নিজস্ব প্রতিবেদক : গত ১৬ মার্চ বুধবার জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালা অনুসারে ১৯ মার্চ শনিবার থেকে তামাকজাত দ্রব্যের সব মোড়কে ছবিসহ সতর্কবাণী বাধ্যতামূলক। এবং তামাকজাত সতর্কবাণী দেয়ার বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা সরকারের দায়িত্ব।
কিন্তু ২০ মার্চ রোববার সরেজমিনে ঘুরে আইনটি বাস্তবায়নের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং চোখে পড়েছে ভিন্ন চিত্র! রাজধানীর ফার্মগেট, মগবাজার, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান ঘুরে দেখা গেছে, দু’একটি দোকান বাদে সব দোকানেই ছবিহীন মোড়ক অর্থাৎ পুরানো মোড়কেই বিক্রি হচ্ছে সিগারেট। আর কথা বলে দেখা গেছে, ক্রেতা-বিক্রেতারা জানেন না ছবিসহ সতর্কবাণী সংবলিত তামাক মোড়কের বিষয়ে।
এদিকে, ছবিসমৃদ্ধ সিগারেট মোড়ক যেসব বিক্রেতার হাতে পৌঁছেছে, তারাও মোড়কটি ক্রেতাদের সম্মুখে না এনে কিছুটা আড়াল করে খোলাভাবে বিক্রি করছে ওই মোড়কের সিগারেট। তারা বলছে, হঠাৎ করে ছবিসহ এ মোড়ক চোখে পড়লে ক্রেতাদের কৌতুহল মেটাতে অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে। তাই নতুন মোড়ক আড়াল করেই বেচতে হচ্ছে আপাতত। তবে ছবিসহ সিগারেট মোড়ক বাজারে প্রচলিত হয়ে গেলে তখন আর এমন সমস্যা হবে না।
অপরদিকে, আগের মোড়কেই সিগারেট বিক্রির কারণ জানতে চাইলে মালিবাগ মোড়ের সিগারেট বিক্রেতা সাইফুল বলেন, ‘ছবিসহ সিগারেটের প্যাকেট এখনো আমাদের হাতে পৌঁছেনি। তাই পূর্বের কেনা মোড়কের সিগারেটই আপাতত বিক্রি করছি। তবে নতুন মোড়ক হাতে এলে আমরা সেটিই বেচবো।’
আবার ছবিসহ তামাকজাত সতর্কবাণী দেয়ার বিষয়ে জনগণকে অবহিত করার দায়িত্ব সরকারের হলেও আইন ভেঙে সে দায়িত্ব কোম্পানিগুলো নিজেই পালন করছে। মূলত তামাকজাত দ্রব্যের প্রচারণা চালানোর লক্ষেই কোম্পানিগুলো এটি করছে বলে অভিযোগ তুলেছে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো।
শুধু তাই নয়, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ভঙ্গের প্রেক্ষিতে বিএটিসহ সব তামাক কোম্পানির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে রোববার (২০ মার্চ) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটসহ (বাটা) সমমনা তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় কর্তৃক আইনী পদক্ষেপের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার দাবিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপিও দিয়েছে তারা।
তামাকবিরোধী জোটের অভিযোগ, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল বা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের গণবিজ্ঞপ্তির পূর্বে বিএটি দেশের বিভিন্ন স্থানে সিগারেট প্যাকেট পরিবর্তনের নামে লিফলেট, হ্যান্ডবিলসহ প্রচারণা চালায়।
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি (বিএটি) সিগারেট প্যাকেট পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণার আড়ালে তামাকজাত দ্রব্যের প্রচারণা চালাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী হেলাল আহমেদ বলেন, ‘ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) এ প্রচারণা বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ৫ এর ১(ক) এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা-৫ উপধারা ১ (ক) এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি, প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, বাংলাদেশে প্রকাশিত কোনো বই, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ছাপানো কাগজ, বিলবোর্ড বা সাইন বোর্ডে বা অন্য কোনোভাবে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করিবে না বা করাবেও না।
আবার আইনের ধারা ৫ এর উপধারা ১(ছ) লঙ্ঘন। উল্লেখ্য আইনের ১ (ছ) এ বলা হয়েছে ‘তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়স্থলে যেকোনো উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করিবে না বা করাইবে না।
এছাড়া তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন অনুসারে কোনো ব্যক্তি ও কোম্পানি বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত ধারা লঙ্ঘন করিলে অনধিক ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এ বিষয়ে তামাক বিরোধী সংগঠন নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ঈবনুল সাঈদ রানা বলেন, ‘বিএটিসহ অন্যান্য তামাক কোম্পানিগুলো প্রায়ই নানাভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনভঙ্গ করে প্রচারণা করে আসছে। রাষ্ট্রের আইনভঙ্গ করে বিজ্ঞাপন প্রচারকারী এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
আর ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সৈয়দা অনন্যা রহমান বলেন, ‘১৯ মার্চ পেড়িয়ে গেলেও ধূর্ত ও প্রভাবশালী তামাক কোম্পানিগুলো আইন বাস্তবায়নে টালবাহানা করেই চলেছে। তাই কোম্পানিগুলোর এ ধরনের কার্যক্রম প্রতিহত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অত্যন্ত জরুরি।’

