
১৯৭১ সালের ২৮ ডিসেম্বর গভর্নর হাউসে (বঙ্গভবন) মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীদের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে চার জাতীয় নেতা
নিজস্ব প্রতিবেদক : পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দ্বিতীয় কলঙ্কজনক অধ্যায়টিই হচ্ছে জেলহত্যা দিবস। ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সবচেয়ে ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং তৎকালীন স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমদের প্ররোচণায় একশ্রেণির উচ্চাভিলাষী মধ্যম সারির জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা এ নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটায়। দেশের ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত এই কালো অধ্যায়ের দিবসটি আজ।
জাতি চার জাতীয় নেতাকে যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে আজ শোকাবহ দিবসটিকে স্মরণ করছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের উদ্যোগে সারা দেশে পালিত হবে শোকাবহ এই দিবস।
জাতীয় এ চার নেতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধেও নেতৃত্ব দান করেন।
আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জাতির জনককে তার ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। পরে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের মুজিবনগর সরকারের সমধিক পরিচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কোটি কোটি বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বঙ্গবন্ধুর অপর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মোশতাক ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র ৮২ দিন। এরই মধ্যে দেশকে পাকিস্তানীকরণের দিকে এগিয়ে নেওয়া ছাড়া তার সবচেয়ে বড় দুটি জঘন্য কীর্তি হলো জেলে জাতীয় চার নেতাকে খুন এবং ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার করা যাবে না- দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি। পঁচাত্তরের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি এই অধ্যাদেশ জারি করেন। আর জেলে নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটান ৩ নভেম্বর ভোররাতে।
জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে প্রদত্ত বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘এ কথা অনস্বীকার্য যে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার পাশাপাশি জাতিকে নেতৃত্বহীন করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কারাবন্দি অবস্থায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে এক শোকাবহ দিন।’
মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতার অবদানের কথা স্মরণ করে আবদুল হামিদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় তার অবর্তমানে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকার গঠন, রণনীতি ও রণকৌশল প্রণয়ন, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, কূটনৈতিক তৎপরতা, শরণার্থীদের তদারকিসহ মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধে পরিণত করতে জাতীয় চার নেতা অসামান্য অবদান রাখেন। জাতি তাদের চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।’
জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে প্রদত্ত বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কারাগারের অভ্যন্তরে এ ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড ছিল জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এর মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলার মাটি থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নাম চিরতরে মুছে ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস এবং বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।’
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইতিমধ্যে সপরিবারে জাতির পিতার হত্যার বিচারের রায় কার্যকর করা হয়েছে। জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার সম্পন্ন করা হয়েছে।’

