নিজস্ব প্রতিবেদক : সেদিনের ঘটনাকে অনেকেই রাজনৈতিক পাশবিকতা বলে মত ব্যক্ত করেছেন। সেদিনের দৃশ্যপট ছিল প্রতিবাদের। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ লোকারণ্য। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষের ওপর ছোঁড়া হল মানব বিধ্বংসী আরজেস গ্রেনেড। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলের নেতা শেখ হাসিনার বক্তৃতা শেষ করার মুহূর্তে ছুঁড়ে দেওয়া হল ১৩টি গ্রেনেডের একটি ঝাঁক। মুহূর্তের মধ্যেই পাল্টে গেল বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রক্তাক্ত হয়ে গেল পুরো এলাকা।
দৃশ্যপট এ রকম : একের পর এক ফুটতে থাকলো আরজেস গ্রেনেড। গ্রেনেডের ভেতরে থাকা শার্পনেলগুলো মানুষের দেহ ভেদ করতে থাকল। ট্রাকের ওপর স্থাপিত মঞ্চে থাকা শেখ হাসিনার দিকে ছোঁড়া গ্রেনেডটি লক্ষ্যের কাছে গিয়ে অবিস্ফোরিত থাকায় বেঁচে গেলেন তিনি। নেতারা মানববর্ম বানিয়ে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট। মঞ্চ ঘিরে থাকা মানুষের দেহগুলো ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, রক্তের স্রোতে রাজপথ লাল। মুহূর্তেই প্রাণ হারালেন ২২ জন। আরো কয়েকশ মানুষের অবস্থা শোচনীয়। মূল লক্ষ্য শেখ হাসিনাকে মানব ঢাল দিয়ে ঘিরে বুলেটপ্রুফ গাড়িতে উঠিয়ে দিলে গুলিবর্ষণ করে হত্যার শেষ চেষ্টাও বিফল হল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের চেহারা বীভৎস।
পুলিশী নিরাপত্তার বেড়াজাল পার হয়ে হামলাকারীরা পালিয়ে গেল। হামলাকারীদের পাকড়াও করার বদলে হতভম্ব মানুষের ওপর চড়াও হয়ে ঘটনাস্থলের পরিবেশকে অধিক অশান্ত করে উপস্থিত মানুষের হাতে ধরা পড়ার সুযোগটাও বন্ধ করে দিল নিরাপত্তা বাহিনী।
শেষাবধি পরিকল্পনার সব আয়োজন বিফল হল শেখ হাসিনা রক্ষা পেয়ে। রাজনীতির মোড় ঘুরতে শুরু করল। সবচেয়ে বেশি শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়াল রাষ্ট্রযন্ত্রের সংশ্লিষ্টতা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের নগ্ন ব্যবহার নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হল। সঙ্গে রাজনীতিতে দানবীয় শক্তির ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করল।
২০০৪ থেকে এখন ২০১৫। পার হয়েছে ১১ বছর। এখনো বিচার শেষ হয়নি। প্রশ্ন হল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার ‘শেষ’ হবে কবে? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা বা তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার ঘটনা ইতিহাসে কম নেই। ২১ আগস্টের গ্রেনেডের হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সত্যিই যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলেন, এতে সন্দেহ নেই। ১৫ আগস্টের বর্বরতা ঘটেছিল রাতের অন্ধকারে। কিন্তু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে। কোনো জনসভায় হামলা চালিয়ে একটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের মূল নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা চালানোর কোনো নজির স্মরণকালের আধুনিক ইতিহাসে বিরল। আগস্টের দুই রক্তপাতের মধ্যে যোগসূত্র পরিষ্কার। ১৫ আগস্টের মতোই ২১ আগস্টের ঘটনাটিও ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার চেষ্টা।
সেদিন গ্রেনেডটি যদি ট্রাকে পড়ত, তাহলে এটা শেখ হাসিনাসহ বিপুলসংখ্যক জাতীয় নেতার প্রাণ কেড়ে নিত। এটা হতো পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় বর্বরতম হত্যাকাণ্ড। গ্রেনেড হামলার পরে বিএনপি দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। তারা বিচার শুরু দূরে থাক, সুষ্ঠু তদন্তই করেনি। প্রকারান্তরে ঘটনার আলামত নষ্টের প্রয়াস চালিয়েছে। ঘটনার ১১ বছরে এসেও আহত ও নিহতদের স্বজনদের একটাই চাওয়া, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। কিন্তু তার শেষ কবে?
আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক চলতি বছরের মধ্যে ‘বিচার শেষ’ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। নৃশংসতম গ্রেনেড হামলা মামলার বর্তমান বাস্তবতা হলো, সাক্ষীর সংখ্যা ৪৯১ এবং আসামির সংখ্যা ৫২। ২০০৮ সালে বিচার শুরু হয়। গত সাত বছরে ১৭৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে চলছে সাক্ষ্য গ্রহণ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ১৮ আসামি পলাতক রয়েছেন। আশার কথা শুনিয়েছেন মামলার প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমানও। তিনি বলেছেন, চলতি বছরেই মামলার বিচার কাজ শেষ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুরনো ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন এজলাসে ঢাকার ১নং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে মামলার বিচার কাজ। সব সাক্ষীরই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলী বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্যই আগে নেওয়া হচ্ছে। তবে কত জনের সাক্ষ্য নেওয়া হবে তা আগাম বলা সম্ভব না।
মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য মতে, মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫২। এদের মধ্যে কারাগারে রয়েছেন ২৬, জামিনে ৮ আর পলাতক রয়েছেন তারেক রহমানসহ ১৮ জন। পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ইন্টারপোলে রেড অ্যালার্ট জারি করা হলেও কাউকে ফেরানো যায়নি। এদের মধ্যে দু’একজনের অবস্থান জানা গেলেও বাকিদের অবস্থানও চিহ্নিত করা যায়নি।
এ হামলায় নিহত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী বেগম আইভী রহমানসহ ২৪ জন। আহত হন প্রায় ৪০০ নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ। এদের অনেকেই এখনো শরীরে গ্রেনেডের স্পিøন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছেন। ঘটনার রাতে (২১ আগস্ট) বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের নির্দেশে তড়িঘড়ি করে মতিঝিল থানায় পুলিশ বাদি হয়ে পৃথক দুটি মামলা করে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ থানায় মামলা করতে গেলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে চারদলীয় জোট সরকার। হামলার দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় আওয়ামী লীগের ওপর। সাজানো হয় জজ মিয়া নাটক। বিষয়টি ফাঁস হয়ে পড়ায় মামলার কার্যক্রম থেকে যায় নিষ্ক্রিয়। পরবর্তীতে ওয়ান ইলেভেনের সময় ২০০৭ সালে মামলার কার্যক্রম নতুন করে শুরু হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হন সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির। কিন্তু মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তাকে বার বার হোঁচট খেতে হয়। কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার (যারা বর্তমানে মামলার পলাতক আসামি) রোষানলে পড়তে হয় তাকে। মামলার অন্যতম আসামি হামলার গ্রেনেড সরবরাহকারীর ভাই বিএনপি নেতা ও প্রাক্তন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুকে গ্রেফতার করার সময় সরাসরি তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন অনড়। তিনি কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করে ২০০৮ সালের ১১ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। শুরু হয় বিচার কাজ।
২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু প্রথম অভিযোগপত্রে গ্রেনেড সংগ্রহ, সরবরাহকারী, আক্রমণের পরিকল্পনাকারী আসামিদের শনাক্ত এবং অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনক্রমে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এবার মামলাটি অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই প্রথম অভিযোগপত্রের ২২ জন ছাড়াও তারেক রহমানসহ আরো ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সম্পূরক চার্জশিটের ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ফের বিচার শুরু হয়।
পলাতক যারা : তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, বিএনপির প্রাক্তন সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, হাফেজ ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, রাতুল বাবু, ডিএমপির প্রাক্তন ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান, ডিএমপির প্রাক্তন ডিসি (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন, মাওলানা তাজউদ্দিন (গ্রেনেড সরবরাহকারী, বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী), ঝিনাইদহের ইকবাল, মাগুরার খলিলুর রহমান, ঢাকার দোহারের জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর ও গোপালগঞ্জের মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার। তাদেরকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। আর ভারতের তিহার কারাগারে আটক রয়েছেন হুজির সদস্য আনিসুল মোরসালিন ও মহিবুল মোত্তাকিন।
জামিনে রয়েছেন আটজন : পুলিশের প্রাক্তন তিন মহাপরিদর্শক (আইজি) আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক, খোদা বকস চৌধুরী, সিআইডির প্রাক্তন তিন কর্মকর্তা রুহুল আমিন, মুন্সী আতিকুর রহমান, আবদুর রশিদ, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক এবং ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন বিএনপি নেতা কাউন্সিলর আরিফুর রহমান।
কারাগারে ২৬ জন : প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রাক্তন মহাপরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রাক্তন মহাপরিচালক আব্দুর রহিম, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ, মাওলানা ফরিদ, মুফতি আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির, হুজির প্রাক্তন আমির মাওলানা আবদুস সালাম, কাশ্মীরি জঙ্গি আব্দুল মাজেদ বাট, জঙ্গি আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, মুফতি আবদুল হান্নান মুন্সী ওরফে আবুল কালাম ওরফে আবদুল মান্নান, মহিবুল্লাহ মফিজুর রহমান ওরফে অভি, শরিফ শাহেদুল আলম বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, আবদুস সালাম পিন্টু, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ, উজ্জ্বল ওরফে রতন, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক ও বরিশালের মাওলানা আবু বকর।
শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা : শুধু একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলাই নয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কখনো নিজ বাসভবনে, কখনো জনসভায় আবার কখনো তার গাড়ির বহরে।
মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য মতে, শেখ হাসিনা প্রথম হামলার শিকার হন ১৯৮৮ সালে ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রামে। লালদীঘি ময়দানের আট দলীয় জোটের মিছিলে শেখ হাসিনাকে হত্যায় পুলিশ ও বিডিআর গুলি বর্ষণ করে। এতে সাত জন নিহত ও গুরুতর আহত হয়েছিল ৫৪ জন। ১৯৮৯ এর ১১ আগস্ট রাতে ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বরের বাসভবনে গুলি বর্ষণ ও গ্রেনেড হামলা চালায়। ১৯৯১ এর ১১ সেপ্টেম্বর টুঙ্গিপাড়া হতে ঢাকায় ফিরে গ্রিনরোডের কাছে ধানমন্ডি স্কুলে উপনির্বাচনের ভোট প্রদানের পর গ্রিনরোডে পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র ভোটের পরিস্থিতি দেখতে যান। গাড়ি হতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির কর্মীরা গুলিবর্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায়। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী ও নাটোর রেল স্টেশনে প্রবেশের মুখে তাকে বহনকারী রেল গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছে। ১৯৯৫ এর ৭ ডিসেম্বর শেখ রাসেল স্কোয়ারের নিকট সমাবেশে ভাষণ দানরত অবস্থায় শেখ হাসিনার ওপর গুলি বর্ষণ করা হয়।
১৯৯৬ এর ৭ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে শেখ হাসিনার বক্তৃতার পর হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস হইতে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে ২০ জন আহত হয়। ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পুত্রকন্যাসহ ৩১ জনকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে ই-মেইল করে ইন্টার এশিয়া টিভির মালিক শোয়েব চৌধুরী। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থলের কাছে ও হ্যালিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখেছিল। ঘটনাস্থলের কাছে শেখ লুত্ফুর রহমান ডিগ্রি কলেজ মাঠের এক সভায় প্রধানন্ত্রীর বক্তব্য রাখার কথা ছিল। ২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। জঙ্গিরা সেখানে বোমা পুঁতে রাখে যা গোয়েন্দা পুলিশ তা উদ্ধার করে।
২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেদিন রাত ৮টার দিকে জনসভাস্থল থেকে ৫০০ গজ দূরে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলেই দুই জনের মৃত্যু হয়। ২০০২ সালের ৪ মার্চ নওগাঁয় বিএমসি সরকারি মহিলা কলেজের সামনে শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে হামলা চালানো হয়। ২০০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীরা সাতক্ষীরার কলারোয়ার রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালায়। ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট শেখ হাসিনা সাতক্ষীরার চন্দনপুর ইউনিয়নের হিজলি গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার ধর্ষিতা স্ত্রীকে দেখতে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে তার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়।
২০০৪ সালের ২ এপ্রিল গৌরনদীতে শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে গুলিবর্ষণ করে জামায়াত-বিএনপি। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সেনাবাহিনী সমর্থিত ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে গ্রেফতার করেছিল। তাকে রাখা হয়েছিল জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাব-জেলে। সে সময় শেখ হাসিনার খাবারে ক্রমাগত পয়জন দিয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার একটি সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশের শত্রু রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য চুক্তি করে এবং সেজন্য আগাম পেমেন্টও প্রদান করা হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করার লক্ষ্যে একটি সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনা করা হয়েছিল যা পরে ব্যর্থ হয়ে যায়। ২০১৪ সালের শেষে দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতার জঙ্গি শাহানুর আলম ওরফে ডাক্তার। সর্বশেষ ২০১৫ এর ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার সময়ে কাওরানবাজারে তার গাড়িবহরে বোমা হামলা চালানোর চেষ্টা চালায় জেএমবি।
২১ আগস্ট সেই অপরাজনীতিরই বীভৎস উদাহরণ। অপরাজনীতির এই বীভৎস উদাহরণ যারা সৃষ্টি করেছিলেন, আজ হোক কাল হোক এর ফল ভোগ করতেই হবে। কোনো অপরাধই তার হোতাদের বাঁচতে দেয় না, তাই ২১ আগস্টেও হোতারাও পার পাবে না।

