রাবি (রাজশাহী) প্রতিনিধি : ফুল। শব্দটি যেন পবিত্রতার প্রতীক। ভালোবাসার মানুষটিকে ফুল উপহার দিতে কে না পছন্দ করে। রাজ্যের যতো গ্লানি-অভিমান নিমেষেই পানি করে দেয়া বস্তুটির নাম ফুল। তাইতো ফুল নিয়ে লেখক, শিল্পী, কবি ও গায়কের রূপক-উপমার শেষ নেই।
শীতের শুরুতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে ক্যাম্পাসের বাগানগুলোতে ফুটে থাকা নানা রঙের ফুল। এ সময় ফুটন্ত ফুলের সুরভীতে ছন্দময় হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস। সবুজ তারুণ্যে ভরপুর মতিহার চত্বর পায় নতুন রূপ। ছোট বড় অসংখ্য বাগানে নতুন রঙে সাজে উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত উপভোগ করেন এ সৌন্দর্য। প্রশাসন ভবন, বিভিন্ন বিভাগের সামনে, শহীদ মিনারের পাশে, বিভিন্ন হলের ভেতর, সবখানে যেন একই চিত্র। নানা রঙের ফুলে পসরা সাজিয়ে বসেছে যেন প্রিয় ক্যাম্পাস।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অতিক্রম করে সামনে পড়বে প্রশাসন ভবন। ভবনের সামনে রঙ বেরঙের ফুলের বাহার দেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায় ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের। আবার সুযোগ পেয়ে অনেকে সেলফি তুলতে ভুল করেন না ফুলের সঙ্গে। এখানে এক নজরে চোখে পড়বে প্রায় ৩৬ রঙের ফুল। ২০০৩ সাল থেকে দীর্ঘ ১৩ বছর এ বাগান পরিচর্যার কাজ করছেন লালু মিয়া। ৫০ বছর বয়সী লালু মিয়ার হাতের স্পর্শে যেন জাদু আছে।
এ বাগানে বিভিন্ন রঙের চন্দ্র মল্লিকা, লাল রঙের সেলভিয়া, ১৫ রঙের ডালিয়া, ৪ রঙের সাপারি গাদা, ৬ রঙের ক্যারেনডেলা, ৪ রঙের স্টার, শ্যালোশিয়া (মোরগ ফুল), ৩ রঙের গাধা ফুল ৭ রঙের স্নো বল ও ৩ রঙের প্রিটনিসহ প্রায় ৪০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফুল স্থান পেয়েছে।
এত ফুলের গাছ কীভাবে সংগ্রহ করলেন জানতে চাইলে লালু মিয়া বলেন, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। এর আগে যিনি এ বাগান পরিচর্যার দায়িত্বে ছিলেন তিনিই আমাকে সব ফুল গাছের বীজ দিয়েছিলেন। তখন থেকে সংরক্ষণ করে রেখেছি। এখন আর নতুন করে ফুলের বীজ খুঁজতে হয় না। আমি আবার দায়িত্ব ছাড়ার সময় সব বীজ পরবর্তী কাউকে দিয়ে যাবো।’
ফুলহীন স্থানগুলো একদম পছন্দ নয় রহমতুন্নেসা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শোভা পারভীনের। তাই হলের ফুলের বাগানগুলো অনেক পছন্দ তার। গাছে থাকা ফুলই নাকি বেশি পছন্দ তার। তবে মাঝে মধ্যে ছিঁড়তেও ইচ্ছে করে। আর হ্যাঁ, ফুল দেখলেই ফুলের সঙ্গে ছবি তুলতে ভোলেন না। তিনি বলেন, ‘ফুল দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। ইচ্ছে করে ফুলের সঙ্গে গল্প করি।’ ফুল এত প্রিয় কেন? হাসি মাখা মুখে বললেন, ‘ভালোবাসার চাওয়া পাওয়াগুলো যে ফুলের মাঝেই লুকিয়ে থাকে।’
ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা আড্ডায় মাতেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশের ফুলের বাগানে। আড্ডার খোরাক যোগাতে বাগানে ফোটা নানা রঙের ডালিয়া, কাঠালচাঁপা আর গাদা ফুলের জুড়ি মেলা ভার। এখানকার রক্ত রাঙা ডালিয়া ফুলগুলো যে কারো নজর কাড়বে সন্দেহ নেই। বন্ধুরা মিলে ফুলকে সঙ্গি করে গ্রুপ ছবিও তুলতে দেখা যায়।
বিকেলের অবসর সময়টুকু কাটাতে রুয়েট থেকে একদল বন্ধু এসেছেন রাবি ক্যাম্পাসে। সঙ্গে আছে একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা। আর কী কিছু লাগে! ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দের সঙ্গে আড্ডাবাজি নব তারুণ্যে যুক্ত করেছে আলাদা মাত্রা। রাবি ক্যাম্পাসে অন্য সময় কি আসা হয়? নাকি এ মৌসুমে আসা? এমন প্রশ্নে রুয়েটের সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হানুল ইসলাম হাসি মাখা মুখে বললেন, ‘অন্য সময়ও আসা হয়। তবে ফুলে ভরা রাবি ক্যাম্পাসটা আসলে অন্য সময়ের থেকে অনেকটায় ভিন্ন। এ সময় ক্যাম্পাসে কেউ না বেড়াতে আসলে তাকে বোঝানো যাবে না যে, রাবি ক্যাম্পাস কত সুন্দর! বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সময় তো ভালোই কাটছে। তারপর অসাধারণ সব ফুলের ফটোশ্যুট নিতে পারছি।’
ফুল কেমন পছন্দ করেন? প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই রায়হানের মুখ থেকে উত্তর কেড়ে নিয়ে উত্তর দিলেন একই বিভাগে পড়ুয়া তার বন্ধু সজিব। বললেন, ‘ফুল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, ফুল সৌহার্দ্য, ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের প্রতীক। প্রেমিক তার প্রেমিকাকে ভালোবেসে ফুল দেয়। আবার মন্ত্রী-মিনিস্টারকেও সম্মান জানিয়ে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। সুতরাং ফুলকে ভালোবাসে না এমন মানুষ বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ ফুল নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন যেন থামতেই চায় না ওর মুখে। আরো যুক্ত করলেন, ‘ফুল যে কত মূল্যবান সম্পদ তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এটা উপলব্ধির বিষয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলের ভেতরেই আছে ছোট বড় ফুলের বাগান। মাদার বখ্শ হলে আবাসিক শিক্ষার্থীদের ঘুম ভাঙে গোলাপের রঙের ঝলকানিতে। হলের বারান্দায় দাঁড়ালে চোখ ধাঁধিয়ে আসবে সারি দিয়ে থাকা গোলাপ আর গাদা ফুলের সৌন্দর্যে। বাতাস থেকে হালকা সুবাসও নিতে পারেন মন চাইলে। হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাদের অনুভূতি। বললেন, ‘কোনো কারণে মন খারাপ হলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালে নিমিষেই মন ভালো হয়ে যায়। এছাড়া সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশ পুরোদিনটাই ভালো করে দেয়। আমাদের হলটা এমনিতে অনেক সুন্দর। বাগানে ফোটা ফুলগুলো যেন সে সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।’
সবে তো পৌষ, তাতেই ফুলের এতো বাহার। শীতের শেষে আসছে বসন্ত। ফুলে ভর ক্যাম্পাসটা আরো রঙিন হবে। রাঙিয়ে দেবে সবার মন। ফুলে ফুলে ভরে যাক সবার জীবন। এটাই কামনা।

