নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রশিক্ষিত দু’টি দল দিনের পর দিন রেকি করে দুই প্রকাশককে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়। লালমাটিয়ার হামলায় অংশ নেয় তিনজনের একটি দল। শাহবাগে হত্যাকাণ্ড ঘটনায় অন্তত পাঁচজন। আগের ব্লগার হত্যার ঘটনার সঙ্গে কিছু বিষয় মিল থাকলেও এবারের একযোগের হামলায় বেশকিছু ভিন্নতা রয়েছে। প্রাথমিক আলামতে ঘটনাটিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের (এবিটি) কাজ বলে ধরা হলেও সরকারবিরোধী নাশকতাকেও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। দুই ঘটনায় হামলাকারী ভিন্ন হলেও পরিকল্পনাকারী একই। একাধিক গোয়েন্দা সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
রোববার রাত পর্যন্ত দুই ঘটনায় মামলা হয়নি। তবে ছায়া তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দারা। লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনার কার্যালয়ে হামলায় প্রত্যক্ষদর্শী আছে। আছে গুলি, গুলির খোসাসহ বেশকিছু আলামত। তবে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। ওই মার্কেটের আটটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খুনি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে ছবিতে হত্যার কোনো দশ্য ধরা পড়েনি। যদিও সেখানে দীপনের চলাচল দেখা গেছে। এর ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানায় সূত্র।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘দীপন হত্যায় আমি অত্যন্ত মর্মাহত। ব্লগারদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হচ্ছে। আনসারুল্লাহ, আইএস, যারাই এ কাজ করে থাকুক না কেন, সবাই যুদ্ধাপরাধী বা জামায়াত-শিবিরের লোক। আগেও যারা এসব ঘটনা ঘটিয়েছে, বেশির ভাগ আসামিকে শনাক্ত করতে পেরেছি। কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, তা আমরা খতিয়ে দেখছি। সরকার সঠিকভাবে সব মোকাবিলা করছে। আমি মনে করি কারোরই উচিৎ না ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া। ব্লগারদের আমরা বারবার অনুরোধ করেছি, তারা যেন সংযতভাবে লেখেন।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘(আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি) অবশ্যই ভালো, অবশ্যই ভালো। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো অবনতি ঘটেনি। সব দেশেই এ রকম বিচ্ছিন ঘটনা ঘটে থাকে। এগুলো (খুন) উদ্দেশ্যমূলকভাবে হচ্ছে, আমি আগেও বলেছি।’
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আগের যে ব্লগার হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে সে ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অ্যাক্টিভিস্টরাই জড়িত। ওই আমব্রেলার লোকজনই জড়িত। এ ঘটনায়ও আমাদের তাদেরই সন্দেহ। এরপরও অন্য কোনো বিষয় আছে কি না, অন্য কোনো জঙ্গি সংগঠন জড়িত কি না সেটিও আমরা বিবেচনায় রেখে তদন্ত এগিয়ে নেব।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এই হামলাকারীদের ধরতে পারছি না এটা ঠিক নয়। অনেক ঘটনায়ই আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পৃথিবীর যে দেশে জঙ্গিবাদ বিস্তারের চেষ্টা আছে সেসব দেশে এগুলো দেখার জন্য কাউন্টার টেররিজম নামে পুলিশের আলাদা ইউনিট থাকে। আমাদের সেটি নেই।’
জিডি করার পরও নিরাপত্তা না পাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এটি ঢালাওভাবে বলা ঠিক নয়। অনেক ঘটনা আমরা প্রতিহত করেছি। টুটুল ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখে জিডি করেছিলেন। তার ওখানে পুলিশ গিয়েছিল। তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তার ওপর হামলাটা আমরা প্রতিহত করতে পারিনি। তবে আমরা চেষ্টা করছি। জাগৃতির প্রকাশক দীপন কোনো হুমকি পেয়েছেন, এমন তথ্য আমাদের কাছে ছিল না। আমাদের জানানো হয়নি। তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারতাম।’
তিনি যোগ করেন, ‘ইন্টারনেট বিশাল জগৎ। এখানে কে কী লিখছেন, কে কিভাবে হুমকি পাচ্ছেন তা সব সময় জানা যায় না। কেউ হুমকি পেয়ে থাকলে এবং তা আমাদের জানা থাকলে সুবিধা হবে।’
একই ধরনের ঘটনা ও যোগসূত্রের ব্যাপারে মহানগর পুলিশের এই মুখপাত্র বলেন, ‘দুটি ঘটনায় একইভাবে কোপানো হয়েছে। এতে মনে হয়েছে, দুই ঘটনার পেছনের পরিকল্পনাকারী একই লোক। প্রশিক্ষণও দিয়েছে একই লোক। তদন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে। তাই এ ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনাগুলোর যোগসূত্র আছে কি না তা এখনই বলতে পারবো না।’
লালমাটিয়ায় হামলাকারী তিনজনই:
রোববার লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর কার্যালয়ে গেলে প্রতিবেশীরা জানায়, গত মার্চে ওই ভবনের সামনে প্রায় প্রতিদিনই পুলিশ ছিল।
মুদি দোকানদার ফারুক হোসেন বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারি মাসে পুলিশ এসেছে। মার্চেও দেখেছি। এরপর আর দেখিনি। গতকাল আবার দেখলাম, ঘটনার পর।’
পাঁচতলা ভবনটির দোতলায় অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়ান দুই শিক্ষক। সেখানে শনিবার দুপুরে নবম শ্রেণীর কয়েকজন ছাত্র ছিল। তারা চিৎকার ও গুলির শব্দ শুনে প্রথমে এগিয়ে যায়। তাদেরই একজন পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলে, ‘হামলাকারীরা তিনজন ছিল। আমরা বের হওয়ার সময় তিনজনকেই নামতে দেখেছি। এরপর তারা বাইকে চলে গেছে। তাদের বয়স কম। তখনো বুঝিনি কী ঘটনা।’
মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে ও আলামত নিয়ে আমরা কাজ করছি। তবে মামলা হয়নি।’
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, টুটুলসহ তিনজনের ওপর হামলাকারীদের মধ্যে একজনের হাতে ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। অন্য দুজন চাপাতি ব্যবহার করে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা গুলির খোসা ও গুলি ব্যালিস্টিক পরীক্ষা করা হবে।
আলামতের ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পরিকল্পনা করে সময় নিয়ে ঘটনা দুটি ঘটানো হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছে, তারা চাপাতি চালাতে পারদর্শী। আবার এখানে গুলির বিষয়ও আছে। দুটি গুলি তারা ঘটনাস্থলে ফেলেও গেছে। তারা পেশাদার খুনি নয় বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে লালমাটিয়ার ঘটনাটিতে।’
৩টার দিকে খুন হন দীপন:
রোববার শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে ব্যবসায়ীরা মার্কেটটি বন্ধ রেখেছে। আজিজ সুপার কো-অপারেটিভ বহুমুখি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নাজিমুদ্দিন নাজিম বলেন, ‘অফিসে ঢুকেই দেখি নামাজে সিজদা দেয়ার মতো উপুড় হয়ে পড়ে আছেন দীপন। হামলার পরই তিনি মারা গেছেন। সিসিটিভি ক্যামরায় তার খুনির চেহারা এসেছে কি না জানি না। কয়েকটি ফুটেজ পুলিশ নিয়ে গেছে। তবে দীপনের অফিসের সামনে ক্যামেরা ছিল না।’
এদিকে ছায়া তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রোববার ডিবি পুলিশ, পুলিশ ব্যুারো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র্যাবসহ কয়েকটি সংস্থা আজিজ মার্কেটের আটটি পয়েন্টের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে গেছে। এই ফুটেজে দুপুর আড়াইটার দিকে দীপন মার্কেটের মধ্যে চলাফেরা করেছেন বলে দেখা গেছে। তিনি আজিজ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় অন্তরে রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খান। এরপর তার কার্যালয়ে গিয়েই হামলাকারীদের কবলে পড়েন। তার আগে বা পেছনে সন্দেহভাজন খুনিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। অন্তরে রেস্তোরাঁয় দুপুর ২টা ২৬ মিনিটে ঢোকেন দীপন। সামনের টেবিলে বসে খাবার খান তিনি। ঠিক ২টা ৪১ মিনিটে বিল দিয়ে বের হয়ে যান। এরপরই তিনি নিজ কার্যালয়ে যান। পরে সেখানে খুন হন। এই চলাচলের সময় দীপনের অবস্থান পরীক্ষা করা হচ্ছে।
রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে দীপনের ময়না তদন্ত করেন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. কাজী আবু শামা। তিনি বলেন, ‘নিহতের মাথার পেছনে একটি ১১ ইঞ্চি লম্বা এবং পাঁচ ইঞ্চি গভীর আঘাত আছে, যার কারণে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হতে পারে। তিনি মারা যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে খাবার খান, যা তার পাকস্থলিতে ছিল। আগে ব্লগার হত্যার সময় যেভাবে মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করা হয় দীপনকেও একই কায়দায় আঘাত করা হয়।’
দীপনের লাশের সুরতহাল করেছেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক শাহিন ফকির। তিনি লিখেছেন, ‘নিহতের ডান কানের নিচে ঘাড়ে ১০ ইঞ্চি লম্বা একটি জখম আছে। মাথার পেছনে বাম পাশে পাঁচ ইঞ্চি, ডান পাশে ছয় ইঞ্চি এবং পাশাপাশি চার ইঞ্চি আরো একটি কাটা জখম আছে। এগুলো পেছন থেকে ভারী ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সৃষ্টি হয়েছে।’
ছায়া তদন্তকারী একটি সূত্র জানায়, আজিজ সুপার মার্কেট ব্যস্ত এলাকা। এখানে হামলা করে পালাতে গেলে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে। তাই এই হত্যাকাণ্ডে বেশ কয়েকজন খুনি অংশ নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। আলামত ও পূর্বাপর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কমপক্ষে পাঁচজন ছিল।
এদিকে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর কার্যালয়ে হামলার সময় গুলিও করা হয়েছে। আগে কোনো ব্লগার হত্যায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়নি।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ১৮ আগস্ট র্যাব তৌহিদুর রহমান, সাদেক আলী মিঠু ও আমিনুল মল্লিক নামে তিন এবিটি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তবে হত্যার পরিকল্পনার পেছনে কারা, তা আজও জানা যায়নি। গোয়েন্দারা বলছেন, এই ঘটনায় সন্দেহভাজন কয়েকজনের ছবি পাওয়া গেছে।
হামলার শিকার দুই প্রকাশকই ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করেছেন। অভিজিৎ হত্যার সঙ্গে এসব ঘটনার যোগসূত্র ও তদন্ত বিষয়ে মনিরুল বলেন, ‘অভিজিৎ হত্যার পর এফবিআইকে আমরা ১১টি আলামত দিয়েছি, যার পরীক্ষার ফল তারা এখনো আমাদের দেয়নি। এ ছাড়া ওই তদন্তকাজে তারা আমাদের আর কোনো সহায়তা করতে পারেনি। আমরা জানি তারাও চেষ্টা করছে। আমরা কয়েকজনের ছবি পেয়েছি। শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
প্রসঙ্গত, গত শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে এই প্রকাশক আমমেদুর রশীদ টুটুল, কবি ও ব্লগার তারেক রহিম এবং ব্লগার-লেখক রনদীপম বসুকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। বই ক্রেতা সেজে অফিসে ঢুকে গুলি চালায় হামলাকারীরা। শুদ্ধস্বর প্রকাশনা সংস্থা থেকে খুন হওয়া ব্লগার অভিজিৎ রায়ের ‘সমকামিতা’, ‘অবিশ্বাসের দর্শন’, ‘ভালবাসা কারে কয়’ নামক বইগুলোও প্রকাশিত হয়। এছাড়া ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল অভিজিৎ রায় ও মীজান রহমানের যৌথ লেখা ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’।
অন্যদিকে শনিবার বিকেলে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার ১৩১ নম্বর কক্ষের জাকৃতি প্রকাশণরি কার্যালয় থেকে এর কর্ণধার ফসাল আরেফিন দীপনের রক্তাক্ত নিথর দেহ উদ্ধার করেন স্বজনরা।
হসপাতালে চিকিৎসকরা জানান, তার ঘাঁড় ও গলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জানা গেছে, দীপনের জাগৃতি প্রকাশনী থেকে নিহত বিজ্ঞান লেখক অভিজিত রায়ের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি প্রকাশ করা হয়।

