চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি খুবই প্রাণোদীপ্ত ও স্থিতিশীল। দশকে দশকে এ দেশের অর্থনীতি জাম্প করছে, কিন্তু কোন অস্থিতিশীলতা নেই। যে কোনো ধরনের চাপ নিতে উপযুক্ত। আর আজকের বাংলাদেশের যে সাফল্যর গল্প, তা উদ্যোক্তাদের সাফল্যের গল্প। তাদের গড়ে দেয়া ভিতের উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে সব চেষ্টাই করে যাচ্ছি।’
বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামে হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যাংকিং খাতকে জনবান্ধব করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘ব্যাংকগুলো এখন গ্রাহক কল্যাণে কাজ করছে। ২০১৬ সালের মধ্যে সব পাবলিক ব্যাংকের শাখা ডিজিটালাইজড করতে হবে। নয়তো তারাই পিছিয়ে যাবে। কিছুদিন আগে বাংলা একাডেমিতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা উদ্যোক্তা মেলা করেছি। যেখানে নবীনরা নিজেরা এসে জেনেছেন, তাদের জন্য আমরা কী কী ব্যবস্থা রেখেছি। ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে সেরা সেবা খাতে পরিণত করতে কাজ চলছে।’
অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল জানিয়ে তিনি বলেন,‘এখন ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট নেই। সুদের হার কমেছে। কলমানির রেট ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। আমাদের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। পুঁজি পর্যাপ্ততার হার প্রায় ১১ শতাংশ। ইউরোপের অনেক দেশ যখন নেগেটিভ প্রবৃদ্ধিতে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।’
কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে বিশ্বব্যাংক থেকে অর্থপ্রাপ্তির বিষয়ে জানাতে গিয়ে বলেন,‘র্শটটার্ম ক্রেডিটে ঋণ নিলে তাতে সুদ যেমন বেশি দিতে হয়, তেমনি বড় কাজে লাগানো যায়না। তাই লংটার্ম ক্রেডিটে ঋণ দিতে বিশ্বব্যাংকের সাথে কথা বলে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল পাওয়া গেছে। তা থেকে ম্যানুফেকচারিং খাতে ৩-৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে। সবুজ বিনিয়োগের জন্য আরও ২০০ মিলিয়ন ডলারের পাইপলাইনে আছে। যারা সবুজ ও পরিবেশবান্ধবখাতে বিনিয়োগ করতে চান তারা তা পাবেন।’
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেকে বলছেন দেশে বিনিয়োগ কমেছে। বিনিয়োগ যথেষ্ট না হলে ছয় বছর ধরে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কেমন করে হলো। আসলে সব জায়গায় বিনিয়োগ হওয়ায় চোখে পড়ছে না। আমাদের কৃষি, শিল্প, ই-কমার্স, এসএমই প্রতিটি খাতেই বিনিয়োগ হচ্ছে। এসএমই, কৃষি, শিল্পখাতে বিনিয়োগ কিভাবে আরো বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা আমরা করছি।’
হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে গর্ভনর বলেন,‘এ ইনস্টিটিউট হবে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে দেশের ভেতরের আর্থিক ও মূলধন বাজার খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান, পরিচালক, শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহী, বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকেরা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ পাবেন। সরকারি-বেসরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠান এখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করতে পারবে । এটি হবে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান।
তিনি আরো বলেন, ‘এ ইনস্টিটিউটে বিশাল আকারের একটি মাল্টিপারপাস হল, একটি থিয়েটার টাইপ কনফারেন্স হল, দুটি বড় ও ছয়টি ছোট কনফারেন্স রুম থাকবে। এ ছাড়া ২০টি শ্রেণিকক্ষ, দুটি লেকচার থিয়েটার, কর্মীদের জন্য কিউবিক্যাল ওয়ার্ক স্টেশন, ৬৭টি ডাবল বেড ও ৩২টি সিঙ্গেল বেডের হোস্টেল রুম, ২৬টি স্যুট, ৮টি ফ্যামিলি কটেজ, ২টি এক্সিকিউটিভ অ্যাপার্টমেন্ট ও স্টাফদের জন্য একটি ডরমিটরি থাকবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবদান অনেক। আর এই ইনস্টিটিউটটি হয়ে গেলে অর্থনীতিতে তা উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখবে। ইনস্টিটিউটে একাডেমিক ও প্রতিষ্ঠানিক কাজের পাশাপাশি ব্যাংকারদের রিক্রিয়েশনাল প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কাজ করবে।’
নগর পুলিশ কমিশনার আব্দুল জলিল মন্ডল বলেন, ‘প্রকৃতির এই মনোরম পরিবেশে হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট পাঠদান ও অধ্যায়নের জন্য খুবই উপযুক্ত স্থান বলে বিবেচিত হবে। সঠিক জায়গায় সঠিক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। অনেক সময় সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সঠিক কাজটি করা যায়না। শেয়ার বাজারসহ নানা বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক ভাবে কঠিন সময় পার করছিলো, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকে আতিউর রহমানের মত যোগ্য মানুষকে নিয়োগ দিয়েছেন। যিনি সফলতার সাথে সেই সমস্যা মোকাবেলা করে অর্থনীতিকে একটি পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন।’
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের নকশার অনুমোদন আমি নিজ ক্ষমতা বলে দিয়েছি। স্থানটা পাহাড়ী এলাকা হওয়ায় আমাদের কিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন অযুহাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মর্কতাদের কষ্ট দিয়েছে। পরে আমি জানতে পেরে বিধি শিথিল করে নকশার অনুমোদন করা হয়। যদিও নকশা অনুমোদনের বিষয়টি সিডিএ চেয়ারম্যানের হাতে থাকে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান জোদ্দারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি আরো বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক নির্মল চন্দ্র ভক্ত, জনতা ব্যাংকের জেনেরাল ম্যানেজার আবু নাছের চৌধুরী, প্রকল্প পরামর্শক ইকরামুল হক প্রমুখ।


