নিজস্ব প্রতিবেদক : উপকূলীয় এলাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগর। সুন্দরবন সংলগ্ন এ উপজেলা বেশ শান্ত ও নিরিবিলি। এখানকার মানুষের জীবনযাপন ও জীবিকা অন্য এলাকার চেয়ে আলাদা। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় তাদের। এ উপজেলার একেবারে দক্ষিণে কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষজনের পেশা সাগরে মাছ শিকার, জঙ্গলে কাঁকড়া ধরা, পোনা ও চিংড়ি সংগ্রহ আর জাল টানা। কেউ কেউ ইটভাটায় কাজ করেন। এখানকার মানুষের প্রধান পেশা চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ।
পানি লবণাক্ত হওয়ায় অন্য অঞ্চলের মতো সেখানে ধান গম আখ প্রভৃতি চাষ সম্ভব হয় না। এখানে আছে শুধু ঘের আর ঘের। মাঠের পর মাঠ চিংড়ি ও কাঁকড়ার ঘের। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আইলার পর এখানকার ঘের ও নদীগুলোতে পড়ে গেছে চর। এরপর থেকে সেখানে স্থানীয়দের টিকে থাকা আরো কঠিন হয়ে পড়ে।
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সেখানকার শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে শ্রমিকের কাজে। বলা যায়, অন্য অঞ্চলের চেয়ে এখানে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। শ্রমজীবী পরিবারের শিশুদের ঝরে পড়া রোধসহ নারী ও শিশুদের সুরক্ষা এবং স্কুলছাত্রীদের বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সচেতন করতে শ্যামনগরে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি নানামুখী প্রকল্প।
শ্যামনগর উপজেলায় ১২৫টি এবিএল (অ্যাবিলিটি বেজড লার্নিং) স্কুল আছে, যেখানে পড়াশুনা করছে ৩ হাজার শিক্ষার্থী। ইউনিসেফের অর্থায়নে এ স্কুল পরিচালনা করে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন। পরিবারের প্রয়োজনে যে শিশুরা কাজ করতে বাধ্য হয় কিংবা নিয়মিত স্কুলে যেতে না পারায় ঝরে পড়ে, তাদের মূলধারার স্কুলে পুনরায় পাঠানোর জন্য এবিএল স্কুলে পড়াশুনা করানো হয়। দুই শিফটে পরিচালিত এ স্কুলে সুবিধামতো যেকোনো শিফটে শিশুরা পড়াশুনা করার সুযোগ পায়। স্কুলে উপস্থিতির জন্য এবিএল স্কুলের শিশুদের প্রতি মাসে ১০০ টাকাসহ শিক্ষা উপকরণও সরবারহ করা হয়।
শ্যামনগরে চলতি বছর এ পর্যন্ত ৩২০ জন শিশুকে মূলধারার স্কুলে পাঠানো হয়েছে। এতে যে শিশুটি হয়তো কাজ করত অন্যের বাড়িতে অথবা যাকে বেছে নিতে হতো বুয়ার কাজ, এবিএল স্কুল পাল্টে দিয়েছে তাদের জীবন। কে জানে অসীম সম্ভাবনাময় এসব শিশুদের মধ্য থেকেই কেউ হয়তো ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারে জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব।
শ্যামনগরের বুড়ি গোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুরি গ্রামের সাকিম গাজীর বয়স ১১। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া এ শিশুর স্বপ্ন সে ভবিষ্যতে একজন স্কুলশিক্ষক হবে। তবে পাঁচ বছর আগে তছনছ হয় তার স্বপ্ন। সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে তার বাবা জলদস্যুদের হাতে প্রাণ হারায়। একপর্যায়ে জীবনের প্রয়োজনে মা-ও তাকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর সাকিমের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সাগরে মাছ ধরার জন্য জেলেদের চাঁদা দিতে বাধ্য করা, মাঝিদের জিম্মি, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় এ অঞ্চলে একটি মারাত্মক সমস্যা।
শ্যামনগরে সাকিমের মতো এমন অসহায় ও এতিম ৪৩ শিশুকে লেখাপড়া, চিকিৎসা, স্কুলড্রেস প্রভৃতি খরচের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। দেড় বছরের জন্য এসব শিশুকে দেওয়া হয়েছে ৩৬ হাজার টাকা। জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনিসেফ এ অর্থসহায়তা করে। মূলত ইউনিসেফ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে টাকা দেয়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।
স্কুল-কলেজ ছাত্রীদের সচেতনতা কর্মসূচি
বাল্যবিয়ের জন্য আইন নয় বরং মেয়েদের সচেতন করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে ইউনিসেফ। ‘স্কুল ছাড়া কিছু নয়, এখন আমার ১৮ নয়’ এ ধরনের স্লোগানে মেয়েদের সচেতন করা হচ্ছে। স্থানীয় কমিউনিটি রেডিও নলতায় সপ্তাহে একদিন এক ঘণ্টা শিশু ও নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, অপুষ্টি প্রভৃতি নারী ও শিশু বিষয়ক অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়ে থাকে।
এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নে মাধ্যমিক স্কুলছাত্রীদের ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, মা ও শিশুদের চিকিৎসা এবং প্রসূতিদের জন্য স্থানীয়ভাবে সোলার পরিচালিত অ্যাম্বুলেস চালু করা হয়েছে বলে জানান স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
শিশু সুরক্ষায় ‘প্রজাপতি সংঘ’
যশোরের আরবপুরের রঘুরামপুরে ‘প্রজাপতি শিশু সংঘ’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন রয়েছে। শিশুদের অধিকার, ক্ষমতায়ন ও জীবন দক্ষতা উন্নয়নে পরিচালিত হয় এ স্কুল। সমাজের অনগ্রসর শিশু এবং অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে এমন শিশুদের এ স্কুলে খেলাধুলা, চিত্তবিনোদন, গল্প ও আড্ডার মাধ্যমে আতœবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা হয়।
এখানে সপ্তাহে দুদিন জীবন দক্ষতাভিত্তিক ‘লাইফ স্কিলস’ ক্লাস করানো হয়। জীবন দক্ষতার বিভিন্ন উপাদান যেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান, সঠিক যোগাযোগ সক্ষমতা, অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, অন্যের জায়গায় নিজেকে ভাবা, আবেগ ও মানসিক চাপে টিকে থাকা, খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন, শিশু নির্যাতন ও পাচার থেকে সুরক্ষার অধিকার, খেলাধুলা ও বিনোদনের অধিকার, ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ, শেখার আগ্রহ তৈরিসহ বেঁচে থাকার জন্য কী কী দরকার এবং প্রতিনিয়ত শিশুরা যেসব সমস্যায় পড়ে সেসব বিষয় ক্লাসে শেখানো হয়। সপ্তাহের অন্যদিন শিশুরা স্কুলে এসে গল্প, আড্ডা ও খেলাধুলা করে সময় কাটায়। এতে একজন শিশুর মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন চলে আসে। এভাবে এসব শিশুদের সামাজিকতা শেখানোর চেষ্টা করে প্রজাপতি শিশু সংঘ।

