সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি : পুরাতন জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে দীর্ঘদিন ধরে শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হচ্ছে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রতিনিয়তই ভয় ও আতঙ্কে থাকেন। অবকাঠামো, খেলার মাঠ, টিউবওয়েল, টয়লেট, বাথরুমসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত সিরাজগঞ্জ সদর পৌর এলাকার নব জাতীয়করণ করা চর মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পড়ালেখা করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিকুলতায় ভুগতে হয় শিশু শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও।
সরেজমিনে দেখা যায়, জীর্ণদশা ভবনটির প্লাস্টার খসে পড়ে কঙ্কাল হয়ে আছে। ইটগুলো খসে পড়ছে। দরজা-জানালাগুলো ভেঙে পড়ছে। চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চ সঙ্কট। যা আছে সেগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। তারপরও প্রচীন এ বিদ্যালয়টি দীর্ঘ প্রায় আড়াই যুগ ধরে নিরলসভাবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বিশেষ অবদান রাখলেও বর্তমানে অনেক কষ্ট করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান করতে দেখা যায়। এসব সমস্যা ও সঙ্কটের কারণে স্কুলের পাঠদান ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের এ সকল সমস্যার সমাধান নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। অবকাঠামো উন্নয়ন বা সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই বলে অভিযোগ অভিভাবক ও শিক্ষকদের।
১৯৮৭ সালে ১০ শতক জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় স্কুলটি। ১৯৯৩-৯৪ অর্থ বছরে ৩টি শ্রেণিকক্ষ ও একটি ছোট অফিসরুমের ছাদ করা পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়। নিম্নমানের কাজ হওয়ায় কিছুদিন পর থেকেই চুন, সুড়কি ও প্লাস্টার খসে পড়তে থাকে।
এ ছাড়াও নিচু জায়গায় ঠ্যাংওয়ালা স্কুল ভবন না হওয়ায় বন্যার বেশির ভাগ সময় বিদ্যালয়টি পানিতে তলিয়ে থাকে। ওই সময় বিদ্যালয়ে পাঠদানে খুব কষ্ট হয়। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্তের পাশাপাশি অল্পসময়ের মধ্যেই পুরো ভবনটি ড্যাম হওয়ায় ইট, প্লাস্টার, সুরকি খসে পড়ে ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
২০১০ ও ২০১৫ সালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে দুইবার বিদ্যালয়ের ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছেন। কিন্তু নতুন ভবন বা অবকাঠামোর কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সেইখানেই প্রায় আড়াইশ শিক্ষার্থীদের পাঠদান দিচ্ছেন শিক্ষকরা। নানা সমস্যা আর প্রতিকুলতার মাঝেও শিক্ষকদের আন্তরিকতায় ভালোমানের পড়ালেখা হচ্ছে এ বিদ্যালয়ে।
অত্র বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির রাব্বি, শাকিল, মিথিলা, ৪র্থ শ্রেণির ভাবনা, ফাতেমা, বেল্লালসহ অনেক শিক্ষার্থীরাই জানায়, ঝড়-বৃষ্টি আসলেই আমরা ও স্যারদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। বৃষ্টিতে ছাদ থেকে ক্লাসে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। ভালো দিনেও স্যাররা ক্লাস নেয়ার সময় মাঝে মধ্যেই মাথার উপর ইট ও প্লাস্টার খসে পড়ে। খেলার মাঠ না থাকায় আমরা টিফিনের সময় খেলাধুলা করতে পারি না। স্কুলে টিউবওয়েল, টয়লেট ও বাথরুম না থাকায় আমাদের অনেক সমস্যা হয়।
অভিভাবক কোহিনুর, ছালমা বেগম, ইয়াকুব জানান, স্কুলটি এলাকার শিক্ষার মান উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। ভালো পড়ালেখা হওয়াতে বিদ্যালয়ে ছেলে মেয়েদের ভর্তি করানো হয়। কিন্তু স্কুলের নানা সমস্যা থাকায় একদিকে যেমন ছাত্র-ছাত্রীদের কষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে শিক্ষকরাও ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন।
প্রধান শিক্ষক মো. গোলজার হোসেন জানান, স্কুলের ভবনসহ নানা সমস্যার কথা কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে বারবার জানালেও এখন পর্যন্ত অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সদর প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নতুন জাতীয়করণসহ সদর উপজেলায় মোট ২৪৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ, পরিত্যক্ত ও পাঠদানে অনুপযোগী বিদ্যালয়গুলো চর মিরপুর সপ্রাবি, পঞ্চসারোটিয়া সপ্রাবি, খোর্দ্দ শিয়ালকোল সপ্রাবি, ফুলকোচা সপ্রাবি, রতুনী সপ্রাবি, চর কালিদাস গাতি সপ্রাবি, হরিণাহাটা সপ্রাবি, খাগা সপ্রাবি, পানিয়া বাড়ি সপ্রাবি, বিনয়পুর খোলা বাড়ি সপ্রাবি, ভেন্নাবাড়ি সপ্রাবিসহ ৯০টি স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণের এবং ৭৯টি মেরামতের জন্য তালিকা করে গত বছরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালেক বলেন, ‘বিদ্যালয়ের অবকাঠামোসহ নানা সমস্যার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। খুব শিগগিরই এসব সমস্যার সমাধান করা হবে। চরাঞ্চলের ও নব জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই অবকাঠামো একেবারেই দুর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বেশি।’

