আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসন নতুন কোনো বিষয় নয়। কয়েক দশক ধরেই রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সকল চাপ-অভিযোগ অগ্রাহ্য করে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের উপর নির্যাচন চালাচ্ছে। যতদিন যায় ততই নতুন নতুন আইন-কানুন তৈরি করা হয় ফিলিস্তিনিদের অত্যাচারের জন্য। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমরা দেখতে পাই সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ছুড়ে দেয়া পাথরের জবাবে কিভাবে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে ইসরায়েলি সেনারা পশ্চিম তীর থেকে গাজা পর্যন্ত ঝাপিয়ে পড়ছে। সম্প্রতি ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী শিবির আইদার সামনে ইসরায়েলি সেনারা লিখে দিয়েছে, ‘তোমাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আমরা গ্যাস প্রয়োগ করে যাবো’। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কতটা নিশ্চুপ হলে ইসরায়েলি সেনারা এই ঔদ্ধত্য দেখাতে পারে।
কয়েকদিন আগেই ইসরায়েলি সেনারা গাড়িতে চড়ে ফিলিস্তিনি বসতির আশেপাশে মাইকিং করেছে ফিলিস্তিনিদের কিভাবে হত্যা করা হবে এবিষয়ে। মূলত পশ্চিম তীরের শরণার্থী শিবিরগুলোকে কেন্দ্র করেই এই মাইকিং করা হয়। ইসরায়েলি সীমান্তরক্ষীরা আরবি ভাষায় বারবার এই কথাগুলো বলছিল। পরিচয় প্রকাশে অপারগ এক সেনা অফিসার বলেন, ‘আইদা শরণার্থী শিবিরের মানুষদের কাছে আমরা আধিপত্যবাদী। তোমরা যতদিন পাথর ছুড়ে মারবে, আমরাও পাল্টা আঘাত হিসেবে তোমাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস প্রয়োগ করে যাবো। শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ..তোমরা সকলেই মারা যাবে। তোমাদের একজনকেও আমরা জীবিত ছাড়বো না।’
ওই সেনা অফিসার আরও বলেন, ‘আমরা তোমাদের একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। সে বর্তমানে আমাদের কাছে আছে। তাকে আমরা তার বাসা থেকে তুলে এনেছি এবং যখন তোমরা পাথর ছুড়ে মারবে তখন তাকে জবাই করাও তোমরা দেখবে। বাসায় ফিরে যাও অথবা আমরা তোমাদের গ্যাস প্রয়োগ করে হত্যা করবো। তোমাদের পরিবার, সন্তান কেউই রক্ষা পাবে না। আমরা তোমাদের হত্যা করবো।’
ইসরায়েলি এক সাধারণ সৈনিক যদি এই মত পোষণ করে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাহলে ইসরায়েলের নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তারা ফিলিস্তিন সম্পর্কে কি অভিমত পোষণ করেন তা বলাই বাহুল্য। কিছুদিন আগেই ইসরায়েলি সেনারা পশ্চিমতীরের একটি বাসভবন থেকে ২৪ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। ইসরায়েল থেকে প্রকাশিত টাইমস অব ইসরায়েল নামক পত্রিকায় অভিযোগের দৃষ্টিতে লেখা হয়, ওই তরুণকে পাথর ছোড়ার কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও ইসরায়েলি সংবিধান এবং আইনে এধরণের কোনো গ্রেপ্তারের ধারা নেই, এমনকি অস্ত্র হিসেবে পাথরের কথাও উল্লেখ নেই।
শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আল আজ্জা জানান, ‘শরণার্থী শিবিরের সকলেই এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছে। বিশেষ করে সেই সব পরিবারগুলো যাদের ঘরে সন্তান এবং অন্যান্যরা আছেন। তারা সকলেই ভয়ার্ত কারণ গত বছরই এক নারী গ্যাসে মারা গিয়েছিল। তারা মনে করছে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের সঙ্গেও ঠিক তাই করবে। ইসরায়েলি সেনারা সম্প্রতি তাদের ‘অক্যুপেশন ফোর্সেস’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। এমনকি তারা নিজেদের সৈনিক হিসেবে না বলে বলছে ‘ডিফেন্স ফোর্সেস’। এটা আমাদের কাছে নতুন। আমি একদিকে দুঃখিত এবং খুশি, কারণ এতোদিন পরে হলেও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের সত্যিকারের পরিচয় দেয়া শুরু করেছে। এটা আমাদের জন্য ভালো। তারা যখন আমাদের হত্যার জন্য গ্যাস প্রয়োগের কথা বলছিল, তখন প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। কোনো কারণ ছাড়াই তারা আমাদের হত্যা করে যাচ্ছে।’
অবশ্য এবিষয়ে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা আল জাজিরার পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এবিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র মিকি রোজেনফিল্ড বলেন, ‘ইসরায়েলি পুলিশকে বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে বলা হয়েছে।’ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এধরণের কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধের সামিল হিসেবে গণ্য হয় বলে জানায় ফিলিস্তিনভিত্তিক বেশকিছু মানবাধিকার সংস্থা।
সাম্প্রতিক ইসরায়েলি আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যকার সংঘর্ষে কমপক্ষে ৭০জন ফিলিস্তিনি এবং নয়জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আবদেল রহমান আবদুল্লাহ নামের এক ১৩ বছর বয়সী ফিলিস্তিনিও ছিল। আইদা শরণার্থী শিবিরের মধ্যে ইসরায়েলি সেনাদের ছোড়া গুলিতে নিহত হয় ওই শিশুটি। শরণার্থী শিবিরগুলোকে মূলত নিয়ন্ত্রিত এলাকা হিসেবে ধরা হয়। সেদিক বিবেচনায় শরণার্থী শিবিরে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী। অথচ নির্মম হলেও সত্যি, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ একের পর এক নিয়ম ভঙ্গ করে সাধারণ মানুষদের হত্যা করলেও আন্তর্জাতিক মহল তাদের বিচারের আওতায় আনছে না।

