অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমান বেড়েছে ১ হাজার ১৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এসময় খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বেসিক ব্যাংকের। সবচেয়ে বেশি কমেছে জনতা ব্যাংকের। হিসেবের মারপ্যাঁচে এ হেরফের দেখানো হলেও খেলাপি ঋণের প্রকৃত অংক কমেনি কোনো ব্যাংকেরই।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমান ২৩ হাজার ৭৪৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা; যা বিতরণ করা ঋণের ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপির পরিমান ছিল ২২ হাজার ৭২৭ কোটি ২১ লাখ টাকা। অর্থাৎ নতুন করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমান বেড়েছে ১ হাজার কোটি টাকার উপরে।
ব্যাংকগুলোর পৃথক হিসেব থেকে দেখা যায় বেসিক, সোনালী ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমান বেড়েছে। কমেছে অগ্রণী, জনতা ও রূপালি ব্যাংকের। বেসিক, সোনালী ও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের নতুন খেলাপি ঋণের পরিমান যথাক্রমে ২ হাজার ২৪৬ কোটি, ১৮২ কোটি ১৯ লাখ ও ৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী, জনতা ও রূপালি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে যথাক্রমে ৪৯৬ কোটি ৪৬ লাখ, ৯৩২ কোটি ৮৯ লাখ ও ৩৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। তবে ঋণ পুনর্গঠন, পুণ:তফসিল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নির্দেশের কারণেই এত বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ করে গেছে বলে জানা যায়। ২০১৫ সালে বিশেষ সুবিধায় জনতা ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে, অগ্রণী ব্যাংক করেছে ২ হাজার কোটি টাকার ওপরে।
ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা যারা নিয়েছে তাদের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমেছে। এটা প্রকৃত চিত্র নয়। অনেকটা কম দেখাতে বলা হয়েছে, তাই ব্যাংকগুলো সুযোগ নিয়েছে। এরই ধারায় সামনে খেলাপির পরিমান আরও কমবে দেখানো হবে বলেও জানান তিনি।’ তিনি আরও বলেন, নতুন করে যারা ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ নিয়েছে তারাই তো আবার খেলাপি হতে শুরু করেছে। কিন্তু সেসব চিত্র এখানে দেখানো হয়নি।
জানতে চাইলে রূপালি ব্যাংকের এমডি ফরিদ উদ্দিন বলেন, ঋণ নিয়মিত করার কিছুটা প্রভাব রয়েছে এটা স্বীকার করতেই হবে। তবে আমাদের আদায়ও বেড়েছে। আমারা ঋণ বিতরণের আগে এখন অনেক বেশি দেখেশুনে দিচ্ছি। তাই ওভারঅল খেলাপি কমছে।
বিশেষ বিবেচনায় ঋণ নিয়মিত করতে দেয়ার সুযোগের কারণেই আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত, বেসরকারী ও বিদেশী ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমান কমে গেছে। ১ দশমিক ১০ শতাংশ কমে মোট খেলাপি ঋণের পরিমান হয়েছে মোট বিতরণ করা ঋনের ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। টাকার অংকে যা ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি ২২ লাখ। যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৫৪ হাজার ৭০৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এই পরিমান ছিল বিতরণকরা ঋণের ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
এর মধ্যে বেসরকারী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমান ২৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা থেকে কমে দাড়িয়েছে ২০ হাজার ৭৬০ কোটি ৫৫ লাখে। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। যেটি আগের প্রান্তিকে ছিল ৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসেই ব্যাংকগুলো প্রায় ২ শতাংশ খেলাপি ঋণ কমিয়ে নিয়ে এসেছে। ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমান দাড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা; যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
কমেছে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও। বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার কমে দাড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকায়। যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৫ হাজার কোটি টাকার উপরে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে খেলাপির পরিমান না কমলেও তা যদি হিসেবে দেখানো হয় সেটা একটা বিপত্তি। এ সুযোগ পেতে থাকলে ব্যাংকগুলো থেকে টাকা চুরি বেড়ে যাবে। যে যার মত টাকা নিয়ে মেরে দেবে। কারণ যেখানে টাকা ফেরত না দিলেও চলে, সেখানে দেয়ার দরকার কি। এতে ব্যাংকগুলো আরও বেশি শৃঙ্খলা হারাবে।’

