বিনোদন ডেস্ক : ইরান, এক সমৃদ্ধ এবং প্রভাবশালী দেশ; রাজনীতি, কূটনীতি, ইতিহাস আর ঐতিহ্যেও পৃথিবীর মানচিত্রে হাজার বছরের সংস্কৃতি নিয়ে স্বদর্পে জায়গা দখল করে আছে। কিন্তু বিংশ শতকের শেষ দিকে ইসলামি বিপ্লবের পর অন্যান্য বিষয়ের মতন শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতিতেও নেমে আসে ধর্মীয় বিধি নিষেধ। তেমনি নাটক, থিয়েটার আর চলচ্চিত্র নির্মাণেও ইরানের সংস্কৃতিকে নানান বিধি নিষেধের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। চলচ্চিত্রে বিষয় নির্বাচনেও তাদের আছে রাষ্ট্রীয় বাধ্য বাধকতা, ধর্মীয় দৃষ্টিতে যা সীমা লঙ্ঘন তা কখনোই ছবিতে তোলা ধরা যাবে না, প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্ক দেখানো যাবে না, স্বাভাবিক যৌন বিষয়েও ছবিতে বলা যাবে না কিছুই। এভাবেই সবকিছুর উপর নেমে আসে ধর্মীয় খড়গ। এত বাধ্য বাধকতার মধ্য থেকে ইরানে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা এবং সেই ছকে বাধা চলচ্চিত্র নিয়ে বিশ্বের বাঘা বাঘা চলচ্চিত্রকারদের সাথে ফাইট দেয়া খুব সহজ কথা না; অথচ এমন ফাইট ইরানি নির্মাতা এখন হরহামেশায় দিচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় আর ধর্মীয় এসব বিধি নিষেধ মেনেই যে বা যারা ইরানি সিনেমার কান্ডারি হাতে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন নির্মাতা হলেন মাজিদ মাজিদি।
প্রাপ্ত বয়স্কদের গল্পে রাষ্ট্রীয় বিধি নিষেধের জন্য হয়তো তার ছবির চরিত্ররা বেশীর ভাগ সময়েই নিষ্পাপ শিশু, কিন্তু গল্প এবং উপস্থাপনা ভঙ্গি এতটাই স্বকীয় আর নিজস্ব যে ইরানি ছবিতে ধর্মীয় খড়গের অভাবটা ভুলিয়ে দেয়। আর যার ছবিতে শিশুরা বেশী প্রাধান্য পায়, তিনিও মাজিদ মাজিদি। এক দশক আগেও হয়তো তিনি উপমহাদেশে এতটা পরিচিত কেউ ছিলেন না, আজ তিনি যতটা পরিচিতি পেয়েছেন! নির্মাতা হিসেবে নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে তার বিকাশ। ষাটের দশকে ইরানের মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম বিশ্ব চলচ্চিত্রের এই প্রভাবশালী নির্মাতার।
অথচ প্রথম জীবনে নির্মাণের দিকে নয়, বরং অভিনয়ের দিকে ঝুঁক ছিল তার। অভিনয়ের ক্ষুধা নিয়ে বেগে উঠতে থাকলেন মাজিদি। মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম, বনেদি কোনো থিয়েটারে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও অর্থের জন্য হয়ে উঠেনি। ফলে অ্যামেচার এক থিয়েটারে গিয়ে অভিনয় শিখতে ভর্তি হন তিনি। যেসময় অভিনয় শিখতে থিয়েটারে গেলেন মাজিদি, তখন তার বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর।
থিয়েটার করে চোখ কান খুলতে থাকে তার। ধীরে ধীরে শেখার তেষ্টা আরো বাড়তে থাকে মাজিদির। বিশ্ব চলচ্চিত্র সম্পর্কেও কৌতুহলী হয়ে উঠেন তিনি। ফলত অ্যামেচার থিয়েটার ছেড়ে তেহরানে নাট্যকলা বিভাগে পড়তে গেলেন মাজিদি। এমন সময়ে ১৯৭৯ সালে ইরানে ঘটে যায় ইসলামিক রেভ্যুলেশন। বিপ্লবত্তোর সময়ে সবকিছু কেমন যেন হয়ে গেল। ইরানের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি সবকিছুই কেমন যেন পাল্টে গেল খুব দ্রুত। চিত্রকলা, কাব্য জগত, নাট্যকলা আর চলচ্চিত্রের চেহেরাও পাল্টে গেল। ধর্মীয় নেতার কথাই শেষ কথা হয়ে উঠলো। যারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে নিলেন না, কিংবা কলার বিভিন্ন মাধ্যমে ধর্মীয় নীতি, শাসনের কথা বললেন তাদের সৃষ্টিকর্ম নিষিদ্ধ করা হল। কিন্তু এরইমধ্যে একদল ইসলামি শাসনকে মেনে নিয়েই সৃষ্টির উন্মাদনায় জেগে উঠলো, মাজিদি ছাড়াও এই তালিকায় আগে থেকেই যুক্ত আছেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মহসিন মাখমাল্বাফ, দারিয়ুস মেহেরজুইয়ের মতন নির্মাতা। নানান ধরণের নিষিদ্ধের খড়গ মাথায নিয়ে চলচ্চিত্রে তারা হয়ে উঠলেন আধুনিক বিশ্ব চলচ্চিত্রের নক্ষত্র।
বিপ্লবের পরও নিজের মধ্যে অভিনয়ের সদিচ্ছা টিকিয়ে রাখলেন মাজিদি। প্রায় ছ’ ফুট লম্বা দীর্ঘ দেহী মাজিদি দেখতেও ছিলেন বেশ সুদর্শন। ফলে অভিনয়ে তাকে টিকে থাকতে তাকে খুব বেগ পেতে হয়নি। থিয়েটার করেছেন বলে এমনিতেই নিজের মধ্যে এক ধরণের মননশীলতা গড়ে উঠেছে তার। ফলে দেখা যায় কোনো গড়পরতা ছবিতে অভিনয়ে জড়াননি মাজিদি। ইরানের আরেক সৃষ্টিশীল নির্মাতা মহসিন মাখমাল্বাফ ১৯৮৫ সালে মাজিদিকে দিয়ে অভিনয় করান ‘বয়কট’ নামের একটি ছবিতে। যেখানে মানসিকভাবে পরাজিত একজন কমিউনিস্টের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মাজিদি। এরপর ১৯৮৬ সালে আজগর সাদারভনের ছবি ‘তীর বারান’ ছবিতে অভিনয় করেন মাজিদি। এরপরই মূলত মাজিদি অভিনয় কিছুটা কমিয়ে দিয়ে চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন, টুকটাক হাত মশক্ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ করে।
১৯৯২ সালে প্রথমবার ফিচার ফিল্ম নিয়ে আসেন মাজিদ মাজিদি। ‘বাদুক’ নামের একটি ছবিতে প্রথম তিনি ডিরেকশন দেন এবং চিত্রনাট্য লিখেন। প্রকৃতপক্ষে এই ছবিটিই নির্মাণে মাজিদির পুরো মনযোগ কেড়ে নিতে সমর্থ হয়। কারণ ছবিটি বিশ্বের প্রাচীন ফিল্ম ফেস্টিভাল ‘কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এ প্রদর্শীত হওয়ার জন্য মনোনীত হয় এবং একই বছর ইরানের ফজর ইন্টারনেশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে পুরস্কার জিতে নেয়।
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, ইসলামি বিপ্লবত্তোর সময়ে ইরানিয়ান শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির উপর এক ধরণের বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেয়া হলেও কার্যত এর পরেই, বিশেষ করে ইরানি চলচ্চিত্র পুরো বিশ্বে বিকশিত হয়। অন্যরকম এক আবেদন তৈরি করে।
করে নেয়। ২০০২ সালে মন্ট্রেল ফেস্টিভালে সেরা চলচ্চিত্র হিসেবেও ছবিটি পুরস্কার জয় করে।
চিল্ড্রেন অব হেভেন: একজুড়ো জুতোকে কেন্দ্র করে যে একটি দুরন্ত ছবি নির্মাণ করা যায়, তা কি মাজিদির আগে এত চমৎকার করে কেউ দেখাতে পেরেছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অঙ্গনে! ছোট্ট দুই শিশুর ইমোশনাল গল্প পুঁজি করে ১৯৯৭ সালে লিখেন ও নির্মাণ করেন তার জীবনের অন্যতম ছবি ‘চিল্ড্রেন অব হেভেন’। যে ছবিটি তাকে আন্তর্জাতিকভাবে একজন অসাধারণ নির্মাতা হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়।
ইরানিয়ান প্রথম কোনো ছবি হিসেবে এটি অস্কারে সেরা বিদেশী ভাষার সিনেমার জন্য মনোনীত হয়। এরই মধ্যে একটি উপন্যাসও লিখেছেন মাজিদি।
কালার অব প্যারাডাইজ: মাজিদির নির্মাণে অন্যতম একটি ছবি। ইরানের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক অন্ধ শিশুর কাহিনীকে উপজীব্য করে ১৯৯৯ সালে ছবিটি নির্মাণ করেন মাজিদি। আন্তর্জাতিক পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি ছবিটি ২০০০ সালে আমেরিকার সেরা ১০ ছবির তালিকায় স্থান করে নেয় ছবিটি।
বারান: বিশ্বের অন্যতম প্রেমের ছবি হিসেবে সেরা দশটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের নাম নিলে চলে আসবে মাজিদ মাজিদির ছবি ‘বারান’। ‘বেস্ট লাভ অলয়েজ সাইলেন্ট’ কথাটির মর্মার্থ পুরোদমে অনুধান করা যাবে ছবিটি দেখলে। ‘‘বারান’’ সিনেমায় ইরানে বাস করা এক আফগান পরিবারের শুধুমাত্র করুণ কাহিনী উঠে এসেছে’ বলে যারা মনে করেন তাদের সাথে সহমত পোষণ না করে বরং বলতে চাই বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘বারান’ অসাধারণ এক নিঃশব্দ ভালবাসার সিনেমা। প্রেমের সিনেমা হিসেবে নায়িকার হাত ধরে নায়কের মলামলি নেই যদিও, কিংবা নায়ক তার প্রেম প্রকাশ করতে যেয়ে নিজের হার্ট খুলে ফেলে না তারপরেও এই সিনেমায় ‘What Is Love’ কাকে বলে এইটা স্বচক্ষে দেখতে পারবেন।
এছাড়া ‘সং অব স্পেরোস’, ‘ফাদার’ এবং‘দ্য উইলো ট্রি’ ছবিগুলোর মধ্যে সত্যিকারের একজন মেধাবী নির্মাতাকে পরখ করেছে বিশ্ব চলচ্চিত্রাঙ্গন।
মুহাম্মদ-দ্য মেসেঞ্জার অব গড: ধর্মটাকেও তিনি লালন করেন। নিজের ধর্মের পাশাপাশি অন্যের ধর্ম সম্পর্কেও সহিষ্ণু মানবতার ধর্মে বিশ্বাসী মাজিদি। ধর্মের বিকৃতি তিনি মেনে নিতে নারাজ। তাইতো দেখি ডেনিশ ফিল্ম ফেস্টিভালে তার ছবিকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ সে দেশ থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গ কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও সাত বছর অন্য কোনো ছবি নির্মাণ না করে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর আত্মজীবনী নির্মাণে হাত দিয়েছেন। তিন পর্বের ছবিতে পুরো হযরত মুহাম্মদ সা.-এর জীবনকে তুলে ধরতেই এই বিশাল প্রজেক্ট। এরই মধ্যে প্রথম পর্ব নির্মাণ করে সম্প্রতি ইরানে মুক্তি দিয়েছেন। যদিও ছবিটি নিয়ে এরইমধ্যে সারা বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
নিজের কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে মাজিদ মাজিদি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন। ধর্মীয় অনুশাসনের বৃত্তের মধ্যে থেকেও মাজিদ মাজিদি তার সৃষ্টিশীলতার সর্বোচ্চটা দিয়েছেন, এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছেন।

