নিজস্ব প্রতিবেদক : দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি কামনা করে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হল মুসলমান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ তীরে। এ আখেরি মোনাজাতে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করেছে তাবলীগ জামায়েত। ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি ফের ৫০তম এই বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব চলবে।
বেলা ১১টা ৮ মিনিটে শুরু করে ১১টা ৩২ মিনিট পর্যন্ত ২৪ মিনিট স্থায়ী আখেরি মোনাজাতের সময় ইজতেমাস্থল ও আশপাশের এলাকা জুড়ে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। খানিক পর পর শুধু ভেসে আসে আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন। তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বি ও ভারতের মাওলানা সাদ তার কণ্ঠে উর্দুতে ছোট ছোট বাক্যে মোনাজাত করেন। মাওলানা সাদের সঙ্গে লাখ লাখ মুসল্লি দুহাত তুলে দোয়ায় অংশ নেয়।
মোনাজতকালে মাওলানা সা’দ বলেন, ‘হে আল্লাহ হামারা ঈমানকো হেফাজত ফরমাদে, হামারা নসিবকো ফরমাদে, সারা জাহানকো হেফাজত ফরমাদে। হে আল্লাহ ইজতেমাকো কবুল ফরমাদে। হামারা গুনাহকো মাফ ফরমাদে। তামাম দুনিয়াকো হেফাজত ফরমা দে। সারা মুসলিম জাহাকো হেফাজত ফরমা দে।’
মোনাজাত চলাকালে ইজতেমা মাঠ ও আশপাশ এলাকায় অশ্রুসিক্ত নয়নে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট নিজেকে শপে দিয়ে পানা চান মুসল্লীরা। খানিক পরপর শুধু ভেসে আসে আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন। অনুতপ্ত মানুষের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে অনুনয়-বিনয় করে পানাহ ভিক্ষা করছিলেন তারা। ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন তারা ভোর থেকেই।
মোনাজাত শেষে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। যে যার মতো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকে। এ যেন কোন ঘুমন্তনগরীর জেগে ওঠা। কেউ পিক-আপ, প্রাইভেট কার, ট্রাক, বাস ও পায়ে হেটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকেন। ইজতেমা মুসল্লির পাশাপাশি আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে রোববার ভোর থেকে ঢাকার রেডিসন হোটেল থেকে গাজীপুরের জয়দেপপুর ভোগড়া বাইপাস সড়ক, টঙ্গী স্টেশন রোড থেকে মীরের বাজার পর্যন্তসহ ইজতেমা সংগগ্ন এলাকার নানা বয়সী ও পেশার মানুষ পায়ে হেঁটেই ইজতেমাস্থলের দিকে পৌঁছান। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ইজতেমা মাঠ পূর্ণ হয়ে গেলে মুসল্লিরা মাঠের আশে-পাশের রাস্তা, অলি-গলিতে অবস্থান নেন।
ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ এয়ারপোর্ট, আজমপুর, কামাড়পাড়া সড়ক, ঢাকা-কালীগঞ্জ সড়ক, আশুলিয়া, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোনাজাতের জন্য পুরনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন। নেন। মোনাজাতে অংশ নিতে শনিবার রাতে অনেকে ইজতেমা মাঠে আসেন। এমনকি অনেকে টঙ্গী এলাকায় বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাসা বাড়িতে ওঠেন। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে রোববার ভোর রাত থেকেই টঙ্গীর ইজতেমা অভিমুখে শুরু হয় মানুষের ঢল। টঙ্গীর পথে শনিবার মধ্যরাত থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোটর গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মোনাজাতে অংশ নিতে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি পায়ে হেঁটেই ইজতেমাস্থলে পৌঁছেন।
সকাল ৮টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হলে মুসুল্লীরা মাঠের আশে-পাশের রাস্তা, অলি-গলিতে অবস্থান নেন।
রাজধানীর শনির আখড়া এলাকার বাসিন্ধা কাচামালের ব্যবসায়ী মোবারক আলী মন্ডল ইজতেমায় আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে সকাল পৌনে ৬টায় রওয়ানা দেন। কিন্তু খিলক্ষেত আসার আর গাড়ী না পেয়ে পায়ে হেটে ইজতেমা ময়দানে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘রাস্তা বন্ধ থাকায় পায়ে হেটে এসেছি। এতে মনে কোনো কষ্ট নেই।’
মোবারক আলীর সঙ্গে ইজতেমায় মঞ্জুর আলম তিনিও বললেন একই কথা, ‘গত তিন বছর এখানে আখেরি মোনাজাত অংশ নিতে আসি। পায়ে হেটেই এসেছি।’
মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকা থেকে এসেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘ইজতেমায় যাওয়ার জন্য গাড়ীতে উঠেছিলাম। কিন্তু রেডিসন হোটেল পর্যন্ত আসার পরই আর গাড়ী সামনে না যাওয়ায় পায়ে হেটেই ইজতেমায় এসেছি। আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়ার জন্য।’
এদিকে মূল প্যান্ডেলে স্থান না পেয়ে মুসল্লিরা পুরানো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে সড়ক মহাসড়কে বসে পড়েন। পাশ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস-দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসুল্লীরা অবস্থান নেন। যে দিকেই চোখ যায় সেদিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পড়া মানুষ আর মানুষ। সবাই অপেক্ষায় আছেন কখন শুরু হবে সেই কাঙ্খিত আখেরি মোনাজাত। ইজতেমাস্থলের চারপাশের ৫-৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মোনাজাতে অংশ নিতে সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছেন।
এর আগে বাদ ফজর থেকে বায়নের করেন বাংলাদেশের মাওলানা ওয়াশিকুল ইলামের। এরপর শুরু হয় হেদায়াতি বয়ান। হেদায়তি বয়ান ও আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি ভারতের মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ। আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের তিনদিনব্যাপি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ধাপ।
বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের শেষ দিন রোববার বাদ ফজর থেকে হেদায়েতীর বয়ান করেন তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি ভারতের হজরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ। বয়ানের বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলাম।
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ সাদ হেদায়েতি বয়ানে বলেন, ‘দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতের প্রতি আমাদের বেশি করে খেয়াল রাখতে হবে। দুনিয়ার জিন্দিগীর চেয়ে আখেরাতের জিন্দিগী হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী। আমাদের ওপর বৃষ্টির ফোটার মত পেরেশানি ধেয়ে আসছে। এ পেরেশানি থেকে রক্ষার জন্য আমাদের ঈমানি শক্তিকে আরো মজবুত করতে হবে। ধাবিত হতে হবে আখেরাতের দীর্ঘ জিন্দিগীর দিকে। যিনি এখলাছের সাথে দ্বীনের কাজ করবেন তিনিই কামিয়াব হবেন। আল্লাহর কাছে কান্না-কাটি করে নিজের কৃতকর্মের অনুসূচনার মাধ্যমে তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। চোখের পানি ফেলে মোনাজাত করতে হবে। মোনাজাত কবুল হলেই আমরা পাপমুক্ত হব। দুনিয়া ও আখেরাতে ফিরে আসবে শান্তি। দ্বীনের ঘরে বসে ইবাদতের চেয়ে বাইরে মেহনত করে ইবাদত বন্দিগী করা অনেক ফজিলত। আল্লাহ তার বান্দাদের দ্বীনের কাজে রাস্তায় বের হতে হুকুম দিয়েছেন। সকলকে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার কথা বলেছেন। আর এ দাওয়াতের জন্য তালিম নিতে হবে। মহল্লায় মহল্লায় মসজিদে বসে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে পরামর্শ করতে হবে। এতে শত্রুও বন্ধু হয়ে যেতে পারে।’
টেলিভিশন- মোবাইল ও ওয়্যারলেস সেটে মোনাজাত
ইজতেমা মাঠে না এসেও মোনাজাতের সময় হাত তুলেছেন অসংখ্য মানুষ। গাজীপুরের চন্দনা চৌরাস্তা মসজিদ মাঠসহ বিভিন্ন এলাকায় ওয়্যালেস সেটে, মুঠোফোনের ও মাধ্যমে মোনাজাত প্রচার করা হয়। এসব স্থানে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। আবার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করার কারনে অনেকে বাসায় বসে মোনাজাতে অংশ নিয়েছে।
মুসল্লিদের দুর্ভোগ : এ বছর ইজতেমা মাঠের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক সংযোগের অভাবে বহু ধর্মপ্রাণ মানুষ বয়ান শুনতে এবং মোনাজাতে শামিল হতে দারুণ অসুবিধা ও ভোগান্তিতে পড়েন। ইজতেমা ময়দানের প্যান্ডেলের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক সংযোজন ব্যবস্থা না নেয়ায় অনেক মুসল্লি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিশ্ব ইজতেমা মাঠে নারীদের কোন প্রকার সুযোগ সুবিধা না থাকলেও মোনাজাতে শরিক হতে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মহিলা টঙ্গীর আশপাশে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে মোনাজাতে অংশ নেয়। আবার অনেকে নদীর পাড়ে বা আশপাশে খোলা আকাশের নীচে অবস্থান নেন তারা। অজু, গোসল, খাওয়া-দাওয়াসহ ভোগান্তির শেষ ছিল না তাদের।
ভিআইপিদের মোনাজাতে অংশগ্রহণ : বিশ্ব ইজতেমায় আগত লাখ লাখ মুসল্লির সঙ্গে ইজতেমা ময়দানের পূর্ব পাশে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুমে বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আকম মোজাম্মেল হক এমপি, স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, যুগ্ম সচিব মো. আব্দুল খালেক, যুগ্ম সচিব সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসক মো. নূরুল ইসলাম, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ হারুন অর রশীদ পিপিএম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ মহসিন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট এসএম মোস্তফা কামাল, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান। তবে এবারই প্রথম কোন ভিভিআইপি ইজতেমা ময়দানে এসে মোনাজাতে অংশ গ্রহন করেননি।
ইতিহাসে ইজতেমা : ১৯৪৬ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শুরুতে ইজতেমা হতো ঢাকার কাকরাইল মসজিদে। এরপর ’৪৮-এ চট্টগ্রামের হাজি ক্যাম্পে এবং ’৫৮- তে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ইজতেমায় লোক সমাগম বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে শুরু হয় বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন। এরপর থেকে এখানেই ইজতেমা হচ্ছে।

