নিজস্ব প্রতিবেদক : সূবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নতুন পুরাতন শিক্ষার্থীদের মিলন মেলা বসে। সকাল থেকেই একে একে কেউ বা দল বেঁধে ছুটে এসেছেন প্রাণের স্কুলে। স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যাপীঠে। সবার আগমেন মুখরিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা। উৎসবে পরিণত হয় গোটা স্কুল প্রাঙ্গণ।
পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতেই বুকে জড়িয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলছেন- কেমন আছিস? কতোদিন পরে দেখা। ক্ষণেই মেতে উঠলো খুনসুটিতে কেউবা রসিকতায়। স্বুলের প্রাঙ্গণ সাজানো হয়েছিল বর্ণিল সাজে। তৈরি করা হয় বিশাল মঞ্চ। ছিল আবৃত্তি, নাচ, গান, অভিনয়, স্মৃতিচারণ পর্বসহ নানান রকম আয়োজন।
পুরানো দিনের স্মৃতিতে অতীত খোঁজার পাশাপাশি সবাই জানতে জানাতে ব্যস্ত বর্তমান হালহাকিতও। ক্ষণেই ছুটাছুটি প্রিয় আঙ্গিনায়, সবাই ব্যস্ত হয়ে ছবি তুলছে। ছবি তোলা-তুলিতে কেটে যায় বেলা। ক্যামেরার ফ্রেমে আটকে থাকে স্মৃতি। চলে স্মৃতির রোমন্থনও।
প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় ছাত্র, প্রাণের বন্ধু, আদরের ছোট ভাইবোন। কতো কতো সম্পর্ক। সেই কবে দখো হয়ছিল। মনেই পড়ছে না। আজ ফের দেখা। দেখা হতেই যেন খুশিতে অশ্রুসজল চোখ চিকচিক করে। যেন কতোদিনের অপেক্ষার পালা আজ ফুরালো। এ ভাষাহীন অনুভূতি। এ সম্পর্কহীন আত্মার বন্ধন।
নিজের স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সকাল ৮টায় হাজির সাইফুল ইমাম। বললেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে অনকদিন পর দেখা হবে। আর বাসায় থাকতে পারলাম না। ২১ বছর পর স্কুলে এসেছি। প্রথমে এসে চিনতেই পারিনি। সবকিছু পাল্টে গেছে। আমাদের সময় এতো বড় বিল্ডিং ছিল না। এখন কতো সুন্দর বিল্ডিং। কি সুন্দর দেখাচ্ছে।’এ সুন্দর স্কুলের শিক্ষার্থী হওয়ার সাধ আবারো জাগলো সাইফুলের। স্মৃতির ঝাপি খুলে হারিয়ে গেলেন মধুময় অতীতে। ফিরে বললেন, ‘এ এক অন্যরকম অনুভূতি। ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। আমি অনুভব করতে পারছি। আসলেই ভালোবাসা ভাষাহীন।’
অভিন্ন সাজে সূবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করতে আসেন ৯০ ব্যাচের শিক্ষার্থী। সে সময় যারা শিক্ষার্থী ছিল তারা আজ শিখাচ্ছেন। দায়িত্ব নিয়েছেন সমাজ পরিচালচনার, পরিবারের। অনুভূতি জানানোর ভাষা যেন শুধু আনন্দ, হাসি আর উদযাপনে। ৯০ ব্যাচের ৫ শিক্ষার্থী একইসঙ্গে ঘুরছেন, ছবি তুলছেন। আড্ডা দিচ্ছেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেই চিরচেনা মাটির গন্ধ শুকচেন। কেউ একজন গেয়ে উঠলেন, ‘কেটেছে কতো না সময় এ ভেলায়…।’
জীব বিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘এটা অনেক বড় একটা প্রাপ্তি। আমি এর অংশ। অনকেদিন পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ভাবতেই ভালো লাগছে।’ কথার ফাঁকে ফাঁকেই প্রাণের শিক্ষার্থীদেরকে জড়িয়ে ধরে হালহাকিত জিজ্ঞাস করছেন। প্রিয় শিক্ষককে কাছে পেয়ে একটা জটলা তৈরি হয়ে গেলো সেখানে। কেউ একজন বললো, ‘স্যার আমি বিয়ে করিনি।’ স্যার বললেন, ‘তোর হরমোনে সমস্য।’ এসব নিয়েও চলছে রসিকতা। কতোটা প্রাণোবন্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। নিশ্চয়ই বলা যেতে পারে এই তো সেই অতীত ধরা দিল তবে। চলে আড্ডা চলে গল্প চলে হাজারটা প্যাঁচাল।
পরক্ষণেই ওই শিক্ষক বললেন,‘ শিক্ষককের কাজ শিক্ষার্থীর জন্য একটা ভাবনার জগৎ তৈরি করে দেয়া। তাকে পথ দেখানো। সে যেন কুলষটাকে ছুড়ে ফেলে শুভটাকে বসাতে পারে সমাজের প্রতিটি স্তরে। শিক্ষার মাধ্যেমে এ ধরার সবকিছুর শুভ পরিবর্তন সম্ভব। জরাজীর্ণ এ ধরাকে আমাদের বসুন্ধরায় ফিরাতে শিক্ষাই একমাত্র অবলম্বন।’
সকাল সাড়ে ১০টায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন আহমদ, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এনএম আবুল কাশেম, সূবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম দিপালী, প্রধান অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে বেলুন উড়িয় অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় সূবর্ণ জয়ন্তীর আনুষ্ঠানিক আয়োজন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, উদার করে, কুপমুণ্ডতা দূর করে, পাপমুক্ত করে সহানুভূতিশীল এবং সহমর্মী হতে সহযোগিতা করে। একটি গাছ যেমন ছায়া দেয়, অক্সিজেন দেয়, ফল দেয়, ফুল, কাঠ দেয় ঠিক তেমনি একজন শিক্ষিত মানুষের উচিত নিজেকে সমাজের, দেশের, সমগ্র জাতির সেবায় নিয়োজিত করা। তবেই শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্য অর্জিত হবে।’
এসময় তিনি বর্তমান শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে অগ্রজের পথ অনুসরণ করতে পারেন। এই প্রতিষ্ঠান একটি রত্নাগর্ভা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেখে আজ অনেকেই রাষ্ট্রের বড় বড় দায়িত্ব পালন করছে। এটা আমাদের গর্ব আমাদের প্রতিষ্ঠানের গর্ব। এ প্রতিষ্ঠানের এক একজন শিক্ষার্থী যেন এক একটি আদর্শের স্তম্ভে পরিগণিত হতে পারে সে লক্ষ্যে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
প্রবীণদের সঙ্গে নবীনরাও ছিল সমান তালে। কখনো গল্প আড্ডা কখনো বা মঞ্চে আবৃত্তি, গানে। সবার অংশগ্রহণেই সূবর্ণ জয়ন্তী পরিপূর্ণতা পেয়েছে।

