ঢাকাWednesday , 4 November 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

খুনে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ধর্মান্ধ’ তরুণদের

Link Copied!

marderনিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা এবং লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে মালিক আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ‘উগ্রপন্থি শক্তিশালী’ সংগঠন জড়িত বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা।
একের পর এক ব্লগার হত্যাসহ মুক্তমনাদের ওপর হামলায় এই গোষ্ঠী পেছনে থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এতে ব্যবহার করা হচ্ছে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের (এবিটি) মতাদর্শে বিশ্বাসী ‘ধর্মান্ধ’ তরুণদের। গোপনে তৈরি হচ্ছে একেকটি ‘স্লিপার সেল’। ‘কাট-আউট’ পদ্ধতিতে ঘটনাগুলো ঘটানোর কারণে এর নেপথ্যে কারা আছে, তা বের করতে পারছে না গোয়েন্দারা। এবার ‘বড় ঘটনা’ ঘটায় নেপথ্যের কুশীলবদের খোঁজেই মনোনিবেশ করেছেন তারা।
তদন্ত ও ছায়াতদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, ব্লগার হত্যায় তিন-চারটি দলকে শনাক্ত করার পরে তারা সবাই এবিটি মতাদর্শের বরে জানা যায়। তবে পরিকল্পনাকারীদের ব্যাপারে জানা যায়নি। এবিটির এমন সাংগঠনিক ভিত্তি নেই, যে তারা একযোগে ‘বড় হামলা’ চালাতে পারে। ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দায় হত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী রেদোয়ানুল আজাদ রানা আগে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এ ছাড়া ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যার পরিকল্পনাকারী হাসিব ওরফে আবদুল্লাহ ও জুনায়েদের ব্যাপারেও কিছু জানা যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি সংগঠনের ‘কায়দায়’ জামায়াত-শিবির নাশকতার নেমেছে বলে তথ্য মিলেছে। এতে জামায়াত-শিবির বা অন্য কোনো বড় সংগঠন আনসারুল্লাহর নামে মাঠে নেমেছে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। গত শনিবারের ঘটনার পরদিনই আনসারুল্লাহকে সন্দেহ বলে জানালেও মঙ্গলবার সেই বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন গোয়েন্দারা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র ও ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘এই ঘটনায় উগ্রপন্থি গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে বলে আমরা সন্দেহ করছি। তবে সব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি আমরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খুনিদের কোনো ছবি পাওয়া যায়নি।’ তবে শনিবারের ঘটনার পরদিনই তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সন্দেহের তীর আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের দিকে।’
গতকাল ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলামও একইভাবে বলেছেন, ‘আমরা কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে বলছি না- এটি আনসারুল্লাহরই কাজ। তদন্ত এখন প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দু’টি ঘটনায় যে অপরাধের ধরন-কৌশল এবং অতীতে যে ব্লগারদের হত্যা করা হয়েছে অনেকক্ষেত্রে আমরা চার্জশিট দিতে সক্ষম হয়েছি। অনেককে গ্রেপ্তার করেছি। সেগুলোর তদন্তের যে অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের কেউ হয়তো এই ঘটনা ঘটনাতে পারে। সেটি আমাদের তদন্তের একমাত্র ডিরেকশন নয়। অন্যান্য বিষয়গুলোকেও আমরা সমগুরুত্ব দিয়ে তদন্তকাজ পরিচালনা করছি।’
গত সোমবার শাহবাগ থানায় দায়েরকৃত হত্যা এবং মোহাম্মদপুর থানার হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্ত শুরু করেছে ডিবি পুলিশ। ছায়াতদন্ত করছে পুলিশ ব্যুারো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র‌্যাবসহ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্ত সংশ্লিস্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দুই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আলামত খতিয়ে দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে চারজন করে মোট আট হামলাকারী এতে অংশ নেয়। দুই ঘটনায়ই ‘কিলিং মিশন’ সম্পন্ন করতে যায় তিনজন করে। আর বাইরে অপেক্ষমাণ থাকে একজন। হত্যা করতে দুর্বৃত্তরা দেড় ফুটের মতো বড় আকারের স্টিলের বাটের চাপাতি ব্যবহার করেছে, যা সম্পূর্ণ নতুন। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রত্যক্ষদর্শী রনদীপম বসুও বলেন, ‘চাপাতিটা বড় ছিল। নতনি ঝকঝকে। দুই হাতে ধরে কোপ দেয়। আমি আর কিছু খেয়াল করতে পারিনি।’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সিটিসিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ ও আহতদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে হামলাকারীরা অনেকবার রেকি করেছে। লালমাটিয়ার শুদ্ধস্বর প্রকাশনা অফিস যে ভবনে সেখানে দুপুরে কোনো দারোয়ান থাকে না। বাড়িটি অনেকটাই নিরব থাকে। পাশাপাশি শনিবারে দুপুরে আজিজ মার্কেটের জাগৃতি প্রকাশনীতে প্রকাশক দীপন একাই থাকেন। আহত টুটুল প্রাথমিকভাবে পুলিশকে জানিয়েছেন, হুমকি পাওয়ার পর দু’একজন বই নিতে আসে যাদের তার সন্দেহ হয়। এই কথা পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি। হামলাকারীরা ভেবেছিল- দুপুরে টুটুল ও অফিস স্টাফ রাসেল, এই দুইজনই অফিসে আছে। অস্ত্র দেখিয়ে রাসেলকে জিম্মি করে টুটুলকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবে ওই অফিসে ঘটনার সময় আরও তিনজন থাকায় হামলাকারীরা অনেকটা বেকায়দায় পড়ে যায়। দ্রুত এলোপাথাড়ি কুপিয়ে এবং গুলি করে পালিয়ে যায়। আর এ কারণেই টুটুল বেঁচে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র মতে, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে ব্লগার রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ফয়সাল বিন নাঈম, এহসান রেজা ওরফে রুম্মান, মাকসুদুল হাসান অনিক, নাঈম সিকদার ইরাদ, নাফিস ইমতিয়াজ ও সাদমান ইয়াসির মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এরপরই জানা যায় এইবটির ব্লগার ও ‘ধর্ম সমালোচকদের’ হত্যার পরিকল্পনা। এবিটির প্রধান মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানীর আদর্শে অনুপ্রাণীত হয়ে তারা খুন করছে। রাজীব হত্যার পরিকল্পনা করে রেদওয়ানুল আজাদ রানা নামে এক সাবেক শিবির কর্মী। তবে তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। বিদেশে পলাতক রানার নাম আরও তিন ব্লগার হত্যার পর এসেছে।
গত ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ী এলাকায় তিনজন মিলে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে। পালানোর সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে জিকরুল্লাহ ও আরিফুর রহমান নামের দুই মাদ্রাসা ছাত্র। পরে যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় সাইফুল নামের আরেকজনকে। গত ২ সেপ্টেম্বর এই হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করে ডিবি পুলিশ। এতে অভিযুক্ত করা হয়, আরিফুল ইসলাম, জিকরুল্লাহ, সাইফুল ইসলাম, জুনায়েদ ওরফে তাহের ও হাসিব ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে বড় ভাইকে। পুরো দলটি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আরেকটি স্লিপার সেল। যাত্রবাড়ীতে বসে এই খুনের পরিকল্পনাটি করে কথিত বড় ভাই। তবে এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী দুই জনসহ নেপথ্যে কারা আছে, তা জানা যায়নি।
তদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এবিটির আরও কয়েকজন অনুসারীর নাম পাওয়া গেছে, যাদের প্রায় সবাই পলাতক। অনেকে আছেন বিদেশে। তাদের গ্রেপ্তার করা গেলে রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংগঠনিক ভিত্তি খুঁজের বের করা যাবে। এদিকে গত ২৫ মে নিষিদ্ধ হওয়া এবিটির সংগঠনিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গোয়েন্দা বলছেন, এবিটি একটি আদর্শগত প্লাটফর্ম। এর কোনো কমিটি বা কাঠামো নেই। অনলাইনে ‘জুমার খুতবা’ নামে একটি ওয়েব পেইজ এবং রাজধানীর বসিলায় রাহমানীর মাদ্রাসা ‘উগ্রপন্থি’ বয়ান থেকে এই আদর্শ ছড়ানো হয়। পরে অনুসারী বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যায়। ভিন্ন মতাদর্শ ও ব্লগার খুনের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে জঙ্গিদের ‘স্লিপার সেলের’ সন্ধান পায় গোয়েন্দারা। কয়েকজন মিলে গঠিত একটি খুনি দলকে বলা হচ্ছে স্লিপার সেল, যারা গোপনে সংগঠিত হয়। এই দলটি কাট আউট পদ্ধতিতে কাজ করে। ঘটনার আগে তারা পরিচিত হলেও সহযোগীদের সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না। আবার পরিকল্পনার পেছনে কারা আছে, তাও বলতে পারে না। অর্ধশতাধিক জেএমবি ও এবিটির সদস্যকে দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে স্লিপার সেল ও কাট-আউটের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি গোয়েন্দারা।
সূত্রমতে, দুই হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন এবিটি জঙ্গিদের আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করার চিন্তা করা হচ্ছে। আগে গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজনকে দুই মামলায় শোনঅ্যারেস্ট দেখানো হতে পারে বলে জানায় সূত্র। পাশাপাশি জামায়ত-শিবিরের নাশকতাকারীদের ব্যাপারেও খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি গাবতলীতে পুলিশ হত্যা এবং হোসনি দালানে তাজিয়া মিছিলের বোমা হামলার তদন্তের সঙ্গে দুই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে হামলার বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।
তদন্তের ব্যাপারে মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে মামলা দু’টি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শাহবাগ থানার হত্যা মামলার তদন্ত করছে ডিবি দক্ষিন ও মোহাম্মদপুর থানার হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্ত করছে ডিবি পশ্চিম। প্রাথমিকভাবে আমরা যে তথ্য পেয়েছে তাতে মনে হয়েছে, এটি পূর্ব পরিকল্পিত ঘটনা। দু’টি ঘটনার ক্ষেত্রেই অনেকাংশে মিল আছে। পূর্বে সংগঠিত ব্লগার হত্যা এবং হত্যাচেষ্টার ঘটনার সঙ্গেও এই দুই ঘটনার মিল রয়েছে। তবে তদন্ত যেহেতু প্রাথমিক পর্যায় সেহেতু সুনির্দষ্টভাবে কোন গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে অথবা তাদের মোটিভ কী ছিল সে সংক্রান্ত তথ্য পরিবেশন করা থেকে বিরত থাকব।’
তিনি আরো বলেন, আমরা এই দুই মামলার তদন্তে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিচ্ছি। পাশাপশি সোর্স নিয়োগ করে ঘটনার কারণ, মোটিভ সম্পর্কে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছি।’
মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তদন্তে কোনো বিষয়কেই গুরুত্ব থেকে থেকে বাদ দিচ্ছি না। বিভিন্ন অপশন নিয়ে আমরা কাজ করি। ব্যক্তিগত বিষয়গুলো থাকতে পারে, এমনকি ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্বও। পাশাপাশি কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীর কাজ কিনা সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আমরা তদন্ত কাজ করছি।’
প্রসঙ্গত- গত শনিবার দুপুরে লালমাটিয়ার সি ব্লকের ৮/১৩ নম্বর ভবনের চার তলায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল, কবি ও ব্লগার তারেক রহিম এবং ব্লগার-লেখক রনদীপম বসুকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। বই ক্রেতা সেজে অফিসে ঢুকে গুলি চালায় হামলাকারীরা। শুদ্ধস্বর প্রকাশনা সংস্থা থেকে খুন হওয়া ব্লগার অভিজিৎ রায়ের ‘সমকামিতা’, ‘অবিশ্বাসের দর্শন’, ‘ভালবাসা কারে কয়’, ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইগুলো প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে শনিবার বিকেলেই শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার ১৩১ নম্বর কক্ষের জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয় থেকে এর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত দীপনের জাগৃতি প্রকাশনী থেকে অভিজিত রায়ের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি প্রকাশ করা হয়। দুই ঘটনায় সোমবার স্থানীয় থানায় মামলা দায়ের করা হয়।