বিনোদন ডেস্ক : বাংলাদেশের ছোট ও বড় পর্দায় সমান জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। পশ্চিম বাংলার সিনেমায়ও কাজ করেছেন তিনি। সম্প্রতি গুরত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় এবং মেধাবী নির্মাতা সৃজিত মূখার্জির ছবি ‘রাজকাহিনী’তেও। সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জয়া আহসানের কথায় উঠে এসেছে টলিউডে তার অবস্থান, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার, সাম্প্রতিক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এবং দুই দেশের যৌথ প্রযোজনা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা। টাইমস অব ইন্ডিয়ার সৌজন্যে পাঠকের জন্য সাক্ষাৎকারটি অনুদিত হল…
প্রশ্ন: বর্তমানে বাংলাদেশে ‘বাকস্বাধীনতা’ মানুষের প্রধান হুমকি, প্রায়শ’ই মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। এ ছবিতে আপনাকে বাকস্বাধীনতার পক্ষের একজন হিসেবে দেখা যাবে, এটা কি আপনার জন্য কখনো হুমকির কারণ হতে পারে না?
জয়া: বাংলাদেশে যা ঘটছে সত্যিই তা ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক। বাকস্বাধীনতা আমাদের জন্মসূত্রে পাওয়া, এটাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না, কেউ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ আর অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জতের বিণিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন ভূখন্ড, আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের জীবন উৎসর্গ করে একটি স্বাধীন সার্ভভৌমত্ব দেশ গড়ে গেছেন, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই প্রেক্ষাপট আজ কিছুটা বদলে গেছে। বাংলাদেশের সকল প্রগতিশীল মানুষ, মুক্তমনা বিশেষত শিল্পীরা আজ হুমকির মুখে।
প্রশ্ন: আপনি বাংলাদেশের জাতীয়পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রী, টলিউডকে আপনার কেমন লাগছে?
জয়া: সকলের আন্তরিকতায় মুগ্ধ! এখানের প্রত্যেকেই আমাকে তাদের নিজেদের একজন বলে মনে করেন।কখনো আউট সাইডার মনেই হয় না। বিশেষ করে টলিউডের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এখানে প্রত্যেক নির্মাতা, শিল্পী, টেকনিশিয়ানদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে ঋণী।
প্রশ্ন: টলিউডে আপনি কাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী?
জয়া: প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি,দেব, ঋত্বিক চক্রবর্তী, পরমব্রত চ্যাটার্জীর এবং শাশ্বত চ্যাটার্জীর সাথে কাজ করতে আগ্রহী।
প্রশ্ন: টলিউড আপনার সক্ষমতা ঠিকঠাকভাবে কাজে লাগাতে পারছে বলে মনে করেন?
জয়া: না, এতো স্বল্প সময়ে তা সম্ভব নয়। আমি সবেমাত্র এখানে আমার ক্যারিয়ার শুরু করেছি, নিজেকে আরো প্রমান করার আছে এখানে আমার। বহুদূর যেতে হবে, সবেতো শুরু করলাম। আসলে আমি অপেক্ষায় আছি একটি চ্যালেঞ্জিং রোলের, যেখানে আমি আমার সক্ষমতাটা দেখাতে পারবো। ‘আবর্ত’ ছবিটি মুক্তির পর আমার কাছে প্রায় একই ধাঁচের ছবির অফার আসে, অথচ আমি টাইপকাস্ট হতে চাই না। ফলে কিছু দিনের জন্য বিশ্রাম নিয়েছিলাম, তারপরই সৃজিত মূখার্জী তার ‘রাজকাহিনী’ ছবিটিতে একটি অসাধারণ চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব করে আমাকে। প্রস্তাবটি আমি লুফে নেই।এই ছবিটি দেখার পর দর্শকেরা আসলে বুঝতে পারবে, জয়া আহসান টাইপকাস্টিং না, ভিন্নধর্মী চরিত্রেও তিনি অভিনয়টা করতে পারেন। আসলে আমি বরাবরেই ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী, যাতে ক্রমাগত নিজের অভিনয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারি। বাংলাদেশে এমনটা হয় না, নির্মাতারা আমাকে ভিন্ন চরিত্রের জন্য কাস্ট করেন, তারা জানেন তাদেরকে আমি হতাশ করবো না।এই যেমন কিছুদিন পরেই বাংলাদেশে শুরু হওয়া একটি ছবিতে সার্কাসের মেয়ে চরিত্রে অভিনয় করবো, এবং অন্য একটি ছবিতে সুপার হিরোইন!
প্রশ্ন: টলিউডে আপনার বন্ধু-বান্ধব কি আছে?
জয়া: আমিতো মনে করি এখানে সবাই আমার ভাল বন্ধু, সৃজিতের রাজকাহিনীতে ১১ জন তারকা অভিনেত্রীদের সাথে অভিনয়ের পর তাদের সাথে এক ধরণের হৃদ্ধতা গড়ে উঠেছে। মানে শুদ্ধ বন্ধত্বতা যাকে বলে আর কি!
প্রশ্ন: প্রকৃতপক্ষে‘অবাণিজ্যিক’সিনেমার জন্যই দুই বাংলায় আপনি পরিচিত, আপনি কি সচেতনভাবে ‘বাণিজ্যিক’ ছবিগুলো এড়িয়ে যান?
জয়া: কখনোই না। তবে এটা সত্যি যে ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং মিডল-রোড সিনেমাগুলো আমার প্রধান আগ্রহের জায়গা, কিন্তু আমি অর্থবহ বাণিজ্যিক বা মেইনস্ট্রিম ছবিতেও অভিনয় করতে সমান আগ্রহী। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে ছবিগুলোর প্রস্তাব পাই, সেগুলোর স্ক্রিপ্ট এবং চরিত্র দেখে আর ইচ্ছে জাগে না। তবে অর্থবহ বাণিজ্যিক ছবি করতে অবশ্যই রাজি আছি।
প্রশ্ন: টলিউডের সাথে বাংলাদেশের সিনেমাকে কিভাবে তুলনা করবেন?
জয়া: বিশাল বাজার এবং অবকাঠামোগতভাবে টলিউড ইন্ডাস্ট্রি আগের থেকে এখন আরো পেশাদারীত্বের জায়গায় চলে গেছে। কিন্তু এইদিক থেকে আমাদের দেশের সিনেমায় প্রচুর সমস্যা আছে, থিয়েটার, প্রজেকশন সিস্টেম, পোস্টপ্রোডাকশন সুবিধাসহ নানান সমস্যার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়। কিন্তু একই সাথে এতো এতো সমস্যা নিয়েও সিনেমার জন্য আমাদের আছে অগাধ প্রেম; যা সিনেমা নিয়ে আমাদের সমস্যাগুলো ভুলিয়ে দেয়। প্রতি বছর আমাদের এখানে প্রচুর ভাল ছবি নির্মাণ হচ্ছে এখন, বাংলাদেশ সরকারও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য কাজ করছে, সিনেমার উন্নতি সাধনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। নতুন প্রজন্ম থেকে অনেক মেধাবী শিল্পী, নির্মাতা উঠে আসছে। নির্মাণ আর সিনেমার গল্পে তাদের দ্বারা এক ধরণের গুণগত পরিবর্তনের দিকেই যাচ্ছে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি।
প্রশ্ন: প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি দুই বাংলার চলচ্চিত্রের মধ্যে সমন্নয়ের চেষ্টা করছেন, এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
জয়া: এটা খুব ভালো উদ্যোগ। আমরাও চেষ্টা করছি। বুম্বাদা(প্রসেনজিৎ) ও গৌতম দা(গৌতম ঘোষ) দু্ই বাংলার চলচ্চিত্রকে সহযোগিতা করতে প্রচুর চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তাদের সাথে আমাদের বেশকিছু নির্মাতাও হাত মিলিয়েছেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে দুই বাংলা থেকেই কোনো অজানা কারণে সেই পদক্ষেপটি এগুচ্ছে না। অথচ বিশ্বে ৩৫০ মিলিয়ন মানুষ বাংলা ভাষাভাষি, যারা আমাদের সিনেমার দর্শক, এই পদক্ষেপটি কার্যকর হলে দুই দেশের বাংলা ছবিগুলো এই বিশাল সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছানো যেতো।
প্রশ্ন: কাজের প্রয়োজনে দুই বাংলাতেই সময় দিতে হয় আপনার, কিভাবে মানিয়ে নেন?
জয়া: আসলে একটু কঠিনই বটে। যখন আমি পশ্চিম বাংলায় থাকি তখন আমি বাংলাদেশে কাজ করাটা মিস করি; আবার যখন বাংলাদেশে থাকি তখন পশ্চিম বাংলাকে –মানে দো’টানা পরিস্থিতি আরকি! কিন্তু এতে আমার কোনো ক্ষোভ নেই, কারণ এই জীবনটাতো আমি স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছি!

