বিনোদন ডেস্ক : বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় এবং আকাঙ্ক্ষিত শিল্পগুলোর একটা হচ্ছে মডেলিং। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম মডেলিংয়ের পোকা। যারা মডেলিং করেন এবং যারা মুগ্ধ হয়ে তা দেখেন, কথাটা দুজনের ক্ষেত্রেই সত্য। কে না চায় চমৎকার সব পোশাক পরে নিজেকে স্পট লাইটে তুলে ধরতে? হাজারো উৎসুক চোখের সামনে দিয়ে এমনভাবে হাঁটতে যেন আশেপাশে কেউ নেই!
বড় বড় ব্র্যান্ডের পোশাক পরে স্পট লাইটের আলোয় মডেলরা যে রকম জীবন উপভোগ করেন, দর্শকরা সেটা দেখে সেই জীবনের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু মডেলিং শিল্প শুধু আনন্দ-ফুর্তি আর ইতিবাচক জিনিসে ভরপর নয়। এখানে সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে অনেক কদর্যতা। এটা বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত শিল্পগুলোর মধ্যে একটা।
মডেলিং শিল্পে আদর্শ মডেল হিসেবে ধরা হয় লম্বা রোগা ‘জিরো সাইজ’ শারীরিক আকৃতিকে। তারমানে কি একটু মোটা আকৃতির মানুষ মডেল হতে পারবে না? যে কারণে এটা নিয়ে বিরক্তি ও বিতর্ক দুটোই রয়েছে। প্লাস সাইজ (শারীরিক আকৃতিতে বড়) মডেলদের উত্থান কিংবা প্রত্যাখ্যান, স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ে মানুষের চিরন্তন ভীতি কিংবা মডেলিংয়ে মানুষের গাত্র বর্ণের প্রভাব, চাহিদা- এসব মিলিয়ে মডেলিং শিল্পে চলছে বিরতিহীন বিতর্ক।
এখনকার মডেলরা ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। এই শিল্পের সাথে জড়িত হর্তাকর্তারাও বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে নিষ্পত্তিমূলক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু বিশাল মডেলিং শিল্পের সাথে জড়িত অসংখ্য মানুষের মাত্র অল্প কয়েকজন সবার চোখের সামনে আসেন। এদেরকেই সবাই চেনে। পর্দার আড়ালে যারা রয়েছেন তাদের খবর কি? পর্দার আড়াল থেকে গোটা ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণ করেন নীরব ও ক্ষমতাবান কিছু পরিচালক, ব্যবস্থাপক এবং কর্মীরা। বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি, নতুনত্ব এবং চাহিদা কীভাবে মডেলিং শিল্পকে প্রভাবিত করছে সেটা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন তারাই।
ফ্যাশন বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘দ্য ফ্যাশন স্পট’ এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মডেলিংয়ের বর্ণবাদী বৈচিত্র্যের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস এবং মিলানের ৭৭ শতাংশ মডেলই শ্বেতবর্ণের। এই ঘটনা নিউইয়র্কে সবচেয়ে বেশি। সেখানকার নামকরা একটি ফ্যাশন এজেন্সি ‘এএমকাস্টিং’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যাংগাস মুনরো বলেন, ‘বর্ণবাদ যে একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা আমাদের জন্য মর্যাদা হানিকর। তবে এটা রুখতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
গাত্র বর্ণের কারণে বৈষম্য এবং চাকরি হারানোর উদাহরণ ফ্যাশন দুনিয়ায় অনেক রয়েছে। তবে এখন সময় বদলাতে শুরু করেছে। প্রতি মুহূর্তে বর্ণবাদ কমছে একটু একটু করে। প্রিমিয়ার মডেল ম্যানেজমেন্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্যারল হোয়াইট বলেন, ‘আমি মনে করি এই ইন্ডাস্ট্রিতে বর্ণবাদ ও বৈষম্য কমছে। মডেলদের গাত্রবর্ণ এবং দৈহিক আকারে পরিবর্তন আসছে। আমি যখন প্রথম এই ব্যবসায় এসেছিলাম তখন মেয়েদের বুকের আকৃতি নিয়ে অনেক বিধি নিষেধ ছিল যেটা এখন অনেক সহনীয়।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসার পরে মডেলিং দুনিয়ায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। সংস্থাগুলো কীভাবে তাদের পণ্য বাজারজাত করবে সেই প্রক্রিয়াও বদলেছে। এক্ষেত্রে যে সমস্ত মডেলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভক্তের সংখ্যা বেশি তারা প্রাধান্য পাচ্ছেন। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, এই মুহূর্তে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি বিখ্যাত তারা সবাই অপ্রচলিত ধারার মডেল। এদের উত্থান নিয়ে মডেলিং সংস্থাগুলোর ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
অ্যাংগাস মুনরো বলেন, একটা সময় মডেলিং করাটা অধ্যাবসায়ের বিষয় ছিল। সেই সফল মডেল হতে পারতেন, যিনি অধ্যাবসায় করতেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কিম কারদাশিয়ান, কেনডেল জেনারের মতো আরও অনেক মডেলের উত্থান ঘটেছে যারা ফ্যশন আইকন নন, কিন্তু ইন্টারনেটের কারণে আইকন বনে গেছেন।
পিটার ফিজপ্যাট্রিক ২০১৫ সালে নিউইয়র্কে ‘সুইপকাস্ট’ নামের প্রতিষ্ঠান চালু করেন। এখানে প্রযুক্তি ব্যবহার করে মডেল চিহ্নিত করার কাজটি করা হয়। যাতায়াত, স্বাস্থ্য, সঙ্গীত এবং অন্য সমস্ত শিল্পে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখছে। সুইপকাস্ট মডেলদেরকে সরাসরি ব্র্যান্ডগুলোর সাথে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়। এতে করে যেটা হয়েছে, মধ্যবর্তী দালাল প্রতিষ্ঠানগুলো নেই। খরচ কমে গেছে অনেক। সুইপকাস্ট কাজ করে অনেকটা মার্কিন অনলাইনভিত্তিক পরিবহন সংস্থা ‘উবার’ এর মতো। উবারে যেমন কেউ দরকারি গাড়ি খুঁজে নিতে পারেন, এখানেও তেমনি মডেল খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে অনেকেই ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখছেন না। কারণ এখানে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। তাছাড়া মডেলরা জানেন না কীভাবে দরাদরি করতে হয়। যে কারণে ক্যারল হোয়াইট বলেন, তার মতে এটা খুব একটা সুবিধা দিতে পারছে না এবং ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
সারাহ বুনটার বলেন, বর্তমান মানুষের চাহিদা ও প্রবণতা খুব দ্রুত এবং ক্রমাগত বদলাচ্ছে। এরকম অস্থিতিশীল অবস্থায় মডেলদের মধ্যে নির্ভেজাল একটা চিত্র সবাই খোঁজে। সবাই চায়, তাদের মডেলকে দেখতে বিশ্বাসযোগ্য এবং আসল মনে হবে। ভেজাল হলে চলবে না।
ব্র্যান্ডগুলো এখন মডেল খুঁজে বের করার জন্য বেশি করে ‘স্ট্রিট কাস্টিং’ (পেশাদার মডেল না নিয়ে রাস্তা থেকে সরাসরি মডেল খুঁজে নেয়া) এর পক্ষ নেয়। তাতে তাদের খরচ কম হয় এবং সরাসরি যে মডেলকে নির্বাচন করা হয় সে কাজের জন্য আরও বেশি উপযুক্ত এবং নির্ভেজাল হয়।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে প্যারিসে একটি আইন পাস হয় অতিরিক্ত রোগা মডেলদের বাতিল করা নিয়ে। এই আইন মতে মডেলদেরকে নিজের ওজন সম্বন্ধে ডাক্তারি সনদ দেখাতে হবে। এর আগে স্পেন, ইতালি এবং ইসরায়েলেও অতিরিক্ত রোগা মডেলদের নিয়ে আইন পাস হয়েছে।
তবে আইন দিয়ে সবাইকে বোঝানো সম্ভব না। সবাই চায় মডেলের শারীরিক অবস্থা যেন হালকা পাতলা এবং স্বাস্থ্যবান হয়। যে কারণে মডেলদের খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ। এসমস্ত ব্যাপারে মডেলদের থেকে এজেন্টরা আরও বেশি সচেতন।
ক্যারল হোয়াইট বলেন, ‘মডেলদের খাওয়া দাওয়া এবং শারীরিক যোগ্যতা নিয়ে আমরা অনেক বেশি উদ্বিগ্ন। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, হালকা পাতলা যেসব মডেল দেখা যায় তারা আসলে বয়সে তরুণ। আমার মনে হয় ‘সাইজ জিরো’ নিয়ে গণমাধ্যম মানুষের কাছে কিছুটা ভুল ব্যাখ্যা করেছে। বয়স হলে কেউই সাইজ জিরো থাকে না।’
এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর বেশিরভাগ জায়গাতেই কাজের ক্ষেত্রে পুরুষেরা নারীদের চেয়ে বেশি বেতন পায়। কিন্তু মডেলিংই একমাত্র জায়গা যেখানে নারীরা বেশি বেতন পায়। দুয়েকটা ব্যতিক্রম ছাড়া মডেলিংয়ে ছেলেদের সামাজিক আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক অবস্থান মেয়েদের চেয়ে খারাপ।
এই বৈষম্য নিয়ে অ্যাংগাস বুনটার বলেন, ‘আমি কিছুতেই বুঝি না, একই কাজের জন্য একজন পুরুষ মডেল নারী মডেলের ভগ্নাংশ বেতন পান কেন? পরিস্থিতি যদি উল্টো হতো তাহলে তো ঠিকই হইচই পড়ে যেত। আমি মনে করি এটা মারাত্মক বৈষম্য। তাছাড়া ছেলেদের দৈহিক আকৃতির উপরেও তাদের বেতন নির্ভর করে। এটা আরেকটি বৈষম্য।’
সবশেষে প্রশ্ন হচ্ছে, মডেলিং শিল্পের ভবিষ্যৎ কী? এই শিল্পের বোদ্ধারা এতক্ষণ পর্যন্ত নানান বৈষম্য নিয়ে কথা বলেছেন। বর্তমান সমস্যাগুলো নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা আশাবাদী। আশাবাদী না হয়ে তাদের উপায় নেই। ব্যবসা খারাপ হলে তাদের জীবিকা মাথায় উঠবে!
অ্যাংগাস মুনরো বলেন, ‘আমি সার্বিকভাবে আশাবাদী। তবে সেইসাথে ভালো মডেলদের ভিতরে আরেকটু বেশি আনুগত্য দেখতে পেলে ভালো লাগতো। আর সবসময় মানুষের ‘আরও চাই’ প্রবণতাটা আরেকটু কম দেখতে পেলেও খুশি হতাম।
সারাহ বুনটারের মতে, মডেলিং দুনিয়ায় ক্ষমতার একটা ভারসাম্য থাকা উচিত। মানুষ যদি কোনো ব্র্যান্ডের মডেল এবং পণ্য পছন্দ না করে তাহলে সেটা তার কেনা উচিত না। ফ্যাশন সবসময় সস্তা হবে এটা ভাবা উচিত না, ফ্যাশন সবসময় দ্রুত পরিবর্তনশীল হবে সেটা ভাবাও উচিত না।
ক্যারল হোয়াইট সবার শেষে বলেন, সবকিছু এতো দ্রুত চলছে যে, একটা দেখামাত্রই সেটা ভুলে গিয়ে আরেকটা দেখার জন্য মানুষ লোভীর মতো বসে থাকে। আমি সবসময় চিন্তা করি, সেই আরেকটা টা কী হবে?

