অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : ভোজ্য তেলে ভিটামিন এ মেশানোর নিয়ম মানছেন না ব্যবসায়ীরা। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ নিয়ে সমঝোতা স্মারকও সই করেও তা উপেক্ষা করছে অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান। বাজারে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত স্টিকার ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে ভোজ্য তেল।
সরেজমিনে বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিক্রির জন্য সংরক্ষিত ভোজ্য তেলে নেই ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত স্টিকার। সরকারের ঘোষণার শুরুতে কিছুটা গুরুত্ব দিলেও ভিটামিন এ মেশানোর বিষয়টি অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা প্রায় ভুলে গেছেন। কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও প্রচারণার অভাবে ক্রেতারাও ভিটামিন এ মেশানো ভোজ্য তেলের কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রায় ভুলতে বসেছে।
ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতি মেটাতে ভোজ্য তেলে তা মেশানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু গত বছর ১০ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে দেশের সব ভোজ্য তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ও শোধনাগার প্রতিষ্ঠানকে ভিটামিন ‘এ’ মেশানো নিশ্চিত করতে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটামও দিয়েছিলেন। মন্ত্রীর ওই ঘোষণার আড়াই মাস পরও বাজারে ভোজ্য তেলে ভিটামিন এ স্টিকার যুক্ত বোতল কিংবা ড্রাম দেখা যাচ্ছে না।
দেশে ভোজ্য তেলের প্রায় ৭০ ভাগই খোলা বা লুজ অবস্থায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া ৩০ শতাংশ ভোজ্য তেল বোতলজাতের মাধ্যমে বিক্রি হয়। সব ধরনের ভোজ্য তেলেই ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত স্টিকার আইনে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কাওরান বাজার পাইকারি ব্যবসায়ি রশিদ ইন্টারন্যাশনাল-এর সত্ত্বাধিকারী আব্দুর রশিদ জানান, তারা কোম্পানি থেকে কিনে কাস্টমারদের কাছে বিক্রি করেন। ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত স্টিকার ছাড়া যদি তেল বিক্রি নিষিদ্ধ হতো তা হলে তারা তা বিক্রি করতেন না। তবে এ বিষয়ে সরকার আরও কঠোর হলে সব ভোজ্য তেল উৎপাদক কোম্পানি ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত করবে বলে মনে করেন তিনি।
কাপ্তান বাজারের ব্যবসায়ী আজিজ ব্যাপারী জানান, ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত তেল চায় এমন কাস্টমারদের সংখ্যা খুব কম। আসলে এর উপকারিতা সম্পর্কে বেশি করে প্রচার করতে হবে। তাহলে ক্রেতা-বিক্রেতাসহ সবাই সচেতন হবে। এ প্রক্রিয়ায় ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত তেল বিক্রি নিশ্চিত করা যায় বলে মনে করেন তিনি।
ভিটামিন ‘এ’ মেশানোর বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুফ নিউট্রিশনের একটি প্রকল্প রয়েছে। সংস্থাটির প্রথম প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সময় ফের বাড়ানো হয়েছে। আর এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল।
প্রকল্পের মাধ্যমেও ভিটামিন ‘এ’ মেশানোর প্রিমিক্স সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিছু দিন প্রিমিক্স আমদানি বন্ধ থাকলেও আবার তা চালু হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমেও উৎপাদক কোম্পানিগুলো ভিটামিন ‘এ’ মেশানোর কাজ করতে পারে। তবে বড় বড় কোম্পানিগুলো নিজেরাই প্রিমিক্স আমদানি করছে।
ওই প্রকল্পের আওতায় ভিটামিন ‘এ’ মেশানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিএসটিআইকে কীভাবে ভিটামিন ‘এ’-র গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে তা শেখানো হচ্ছে।
ভোজ্য তেলে ‘এ’ মেশানোর বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ফরটিফিকেশন অডিবল ওয়েল ইন বাংলাদেশ প্রজেক্ট (ফেজ-২) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, বুদ্ধিদীপ্ত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩ পাস করে। এ আইনের আওতায় প্রতিটি ভোজ্য তেল কোম্পানির পেট বোতল, ড্রামে ভিটামিন এ মেশানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাজারজাতকারী কোম্পানির ড্রাম ও বোতলের গায়ে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত স্টিকার লাগাতে আইনে বলা হয়েছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এ আইনের অবহেলা করে তাহলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিরও বিধান আছে।
তারা বলেন, ফরটিফিকেশন অডিবল ওয়েল ইন বাংলাদেশ প্রজেক্ট ২০১০ সালে শুরু হয়েছে। এ প্রজেক্টের আওতায় বিদেশি প্রশিক্ষক দিয়ে বিএসটিআই ও রিফাইনারি কোম্পানির কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত আছে কি না তা পরীক্ষার কৌশলও বিএসটিআই কর্মকর্তাদের শেখানো হয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ মেশানোর পদ্ধতিও শেখানো হয়েছে উৎপাদক কোম্পানির কর্মকর্তাদের।
ভোজ্য তেল উৎপাদক কোম্পানি ও রিফাইনারি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জার্মানির বিএএসএফ-এর প্রিমিক্স তারা আমদানি করছে। সরকারের সিদ্ধান্তের পর থেকে ভোজ্য তেলে ‘এ’ মেশানো হচ্ছে। তবে বাজারজাতকরণে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
তারা আরও বলছেন, ভোজ্য তেল উৎপাদনে সম্পৃক্ত বড় কোম্পানি ও রিফাইনারিতে ভিটামিন ‘এ’ মেশানো হলেও ছোট কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো এ কাজ শুরু করতে পারেনি। শিগগিরই ওইসব প্রতিষ্ঠানেও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে।
সুপার ভেজিটেবল অয়েল ইন্ড্রাস্ট্রিজের মোস্তফা হায়দার বলেন, ‘জার্মানির বিএএসএফ উৎপাদিত প্রিমিক্স আমদানি করে তা মিশ্রন করে আমরা বাজারজাত করছি। তবে অনেকে এখনো অনেকে এ কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এটা কার্যকর হতে সময় লাগবে।’
সিটি অয়েল মিলস এর এ কেএম কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা নিজেরা জার্মানির বিএএসএফ থেকে ভিটামিন ‘এ’ মেশানোর প্রিমিক্স আনছি। আমাদের সবগুলো রিফাইনারিতে ভিটামিন এ মেশানোর কার্যক্রম চলছে।’
বাজারে ভোজ্য তেলে সব বোতলের গায়ে আপনাদের ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত স্টিকার নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেগুলো অনেক আগে বাজারজাত করা হয়েছে সেগুলোতে নেই। তবে নতুন বাজারজাত করা বোতলে ভিটামিন-এ যুক্ত স্টিকার রয়েছে বলে জানান তিনি।’
তিনি আরও বলেন, আসলে প্রথম দিকে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত করা একটু সময়ের ব্যাপার। এ ছাড়া ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ‘এ’ যুক্ত করার কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
তবে কোনাপাড়া অয়েল মিলের মালিক ফরহাদ উদ্দিন ভিটামিন ‘এ’ মেশানোর বিষয়টি জানেন না বলে জানান তিনি।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম প্রধান মো. লুৎফর রহমান তরফদার বলেন, ‘এ পর্যন্ত পাম্প ও রাইস ব্যান্ড ওয়েলসহ ৩৩টি প্রতিষ্ঠান ভোজ্য তেলে ভিটামিন-এ মেশানোর জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই করেছে।’
এখনো যারা ভিটামিন-এ মেশানোর কাজ শুরু করেনি তাদের বিরুদ্ধে বিএসটিআই শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করবে বলে জানান তিনি।

