রংপুর প্রতিনিধি : সদ্য বিলুপ্ত দহলা খাগড়াবাড়ী ছিটমহলে বিদ্যুৎ এসেছে মাত্র সপ্তাহখানেক হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, সেখানে তৈরি হয়েছে একটি বিদ্যালয়ও। এই ছিটমহলের ছেলেমেয়েরা পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন স্কুলে পড়তো ঠিকই, কিন্তু চাকরির সুযোগ তাদের একাবারেই ছিল না। ছিল না ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাও। তবে সে সবই এখন অতীত। আস্তে আস্তে বাড়ছে নানা সুযোগ সুবিধা। মানুষগুলো স্বপ্ন দেখা শুরু করছে।
এ মানুষগুলোর জন্য অন্যতম একটি আনন্দের দিন ছিল ২৫ অক্টোবর, রোববার। তাদের মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায় তা দেখতে এবং কিছু সিএসআর কার্যক্রমের উদ্বোধন করতে সেখানে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। সঙ্গে ছিল দেশে কার্যরত বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বেশ কজন কর্মকর্তা।
গভর্নরের আগমন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানস্থলে নেমেছিল মানুষের ঢল। তবে মঞ্চ থেকে শুরু করে পুরো জায়গা জুড়ে সাধারণ মানুষ এতো বেশি ছিল, যাতে অনেকটা মলিনই ছিল সাবেক ছিটবাসীদের উপস্থিতি। তাইতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচলাক ম. মাহফুজুর রহমান যখন ঘোষণা দিল দুজন সাবেক সিট বাসিন্দাদের কথা শুনবো, তখন দেখা গেল দুজন বাঙালী নেতা এসে পুরোদস্তুর রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে গেলেন।
তবে সবকিছুর পরও বিভিন্ন ব্যাংকের দেয়া সিএসআরের অনুদানগুলো সাবেক ছিটবাসীদের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন ড. আতিউর রহমান। বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, সেলাই মেশিন বিতরণ, নগদ টাকার চেক হস্তান্তর, সাইকেল প্রদান, শিশুদের বই-খাতা-ব্যাগ বিতরণসহ বিভিন্ন কাজ করা হয়। বিভিন্ন সহযোগিতা নিয়ে পঞ্চগড়ের ৩৬টি প্রাক্তন ছিটমহলে ৩৮টি ব্যাংক হাজির হয়েছিল। আজকে ব্যাংকগুলোর এই মানবিক কার্যক্রমে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা।
গভর্নর বলেন, ব্যাংকগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কর্মসূচির আওতায় এ এলাকার সমস্যা দূর করার জন্যে কাজে নেমে পড়েছে। ৩৩৪টি নলকূপ, ১৯২টি স্যানিটারি ল্যাট্রিন, ১০টি স্প্রে মেশিন, বিপুল পরিমাণ ওষুধ এবং শিক্ষা কার্যক্রমের আধুনিকায়নে ১৯টি কম্পিউটার, ১৩০০টি স্কুলব্যাগ, ৪২ লাখ টাকা খরচে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণ, ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, ১০০টি স্কুল বেঞ্চ, কর্মসংস্থানের জন্যে ৯০টি সেলাই মেশিন, ১৮৩টি বাইসাইকেল, ১১০টি ভ্যান গাড়ি, ১৪৬ বান্ডিল ঢেউটিন, ৩০টি গরু, দরিদ্র মানুষের শীত নিবারণের জন্যে ৫১০০টি কম্বল বিতরণসহ বহুমুখী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও বিতরণে ব্যাংকগুলো আপনাদের কাছে এগিয়ে এসেছে।
এই এলাকার মতোই পূর্বতন অন্যান্য ছিটমহলগুলোতেও ব্যাংকগুলো তাদের শাখা স্থাপন করে কৃষি ঋণ, এসএমই ঋণ, কর্মসংস্থান ঋণ, নারী উদ্যোক্তা ঋণসহ নানামুখী ব্যাংকিং সেবা প্রদানের জন্যে এগিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন আতিউর রহমান। বাড়তি এসব সামাজিক বিনিয়োগের পরিমাণ আরো কয়েক কোটি টাকা হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গভর্নর বলেন, সাবেক এই ছিটবাসীদের মূলধারায় নিয়ে আসতে চাই। এজন্য সব ধরনের সহযোগিতা তাদের প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য উচ্চতর প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। এমন কোনো মানুষ আমরা দেখতে চাই না যারা সরাসরি আর্থিক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এটা আমাদের স্বপ্ন। সবাইকে এখানে নিয়ে আসা।’
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কমকর্তা ও ছিটমহলের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনের নেতা ও এলাকাবাসী।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রচেষ্টায় গত ১ আগস্ট ছিটমহলবাসীদের দুঃসহ জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১১১টি পূর্বতন ছিটমহলে লাল-সবুজ পতাকা শোভিত বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূর্বতন ছিটমহলগুলোতে সম্ভাবনার এক নব দিগন্ত খুলে গেছে।

