত তথ্য ঘেটে একটা বিষয় জানা যায়, অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে এর আগে বাংলাদেশে কোনো সিনেমা হয়নি। ইয়াসমিন কবির ‘পরবাসী মন আমার’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে। ওটা ছিল অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে প্রথম প্রামাণ্যচিত্র। তারেক মাসুদ তার রানওয়েতে অভিবাসী শ্রমিকদের এনেছেন তবে তা ছিল গল্পের সহকারী প্লট। তৌকিরের অজ্ঞাতনামা ছবিটিই প্রথম ফিচার ফিল্ম অভিবাসী শ্রমিদের নিয়ে।
অজ্ঞাতনামা সিনেমার শুরুর দৃ্শ্য ছিল এমন-একটি সাদা কবুতর মরে পড়ে আছে খেতের পাশে। গ্রামের বৃদ্ধ কেফায়েত উদ্দীন প্রামাণিক (ফজলুর রহমান বাবু) তার নাতিকে নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। খেতের পাশে পড়ে থাকা সাদা কবুতর দেখে নাতির মনে প্রশ্ন জাগে, মৃত্যু কেন আসে? বৃদ্ধ কেফায়েত উদ্দীন আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত জবাব দেন, সবই তার ইচ্ছা। এরপর তিনি ও তার নাতি মিলে সেই মৃত পাখিটিকে কবর দেন। শুরুর এই কেফায়েত উদ্দীনকে সিনেমার শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়। যার সন্তান আছির উদ্দীন প্রামাণিক মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে গেছে।
কাহিনীর ধারাবাহিকতায় একদিন পুলিশের ওসি কুদ্দুসকে (শতাব্দী ওয়াদুদ) জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যের আজমান শহরে একটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে বাংলাদেশি এক যুবক। নিহত যুবকের নাম আব্দুল ওয়াহাব। যার বাবার নাম আব্দুল হাকিম। লাশ গ্রহণ করতে ঢাকায় স্বজনদের যেতে বলতে বলা হয় কুদ্দুসকে। এরপর আব্দুল হাকিমের কাছে যান ওসি কুদ্দুস। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন আব্দুল হাকিমের ছেলে আব্দুল ওয়াহাব জীবিত। তিনি এখন আর মধ্যপ্রাচ্য নেই, ইতালির রোমে থাকেন। তবে তিনি ইতালি যাওয়ার আগে তার পাসপোর্টটি রমজান দালাল রেখে দেয়। পরে রমজান দালালকে (শহীদুজ্জামান) ধরে আনলে সে জানায় ৩০ হাজার টাকায় পাসপোর্টটি কেফায়েত উদ্দীনের ছেলে আছির উদ্দীনের কাছে বিক্রি করেছে।
এবার মৃত্যুর খবর নিয়ে যাওয়া হয় প্রান্তিক মানুষ কেফায়েত উদ্দীনের বাড়িতে। সহায়সম্বলহীন কেফায়েত উদ্দীন তার ছেলের মৃত্যুর খবরে বিহ্বল হয়ে পড়েন। শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েন কেফায়েত উদ্দীনের স্ত্রী ও ছেলে আছির উদ্দীনের স্ত্রীও।
রমজান গলা কাটা পাসপোর্টে আছিরকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠায়। তাই পুলিশের উপস্থিতিতে লাশ বাড়িতে আনার দায়িত্ব রমজানের উপরও পড়ে। পরে রমজান কেফায়েত উদ্দীনকে নিয়ে লাশ গ্রহণ করতে ঢাকায় যায়। ঢাকায় যাওয়ার পথে ছেলে হারানো কেফায়েত উদ্দীন পুরোটা সময় নির্বাক থাকেন। দুচোখ দিয়ে শুধু অসহায় তাকিয়ে থাকেন।
রমজান দালাল কেফায়েতকে শিখিয়ে দেয় লাশ গ্রহণের সময় মূল পরিচয় গোপন রাখতে। ছেলের নাম জানতে চাইলে যেন আব্দুল ওয়াহাব ও নিজের নাম আব্দুল হাকিম বলে। কেফায়েত ছেলের লাশের কফিন দেখে তাতে জড়িয়ে ধরে আসল নাম ধরে বিলাপ করতে থাকেন। এতে মূল ঘটনা কাস্টমস কর্মকর্তার সামনে খোলাসা হয়ে যায়। পরে রমজান দালাল ঘুষ দিয়ে এই যাত্রায় রক্ষা পায়। লাশ গোসল করাতে গেলে দেখা যায় নিহতের খৎনা হয়নি। ঘটনাক্রমে দেখা যায় লাশটি আসলে কেফায়েত উদ্দীনের ছেলের না। অজ্ঞাতনামা লাশ। কেফায়েত উদ্দীন প্রামাণিকের মনে আশা জাগে তার ছেলে বেঁচে আছে হয়তো।
এবার লাশ নিয়ে দেখা দেয় নতুন জটিলতা। আবার ঢাকায় লাশ নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোথাও লাশ হস্তান্তরের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। এরই মধ্যে ওসি কুদ্দুস রমজানকে ফোনে জানায় আজমানে সড়ক দুর্ঘটনায় এক সঙ্গে ছয়জন নিহত হয়। আছির মারা গেছে সত্য। চেহারা শনাক্তে সমস্যা দেখা দেয়। তাই ভুল লাশ দেশে আসে। কেফায়েতের শেষ আশার তরীও ডুবে যায়। তবে কেফায়েত উদ্দীন অজ্ঞাতনামা এই লাশের সৎকার করতে চান। ঠিক বেওয়ারিশ কবুতরটির মতো।
আমার কাছে মনে হয় শুরুর সেই দৃশ্যই দর্শকের মধ্যে পুরো সিনেমা সম্পর্কে একটা ইঙ্গিত দেয়। পুরো সিনেমা শুধু সে আয়োজন করে গেছে। কিছু কমেডি থাকলেও বাহুল্য ছিল না। ধীরলয়ে যেন এক বিষাদের গল্প বললেন তৌকির আহমেদ। সব মিলিয়ে আমার কাছে অজ্ঞাতনামা পিছিয়ে পড়া মানুষের বিষাদের অ্যাখ্যান মনে হয়েছে। দর্শককে একটু হলেও ভাবিয়ে তোলে, বিষাদের দিকে ঠেলে দেয়। অখেয়ালে কখন দর্শক ঢুকে যায় হাহাকারে, শূন্যতায়- টের পাওয়ার যেন ফুসরত নেই। সব মিলিয়ে অজ্ঞাতনামা সমাজের প্রান্তিক মানুষের বিহ্বল কাহিনি বলে গেছে।

