বিনোদন ডেস্ক : একজন নারী সঙ্গীতশিল্পী শুধুমাত্র গান গেয়ে একটা দেশের ‘মা’ আখ্যা পেতে পারেন, এমনটা কেউ কি দেখেছেন কখনো? কিংবা জানেন? যে এডিত পিয়াফ তার সময়ে সমস্ত ইউরোপ মাতিয়েছেন, তার ভাগ্যেওতো জুটেনি এমন উপাধি! সাড়া ইউরোপ মাতিয়ে এডিত পিয়াফ নাম কুড়িয়েছিলেন ‘প্যারিসের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে! কিন্তু শুধু গানে গানে বর্ণবৈষম্যের কথা বলে গোটা জাতির কাছে ‘মা’ উপাধিতে প্রখ্যাত হয়েছেন আফ্রিকার অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী মিরিয়াম মাকেবা! জন্মদিনে আফ্রিকার জননীকে শ্রদ্ধা!
সারা জীবন অন্যায়, অসত্য আর সমাজ ও শাসকের ভঙ্গুরতার বিরুদ্ধে আর নিপীড়িত মানুষের পক্ষে গান গেয়েছেন আন্দোলন করেছেন। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি গাইছিলেন মাফিয়া বিরোধী একটি কনসার্টে। ২০০৮ সালে তিনি গিয়েছিলেন ইতালিতে। আফ্রিকার মত ইতালিতেও সন্ত্রাস ও মাফিয়া চক্রের ছিল বিস্তার। এইসব মাফিয়া চক্রদের বিরুদ্ধে বরাবরই তিনি ছিলেনে সোচ্চার। তাই ৭৬ বছর বয়সেও তিনি আফ্রিকা থেকে অংশ নিতে গিয়েছিলেন ইতালির সেই কনসার্টে। সুস্থ সতেজ মনে গাইলেও তারপর দিন হঠাৎ করেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইতালির একটি ক্লিনিকে মারা যান বিখ্যাত এই গায়িকা ও আফ্রিকার জননী।
দক্ষিণ আফ্রিকার এই সংগ্রামী নারীকে আফ্রিকা মহাদেশের মানুষ ভালবেসে ডাকতেন ‘মামা আফ্রিকা’ অর্থাৎ ‘আফ্রিকার জননী’ বলে৷ মিরিয়াম মাকেবা তার সংগীতের মাধ্যমে সারা জীবন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন৷ গেয়েছেন স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, শান্তি ও সম্প্রীতির গান৷ তার মাতৃভূমি দক্ষিণ আফ্রিকায় তখনকার বর্ণবৈষম্যবাদী শাসকদের বিরুদ্ধে সবসময় উচ্চকন্ঠ ছিলেন মিরিয়াম মাকেবা৷ ফলে এসবের জন্য তাকে প্রচুর রাষ্ট্রীয় গঞ্জনা ও কাঠখর পোড়াতে হয়েছে।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় দেশ থেকে নির্বাসিতও হন তিনি। এরপর আরেক কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলার অনুরোধে নব্বইয়ের দশকে স্বদেশে ফিরেন মিরিয়াম মাকেবা৷
মিরিয়াম মাকেবার জন্ম ১৯৩২ সালের চার মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে৷একেবারে অল্প বয়স থেকেই সংগীতের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ৷ স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কোরাস সংগীতে অংশ নেন৷ পঞ্চাশ দশকে জ্যাজ সংগীত শিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি৷ ১৯৫৯ সালে বর্ণবৈষম্য বিরোধী একটি প্রামাণ্যচিত্র ‘কাম ব্যাক আফ্রিকা’য় অংশ গ্রহণের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠীর রোষের কবলে পড়েন মিরিয়াম মাকেবা৷ নির্বাসনে যেতে হয় তাকে৷ ষাটের দশকে তার হিট গান ‘পাটা পাটা’ তাকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি৷ ঐ প্রথম একজন আফ্রিকান সংগীত শিল্পীর গান অ্যামেরিকার হিট গানের তালিকায় প্রথম দশটি গানের মধ্যে স্থান পায়৷
‘পাটা পাটা’ গানটি তাকে বিশ্বখ্যাতি এনে দিলেও এ ধরনের চটুল গানের প্রতি তার আগ্রহ ছিল খুব কম৷ বরং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে গান গাইতেই ভালবাসতেন তিনি৷
অ্যামেরিকায় হ্যারি বেলাফন্টে, জেমস ব্রাউন, পল সাইমন ও আরো বহু খ্যাতিমান সংগীত শিল্পীর সাথে অনুষ্ঠান করেছেন তিনি৷ গ্র্যামি পুরস্কার সহ আরো বহু সম্মাননায় ভুষিত হয়েছেন এই খ্যাতনামা সংগীত শিল্পী৷ বর্ণবাদবিরোধী সংগীতের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতীক৷

