
নিজস্ব প্রতিবেদক : আপনার বাড়িতে আগুন লাগলে প্রতিবেশী বাড়ির লোকজনও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। আগুন নেভানোর কাজে হাত লাগান। নিয়ন্ত্রণে আনার সব ধরণের চেষ্টায় নিয়োজিত হন। ডাকাত পড়লেও সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসেন লাগোয়া বাড়ির লোকজন। প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্ক এ রকম। কিন্তু অন্য পরিসরেও কি সম্পর্ক একই রকম ? এই প্রশ্নের উত্তর হলো, ‘হ্যা’। নানা বিষয়ে টানাপোড়েন থাকতেই পারে প্রতিবেশী দেশের মধ্যে, ঠিক যেমন প্রতিবেশিদের মধ্যে থাকে। অনেকটা বন্ধুও তুমি, শত্রুও তুমি।
ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা চালানো হয় গত শুক্রবার রাত নয়টার দিকে। জঙ্গি ঘটনার অবসান ঘটে পরদিন সকালে জঙ্গিসহ মোট ২৮ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এতে শুধু ঢাকাই কেঁপে ওঠেনি, কেঁপে উঠেছে নয়াদিল্লিও। চিন্তার ভাজও পড়েছে কপালে।
এর আগে গত এক দশকে ভারতে জঙ্গি হামলা হয়েছে কয়েকবার। খোদ রাজধানী নয়াদিল্লি এবং মুম্বাইও বাদ যায়নি জঙ্গি হামলার কবল থেকে। জঙ্গি হামলার হোতাদের প্রায় সকলেই এসেছিল ইসলামাবাদের আশীর্বাদ নিয়ে। অনেক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ায় আপাতত ঠান্ডা রয়েছে ভারত। কিন্তু জঙ্গি হামলার আশঙ্কা রয়েই গেছে। তাই জঙ্গি নিয়ে দেশটির মাথা ব্যথা থাকতেই পারে।
তারা চায় না, পূর্বাঞ্চলে আরেকটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত হোক। এমনিতেই পশ্চিম ফ্রন্ট দিয়ে জঙ্গি প্রবেশ ঠেকাতে সব সময় সচেষ্ট থাকতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে। এখন আবার জঙ্গি অনুপ্রবেশ ও হামলা চালানোর রসদপত্র আনা হোক বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে, নিশ্চয় ভারত তা চাইবে না। নিজের নিরাপত্তার কারণে পূর্ব সীমান্তে এরই মধ্যে কাটাতারের বেড়া দিয়ে ঘের দিয়েছে। এর কারণ শুধু ভারত থেকে গরু পাচার বন্ধ করা নয় বরং এর মূল লক্ষ্য জঙ্গি অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। জঙ্গি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে গিয়ে যদি গরু পাচার বন্ধ হয়ে যায়, এতে লাভ ছাড়া ক্ষতি তো হয় না।
ঢাকায় জঙ্গি হামলার দায়িত্ব আইএসআইএস স্বীকার করায় ঘটনাটি অন্য রকম মাত্রা পেয়েছে। বর্তমান বিশ্বে জঙ্গি হামলা ও এর সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি আসলেই অন্যরকম তাৎপর্য বহন করছে। ভারতেরও মাথা ব্যথার মূল কারণ এটিই। তারা ভাবছে, এই বুঝি পূর্বাঞ্চলীয় দ্বার খুলে গেলো। ভারতের সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী এই কথাটি মনে রেখে যথার্থই বলেছেন, ঢাকায় হামলার দায়ভার পশ্চিমবঙ্গ এড়িয়ে যেতে পারে না।
গুলশানকে ধরা হয় ঢাকর মধ্যে অত্যন্ত নিরাপদ এলাকা হিসেবে। এলাকাটিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি দেশের দূতাবাস। বহু বিদেশির বাস সেখানে। এছাড়া বাস করেন ধনাঢ্য বাংলাদেশীরা।
সুরক্ষিত গুলশানে গত এপ্রিলে ইতালির একজন সাহায্যকর্মী সন্দেহভাজন জঙ্গিদের হামলায় নিহত হওয়ার পর এখানে নিরাপত্তা আরও জোরদার করে তোলা হয়। রাস্তায় রাস্তায় বসানো হয় পুলিশের চেকপোস্ট। কিন্তু তারপরও ঠেকানো সম্ভব হয়নি জঙ্গিদের। এতে এ বিষয়টিই প্রমাণিত হয় যে, গুলশানও এখন আর নিরাপদ নয়, যতোটা মনে করা হতো আগে।
গত তিন দশকে অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারান সন্দেহভাজন মুসলিম জঙ্গি হামলায়। কিন্তু এই হামলাগুলো মূলত চালানো হয় ব্যক্তি বিশেষের উপর। যেমন ব্লগার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন, এদের ওপর। আইএসআইএস হামলার দায়িত্ব স্বীকার করায় এই বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আগে না থাকলেও এখন তারা পা রাখার যায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে।
হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের ওপর হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অভিহিত করেছে বাংলাদেশ সরকার। বলছে, জঙ্গি হামলা মোকাবেলায় সেনাবাহিনী যথেষ্ট সক্ষম। তারপরও সহিংসতা বেড়ে গেলে দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে খর্ব হবে। আর দেশের যে বিষয়টি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনরা ভুগবেন ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতায়।
বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত যেমনটা বলছেন, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের উপর হামলার পর তারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব হামলার মুখে নিজেদের অসহায়ও মনে করছেন তারা।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘মৌলবাদীরা আমাদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ায় তারা তা পারছেন না।’
এক দশক আগে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে মৌলবাদী তৎপরতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। বেশ কিছু সহিংস ঘটানাও ঘটে তখন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেয়ায় পিছু হঠে যেতে বাধ্য হয় তারা। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তায় বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপও নেয় সরকার।
কিন্তু আবারও জঙ্গিবাদি তৎপরতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠায় সরকার তাদের বিরুদ্ধে আবারও অভিযান শুরু করে। গ্রেপ্তার করে হাজার হাজার লোককে। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বলেছে, এই অভিযান চালিয়ে সরকার ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোকে কোনঠাসা করছে।’
কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক সহিংসতার পর বাংলাদেশে এখন অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে ৬-৭ শতাংশ হারে। এই স্থিতিশীল পরিস্থতির কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হচ্ছে, বিনিয়োগ করছে বাংলাদেশে।
গতবছর পশ্চিম দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির পাঠনো রেমিটেন্সের ফলে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কে বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দরিদ্রতা কমে গেছে ব্যাপকভাবে।
কিন্তু গুলশানে জঙ্গি হামলার কারণে দেশের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে বড়ো ধরনের যে একটি ফুটোর সৃষ্টি হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা ব্যাবস্থার দুর্বলতাও।
এই কারণে কয়েক বছরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ফলে অর্থনীতিতে যে গতির সঞ্চার বা সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তা মুছে যেতে পারে।

