নিজস্ব প্রতিবেদক : আর কিছুদিন পরই বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যিক উৎসব অমর একুশে বইমেলা। এদেশের সব শ্রেণির পাঠক সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে কখন বসবে মাসব্যাপী এই প্রাণের মেলা। বইমেলার নিরাপত্তায় গতবছর সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে যায় অভিজিৎ হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা। এবারও নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজন সংশ্লিষ্টরা নানা পরিকল্পনা করেছেন। কিন্তু শুধু পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না প্রকাশকেরা। তারা বলছেন, পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে চান তারা।
গতবছর বইমেলাকে কলঙ্কিত করেছিল ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যার ঘটনা। এর পরই একে একে হত্যা করা হয় ব্লগার ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নিলয় নীলকে। কিছুদিন আগে জাগৃতির প্রকাশক দীপনকে হত্যা, শুদ্ধস্বর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ লেখক রণদীপম বসু, কবি তারেক রহিমের ওপর হামলায় জনমনে ভীতি ছড়িয়েছে- এবারের বইমেলায় নিরাপত্তা ঠিকঠাক থাকবে তো?
বইমেলার নিরাপত্তা নিয়ে অনন্যা প্রকাশনীর মনিরুল হক বলেন, ‘গতবার অভিজিৎ হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম ব্যর্থতা। এবারও আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে এবার প্রস্তুতি ভালো। আয়োজন সংশ্লিষ্টরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছেন।’
অনুপম প্রকাশনীর মিলন কান্তি নাথ বলেন, ‘এবার কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক। প্রকাশকদের সাথে তাদের কথা হয়েছে। তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে। আধুনিক প্রযুক্তিতে সাজবে মেলাপ্রাঙ্গণ। এবার সিসি ক্যামেরা স্থাপনও কয়েক গুণ বাড়ছে। আশা করছি, অঘটন ঘটবে না।’
বাংলাপ্রকাশের হুমায়ন কবীর ঢালী বলেন, ‘সরকার আমাদের আশা দিচ্ছে। আশঙ্কা তো আছেই। আশঙ্কা করে চুপচাপ বসে থাকলে চলবে না। গতবারও আয়োজকদের নানা পরিকল্পনা ছিল, এবারও আছে। তবে পরিকল্পনা থাকলে তো হবে না, এর বাস্তবায়ন দরকার।’
শব্দশৈলীর ইফতেখার আমিন বলেন, ‘মেলার আয়োজকেরা এবার যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, তা যদি কার্যকর হয় তাহলে নিরাপত্তা-সমস্যা হবে না। গতবার নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল। মেলা শেষে যে গ্যাদারিং হয় তাতে প্রবলেম হয়। দেখা যাক, পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয় কি না।’
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে সরকার, এমনটাই মনে করছেন সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘গতবার দেশবাসী দেখেছে নিরাপত্তায় কী ধরনের ঘাটতি ছিল।’
ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশের আদিত্য অন্তর বলেন, ‘অনেক প্রকাশককে হুমকি দেয়া হয়েছে। ভয় তো আছেই। শুধু পরিকল্পনা নয়, আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’
তবে সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন আদর্শ প্রকাশনীর মামুন আর রশিদ। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরই কিছু না কিছু ঘটছে। সরকার নিরাপত্তা দিতে পারছে না। প্রকাশকদের নিরাপত্তা নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি আছে। না হলে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হয় কী করে। সরকারের কাছে দাবি, আমরা যেন সৃজনশীল পেশা চালিয়ে যেতে পারি।’
আর যেন কোনো অভিজিৎকাণ্ড না ঘটে তার দাবি জানান চর্চাগ্রন্থ প্রকাশের অমর্ত্য আতিক। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে দাবি, প্রকাশক-লেখকদের যেন পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হয়।’
গত ২১ ডিসেম্বর সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সাংবাদিকদের জানান, এবারের বইমেলায় কোনো ফাঁকিঝুঁকি হবে না, বইমেলায় থাকবে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। গতবছরের মতো যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে প্রশাসন। এ জন্য র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে প্রতিটি মুহূর্তে তৎপর।
মন্ত্রী বলেন, ‘শুধু বইমেলা প্রাঙ্গণই নয়, এর আশপাশের এলাকাও থাকবে সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে। মেলাকে ঘিরে দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি পর্যন্ত মেলা চলাকালে সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ রাখার পাশাপাশি আর্চওয়ে থাকবে মেলার প্রতিটি প্রবেশমুখে। দর্শনার্থীদের অবাধে প্রবেশের জন্য থাকবে বাড়তি প্রবেশপথ ও বাড়তি নির্গমনপথ। মেলার ভেতর-বাইরে আরো বেশি আলোর ব্যবস্থা করা হবে।’
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, ‘বইমেলা প্রাঙ্গণের বাইরেও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নেয়া দরকার। সরকার নিরাপত্তার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। আশা করি, দুর্বৃত্তরা কিছুই করতে পারবে না।’
বইমেলাকে বাঙালির প্রাণের উৎসব ও ঐতিহ্যের সাথে জড়িত মন্তব্য করে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির সভাপতি ও আগামীর কর্ণধার ওসমান গণি বলেন, ‘এবার নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও স্ট্রং করবে সরকার। আশা করি, খারাপ কিছু ঘটবে না। গতবার অবরোধ-হরতালের মধ্যেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থামানো যায়নি। এবারও থামানো যাবে না। কারণ, বইমেলা সবার প্রাণের মেলা।’

