নিউজ ডেস্ক : আজ আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। প্রতিবছর ঘটা করে দিবসটি পালন করা হলেও থেমে নেই মাদকের ভয়াবহতা। প্রতিদিন মাদকের ছোবলে পড়ে বিপথগামী হচ্ছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কুড়িগ্রামের রৌমারীতেও বর্তমানে এর ভয়াবহতা বেড়েছে। উপজেলার প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে চোরাচালানির হাত বদল হয়ে ঢুকছে ফেনসিডিল, গাঁজা ও ভারতীয় মদ এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছে ইয়াবা আর হেরোইন। যতই দিন যাচ্ছে নেশাখোরদের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা হেরোইন নেশায়ও পা দিচ্ছে।
রৌমারী উপজেলার বেশ কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই বাতাসে ভেসে বেড়ায় মাদকের গন্ধ। সরেজমিনে নেশাখোর ও মাদক বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বিভিন্ন ভয়াবহ তথ্য।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার ফুলবাড়ি, গয়টাপাড়া, চরের গ্রাম, বকবান্দা, চরইটালুকান্দা, ইটালুকান্দা ও সাহেবের আলগা সীমান্ত এলাকাগুলো মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিতি দীর্ঘদিন ধরে। এসব এলাকা থেকে মাদকের বড় বড় চালান উপজেলা শহর ছাড়াও চলে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। বিশেষ করে ফুলবাড়ি সীমান্ত এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই খুচরা ভাবে মদ ফেনসিডিল বিক্রি হয়ে থাকে।
রৌমারী রাজীবপুর ছাড়াও দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, শ্রীবরদি, জামালপুর ও শেরপুর জেলার অনেক নেশাখোর এক নামেই জানে ফুলবাড়ি এলাকার নাম। এমনও তথ্য জানা গেছে, কোথাও মদ, ফেনসিডিল পাওয়া না গেলেও ফুলবাড়িতে গেলে তা পাওয়া যায়। এ কারণে প্রতিদিন নেশাখোররা মোটরসাইকেলে করে ফুলবাড়ি সীমান্ত এলাকায় ঢোকে। এক গাড়িতে চেপে বসেন দুই থেকে তিনজন। ফুলবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘কারা ফেন্সি খোর তা দেখেই বোঝা যায়। নেশাখোরদের মোটরসাইকেলের শব্দই বলে দেয় ফেন্সি খোর আসছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক ব্যবসায়ী জানান, রৌমারী শহর কেন্দ্রিক ভ্রাম্যমাণ মাদক বিক্রেতা রয়েছে প্রায় অর্ধশত। একেক জন দিনে কম করে হলেও ১০টি ফেনসিডিল খুচরা বিক্রি করে। এ হিসেবে দেখা নেশাখোরের সংখ্যাও অনেক। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের ভোলামোড় চত্বরে মাদক বিক্রেতা আর নেশাখোরদের পদচারণা শুরু হয়। মাদক বিক্রেতা আর ক্রেতাদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হওয়ার পর নির্দিষ্ট স্থানে হাজির হয় ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই।
রৌমারী মুক্তাঞ্চল সাংস্কৃতিক ও সমাজ কল্যাণ সংগঠনের পরিচালক ও মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আকতারুজ্জামান জানান, রৌমারীতে মাদকের ভয়াবহতা থাকায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে সব সময় আশঙ্কায় থাকে। কখন যে বন্ধুদের পাল্লায় নেশার ফাঁদে পড়ে।
রৌমারী শিশু-কিশোর মেলা ও বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্র নামে এক সংগঠনের সংগঠক মহির উদ্দিন জানান, মাদকের ভয়ঙ্কর ঝুঁকিতে পড়েছে রৌমারী। নেশায় পড়ে এলাকার মেধাবী ছাত্র ও যুবক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
রৌমারী থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক উত্তরচিত্র পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক রেজওয়ানুল হক পাখি জানান, মাদকের ছোবলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর লেখাপড়া হয়নি। এতে মা বাবা’র স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটেছে। এখনই মাদক প্রতিরোধ করা না গেলে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখেমুখি হতে হবে অভিভাবকদের।
মাদকের ছোবলে অনেক পরিবারের স্বপ্ন আর সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে কয়েকটির চিত্র তুলে ধরা হলো:
ঘটনা-(১):
রেজাউল করিম শামীম এক মেধাবী ছাত্রের নাম। শামীম বোয়ালমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণিতে এবং রৌমারী সিজি জামান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় সে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে সিগারেট খায়। আস্তে আস্তে গাঁজা, ফেনসিডিলসহ নেশায় জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সেখান থেকে ফিরে আসতে পারেনি সে। দীর্ঘদিন মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় জীবনযাপন করার পরে শামীমের চিকিৎসার জন্য উদ্যোগ নেয় তারই (এসএসসি) ১৯৯৭ সালের বন্ধুরা।
ঘটনা (২):
উপজেলার বালুর গ্রামের মৃত আজিজুল হকের ছেলে রেজাউল করিম। রেজাউল হাজির হাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর হঠাৎ করেই নেশার ফাঁদে পড়ে। নেশায় পড়ে তার লেখাপড়া আর হয়নি। নেশার টাকার জন্য সে তার মায়ের ওপর অত্যাচার শুরু করে। রেজাউলের বয়স এখন ২২ বছর। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে মাদকাসক্ত ছেলের নির্যাতনে অতিষ্ঠ মা কোনো উপায় না পেয়ে নেশাখোর সন্তানের বিরুদ্ধে রৌমারী থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ নেশাখোর ওই ছেলেকে গ্রেপ্তার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক তাকে দুই মাসের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠায়।
ঘটনা (৩):
রৌমারী কলেজ পাড়ার ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুস সবুরের ছেলে সেলিম মিয়া একজন মেধাবী ছাত্র ছিল। মাদকের ছোবলে তার লেখাপড়া হয়নি। নেশার টাকার জন্য বাবা মা’র ওপর অত্যাচার ও বাড়িঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করত। এ অবস্থায় ছেলে সেলিম মিয়াকে বাড়িতে শিকল দিয়ে আটকে রাখে তার পরিবার।
ঘটনা (৪):
যাদুরচর ইউনিয়নের গোলাবাড়ি গ্রামের ধনাঢ্য পরিবার শাহজাহান মণ্ডলের ছেলে সোহেল রানার বর্তমান করুন অবস্থা দেখলে কেউ ভাবতেই পারবে না সে হাইস্কুলে একজন ফাস্টবয় ছিল। হাইস্কুল জীবনেই সে মাদকের নেশায় পড়ে। তার বয়স এখন ২৩ বছর। অথচ গত ৯ বছর ধরে সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে হাটবাজার রাস্তা ঘাটে ঘোরাফেরা করে।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য:
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ রৌমারী কোম্পানি সদরের কমান্ডার সুবেদার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মাদকের ব্যাপারে বরাবরই কঠোর এবং নিয়মিত সীমান্তে তৎপরতা চালাই। এ কারণে বর্তমানে সীমান্তে মাদক চোরাচালান অনেক কমে গেছে। তবে পুরোপুরি মাদক বন্ধ করতে হলে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।’
রৌমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এবিএম সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের পর থেকে প্রথমেই মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাই। আপনারা দেখেছেন, প্রায় প্রতিদিনই মাদক বিক্রেতা, নেশাখোরদের ধরে নিয়ে মামলা দিচ্ছি। এটা একটা সামাজিক ব্যাধি। এটা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাদক বন্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে।’

