ঢাকাWednesday , 14 October 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

উন্নয়ন ও সম্ভবনার হাতছানি দিচ্ছে বাগেরহাট

Link Copied!

bagerhatবাগেরহাট প্রতিনিধি : একটি সমুদ্র বন্দর, একটি বিমান বন্দর, সড়ক পথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিশ্ব ঐতিহ্যে আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এই উপাদানগুলো যে স্থানে রয়েছে সে অঞ্চল অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যে কতটা শক্তিশালী তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বাগেরহাট যে অচিরেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির অংশ হতে চলেছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
পদ্মা সেতুর নির্মাণ, খুলনা-মংলা রেল যোগাযোগ প্রকল্প, প্রস্তাবিত খানজাহান আলী বিমানবন্দর , রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র  নির্মাণের সিদ্ধান্ত, ‘সাদা সোনা’ খ্যাত চিংড়ির সর্ববৃহৎ উৎপাদন ক্ষেত্রের কারণে বাগেরহাট দিনদিন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হতে শুরু করেছে।
৬০ বছরের অধিক পুরানো সমুদ্র বন্দর মংলা বন্দর এই বাগেরহাট জেলাতেই কিন্তু তারপরও জেলাটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, অনগ্রসর। কিন্তু দ্রুতই এ পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে। সমৃদ্ধি খুব দূরের পথ নয়, এমনটাই এখন ভাবছেন সবাই। আর এই ভাবনার যথেষ্ট কারণও আছে।
অতি সম্প্রতি জেলার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। ভারতের সঙ্গে মংলা বন্দর ব্যবহারের চুক্তি হয়েছে। ভারত ও নেপাল মংলা বন্দর ব্যবহার শুরু করলে দ্রুত এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন জাগরণ ঘটবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু, খুলনা-মংলা রেল যোগাযোগ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হওয়া, বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসছে বাগেরহাট অঞ্চল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উপযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নাব্যতা সঙ্কটে মংলা সমুদ্র বন্দর ও মংলা ইপিজেড দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। সম্প্রতি মংলা ঘষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ-চ্যানেল দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু, প্রস্তাবিত রেল, বিমান ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার সিদ্ধান্তে সব ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
জেলাবাসীর প্রত্যাশা বিমানবন্দর, রেললাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পদ্মাসেতু এই এলাকার অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দেবে। হযরত খান জাহানের স্মৃতি বিজড়িত বাগেরহাট জেলার দু’টি বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ও ষাটগম্বুজ মসজিদ ঘিরে দ্রুত বিকশিত হবে পর্যটন শিল্প।
এতদিন চিংড়ি চাষে গুটিকয়েক মানুষের উন্নতি হয়েছে। এখন উন্নয়ন হবে সার্বিক। রাস্তা-ঘাটের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মানও বাড়ছে দিন দিন। নির্মাণ করা হচ্ছে সাইনবোর্ড-মোরেলগঞ্জ-বগি-সুন্দরবন আঞ্চলিক মহাসড়ক।
জেলার উন্নয়ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় জানা যায়, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে নাগরিক সেবা এখন পৌঁছে যাচ্ছে জনগণের দোরগোড়ায়। বাড়ছে আত্ম-কর্মসংস্থান, সচেতনতা ও জনগণের ক্ষমতায়ন। বাগেরহাটের ৫০১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বেশিরভাগে ডিজিটাল ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দেয়া হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি, শিক্ষা, কৃষি, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, ভেজাল এবং বিষমুক্ত খাবারসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাগেরহাটের সাফল্য অনেক বেড়েছে। যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেলে এসব ক্ষেত্রে অনুকরণীয় হতে পারে বাগেরহাট।
চিংড়ি খাত থেকে আয় দুই হাজার কোটি টাকা:
বাগেরহাটে প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ উৎপাদিত হয়। ‘সাদাসোনা’ খ্যাত বাগদা ও গলদা চিংড়ি উৎপাদন হয় সর্বত্র।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নারায়ন চন্দ্র মণ্ডল জানান, জেলার নয়টি উপজেলায় ৩৫ হাজার ৫৮৪টি বাগদা চিংড়ি খামার ও ৪০ হাজার ৯৪৮টি গলদা চিংড়ি খামার থেকে মোট ২৮ হাজার ৩৯১ মেট্রিক টন চিংড়ি (বাগদা ও গলদা) উত্পাদন হয়। আশির দশক থেকে এ জেলায় চিংড়ি চাষ শুরু হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে সাদা মাছের উৎপাদন ছিল ৪০ হাজার ২৫ মেট্রিক টন। সল্প সময়ে চিংড়ি চাষ অতে ৩-৪ গুণ মুনাফা পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিনিয়োগকারীরা এই জেলায় এসে চিংড়ি চাষে বিনিয়োগ করছে।
৫ হাজার টন তেল উৎপাদন মিলে:
বাগেরহাট শহর সংলগ্ন দড়াটানা নদীর পাশে ১৯ দশমিক ৩০ একর জমির উপর ১৯৯৫ সালে বাগেরহাট বিসিক শিল্প নগরীর যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নারকেল তেলের মিল রয়েছে ২২টি। আর সব মিলিয়ে জেলায় রয়েছে ৬০টি নারিকেল তেলের মিল। এসব মিরের মোট নারকেল তেলের উৎপাদন প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদিত তেল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়।
বাগেরহাট সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন টগর বলেন, ‘বিগত সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের এই জেলায় মৌলিক কোনো উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে এই জেলায় উন্নয়নের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।’
পর্যটকদের আকর্ষণ:
বাগেরহাট জেলা বরাবরই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন এই জেলাতেই অবস্থিত। সুন্দরবন দেখতে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক আসেন। জেলার রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত তাই নির্ভয়ে মানুষ এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। সারা বছরই সুন্দরবনে বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা লক্ষ্য করার মতো। আর শীত মৌসুম যেন হয়ে ওঠে বিদেশি পর্যটকদের মিলন মেলা।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর (খুলনা) কাস্টোডিয়ান গোলাম ফেরদৌস জানান, সুন্দরবনের সঙ্গে বাগেরহাটের অন্যতম আকর্ষণ রয়েছে প্রায় ৬০০ বছর পুরাতন ষাটগম্বুজ মসজিদ। সম্প্রতি এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংশ্লিষ্ট কিছু উন্নয়ন করা হয়েছে।
২০১৫ সালের শেষের দিকে উন্নয়ন প্রকল্পটি শেষ হবার কথা রয়েছে।এ প্রকল্পটি শেষ হলে  অফুরন্ত পর্যটন সম্ভবনার সম্পদ ঐতিহ্য ও নানা বৈচিত্রময় প্রত্নসম্পদ, সাংস্কৃতিক সম্পদ, নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বাগেরহাট অঞ্চল আরও প্রসিদ্ধ হবে। ফলে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হবে। উন্নয়ন কাজ শেষে হলে রাজস্ব আয় আরও বৃদ্ধি পাবে বলে জানান তিনি। গত অর্থ বছরে (২০১৪-১৫) কেবলমাত্র ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে ২০ লক্ষাধিক টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে বলে জানান প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা।
বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. শাহ আলম টুকু বলেন, ‘এ জেলা দীর্ঘদিন উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল। বিগত কয়েক বছরে দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন হয়েছে ও অনেক উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। পদ্মাসেতু নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে এ জেলার অনেক কিছু বদলে যাবে। বিশেষ করে ব্যবসা বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প ও শিক্ষা খাতের প্রসার ঘটবে। বর্তমান সরকারের আমলে এ জেলায় কৃষিতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।’
জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘শুধু সুন্দরবন নয়, পুরো বাগেরহাট জেলাই হতে পারে ইকো-টুরিজমের এক পরিচ্ছন্ন নগরী। ষাট গম্বজ মসজিদ এবং মসজিদ সংলগ্ন দিঘিটিকে ঘিরে একটি প্রকল্পের কাজ চলছে।’
উল্লেখ্য, এক সময় বাগেরহাটের নাম ছিল খলিফাতাবাদ বা প্রতিনিধির শহর। খান আল আযম উলুঘ খান-ই-জাহান গৌড়ের সুলতানদের প্রতিনিধি হিসেবে এ অঞ্চল শাসন করতেন। কেউ কেউ মনে করেন বাঘ শব্দ থেকে বাগেরহাট নামটি এসেছে। জনশ্রুতি রয়েছে, খান জাহানের (রহ.) একটি বাগ (ফার্সি শব্দ যার অর্থ-বাগান) বা বাগিচা ছিল। এ বাগ শব্দ থেকে বাগেরহাট হয়েছে। আবার কারও কারও মতে নদীর বাঁকে হাট বসত বিধায় বাঁকেরহাট থেকে বাগেরহাট হয়েছে। প্রকৃত ইতিহাস আজও রহস্যাবৃত। ১৮৪২ সালে বাগেরহাট খুলনা মহকুমার অন্তর্গত একটি থানা ছিল। ১৮৬৩ সালে বাগেরহাট যশোর জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমায় রূপান্তরিত হয়। পরে ছিল খুলনা জেলার একটি মহকুমা। আর বাগেরহাট জেলা হিসেবে উন্নীত হয় ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। আর উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলেও আগামীতে হবে ‘মডেল জেলা’।