অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : শুল্ক ফাঁকি রোধ ও আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে ভোগান্তি কমিয়ে রাজস্ব আদায় গতিশীল করতে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডাব্লিউ) প্রকল্প হাতে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পের আওতায় এনএসডব্লিউ সফটওয়্যারটি কাজে লাগাতে পারলে এক জায়গায় বসে পণ্যের শুল্কায়ন থেকে শুরু করে আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত সব তথ্য যাচাই-বাছাই করতে পারবেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। ফলে শুল্ক ফাঁকি রোধের পাশাপাশি কমবে আমদানি-রফতানিকারকদের ভোগান্তি।
এ বিষয়ে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও সমন্বিত পদ্ধতি। এ পদ্ধতি চালু চলে ব্যবসায়ীদের আর বিভিন্ন সংস্থায় দৌড়াতে হবে না। এক জায়গায় পাওয়া যাবে সব সেবা। বাংলাদেশের অনেক সংস্থা স্বয়ংক্রিয় (অটোমেশন) হয়েছে। আরো অনেক সংস্থা অটোমেশনের আওতায় আসছে। তাই সব সংস্থাকে নিয়ে ওই সফটওয়ারে মাধ্যমে এ পদ্ধতি চালু করা হবে। তবে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এ বিষয়ে এনবিআর সূত্রে জানা যায়, দেশের একজন আমদানিকারককে এখন পণ্য আমদানি করতে কমপক্ষে চারটি সংস্থায় যেতে হয়। খাদ্যপণ্য হলে সেই পণ্য পরীক্ষার জন্য যেতে হয় বাড়তি আরেকটি সংস্থায়। ওইসব সংস্থার আবার একটি নয়, একাধিক টেবিলে যায় নথি। ফলে আমদানিকারকদের প্রায় ২৫টি জায়গায় গিয়ে খালাসের প্রক্রিয়া শেষ করে পণ্য নিয়ে বন্দর থেকে ছাড় করতে হয়। এতে কখনো পাঁচ দিনের জায়গায় ২০ দিন লেগে যায়। একই অবস্থা পণ্য রফতানির ক্ষেত্রেও। তবে এনএসডব্লিউ চালু হলে এই হয়রানি আর থাকবে না। একই সঙ্গে আমদানি-রফতানিকারকদের চালানে মিথ্যা তথ্য দেওয়ারও আর সুযোগ থাকবে না। কারণ তাদের দেওয়া সব তথ্যই এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে নিতে পরবেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। ফলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শুল্ক ফাঁকির পথ বন্ধ হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির আঞ্চলিক সংযোগ কর্মসূচি ১-এর আওতায় এটি স্থাপনে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। চলতি বছরের ৯ জুন এনবিআরে এ নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় নতুন এ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সবাই একমত হন। তবে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের বেশ কিছুটা সময় লাগবে বলেও ওই সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা মতামত দেন।
এ ছাড়া সভায় ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো প্রতিষ্ঠার জন্য এনবিআরকে ‘লিড এজেন্সি’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং এনবিআরের অধীনে অন্যান্য মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও বেসরকারি ব্যবসায়ী সংগঠনের সমন্বয়ে ‘এনএসডব্লিউ ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করা হবে বলে সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ আছে।
এনএসডাব্লি উসফটওয়্যারটি তৈরি করেছে জাতিসংঘের ‘সেন্টার ফর ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যান্ড ইলেকট্রনিক বিজনেস`।
২০০৪ সালে ‘ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপ (ইউএনইসিই)’ এটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করে।
২০১২ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘ট্রেডিং অ্যাক্রস বর্ডারস’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৫০টি দেশের মধ্যে ৪৯টি দেশ এ ব্যবস্থা চালু করেছে।
২০০৮ সালের মধ্যে আসিয়ানভুক্ত দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড এ ব্যবস্থা চালু করে। অনেক দেশ শুল্কায়নে এ পদ্ধতি চালু করেছে।
এমনকি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে প্রক্রিয়াও উন্নত হয়েছে। আমদানিকারক বা রপ্তানিকারক একটি জায়গায় তার নথি জমা দেন। সব কাজ শেষ হওয়ার পর সেখান থেকেই নথি নিয়ে তিনি পণ্য খালাস বা রপ্তানি করেন। তাই বাংলাদেশেও ওই পদ্ধতি চালু হলে শুল্ক ফাঁকি কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেবার মানও অনেক বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

