নিজস্ব প্রতিবেদক : এবার মাইগ্রেশন ভোগান্তিতে পড়েছে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তিচ্ছুরা। চলতি শিক্ষাবর্ষে কলেজ পরিবর্তন করেছে ৬ হাজার ৯২১ শিক্ষার্থী। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাইগ্রেট করা কলেজে সঠিকভাবে ভর্তি হতে পারছে না বলে জানা গেছে। প্রথমে সুযোগ পাওয়া কলেজে ভর্তি হয়ে আবারো অন্য কলেজে ভর্তি হওয়ায় তাদেরকে গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। তারপরও পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে না পারায় নিজেদের শিক্ষাজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্কুলের গণ্ডি পেরোনো শিক্ষার্থীরা।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী কলেজ ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তির জন্য ৪৪ ছাত্রী মনোনীত হওয়ায় তারা মাইগ্রেট করেছে। কিন্তু মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের ভর্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, নিজেদের শিক্ষার্থীদের (স্কুল শাখা থেকে যারা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে) ভর্তি করানোর পর অন্যদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এদিকে, এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল থেকে ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থী ও অভিবাবকরা। এক পর্যায়ে আধাঘণ্টার জন্য কলেজের সামনের সড়কও অবরোধ করা হয়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (বিকেল ৪টা) অভিবাবকরা সেখানেই অবস্থান করছিলেন।
মাইগ্রেট করে আসা নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তির বিষয়ে ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুফিয়া বেগম বলেন, ‘প্রথম থেকেই বলে এসেছি, নিজেদের শিক্ষার্থীদেরই আমরা প্রাধান্য দেবো। যেসব শিক্ষার্থীরা মাইগ্রেট করে আমাদের কলেজে ভর্তির জন্য এসেছে, তাদের বিষয়ে ১০ জুলাইয়ের আগে আমি কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারবো না। কারণ, আমাদের শিক্ষার্থীরা এখনো সবাই ভর্তি হতে পারেনি। আমরা আশা করছি, ওরা সবাই এখানে সুযোগ পাবে। না পেলেও তাদের ভর্তি করাবো।’
তাহলে ওই ৪৪ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কি হবে- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওদের জন্য আমার সমবেদনা রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে আসন রয়েছে ১ হাজার ১৯৪টি। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১৮১ জন। আমাদের আসন বাকি মাত্র ১৩টি। কিন্তু বোর্ড মাইগ্রেট করেছে ৪৪ জনকে। ওদের এখানে আসন দেবো কোথায়? আর এসব বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস না করে বোর্ডের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করেন। তারাই উত্তর দেবেন।’
ভিকারুননিসার অধ্যক্ষের এ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন অভিবাবকরা। বিক্ষোভরত অভিবাবক কাজী রশিদ জানান, তার মেয়ে কাজী তাহমিদা রশিদ বদরুন্নেছা কলেজ থেকে মাইগ্রেশন নিয়ে ভিকারুননিসায় ভর্তি হতে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি বদরুন্নেছা কলেজে ৯ হাজার টাকা দিয়ে মেয়েকে ভর্তি করিয়ে, তারপর মাইগ্রেশন করিয়েছি। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে প্রচণ্ড খারাপ আচরণ করছেন। তারা বলছেন- ১০ তারিখের পর তারা সিদ্ধান্ত জানাবেন। কিন্তু ভর্তির শেষ তারিখ ৮ জুলাই। এখন তো আমি আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছি।’
প্রথম মেধাতালিকায় ঢাকা সিটি কলেজে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছিল সাঈমা আক্তার। মাইগ্রেশন প্রক্রিয়ার কারণে সুযোগ পেয়ে ভর্তি হতে এসেছিল ভিকারুননিসা নুন কলেজে। কিন্তু এখানে এসে শোনে তাদের ভর্তি অনিশ্চিত।
সাঈমা বলে, ‘দেখেন আমি ২২ হাজার ২৯২ টাকা দিয়ে সিটি কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। এরপর মাইগ্রেশন আবেদন করে ভিকারুননিসায় সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু ওরা এখানে ভর্তি নিচ্ছে না। তাহলে আমার কি হবে? আমি তো এখন সিটি কলেজেও ভর্তি হতে পারবো না।’
রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার কলেজে ভর্তি হয়েছিল ফারিহা রাফ অথৈ। মাইগ্রেশনের ফলে ভিকারুননিসায় সুযোগ পেয়ে সকালেই চলে এসেছিল সে। কিন্তু এরপর থেকেই তার অপেক্ষার প্রহর চলছে, কিন্তু ভর্তি হতে পারেনি।
আবেগআপ্লুত কণ্ঠে সে বলে, ‘মাইগ্রেশন করে ভিকারুননিসায় সুযোগ পেয়েছিলাম। মনটাই আনন্দে ভরে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আমার ভর্তি নিচ্ছে না। এ অবস্থায় আমি তো আমার শিক্ষাজীবন নিয়েই চিন্তিত।’
এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক ড. আশফাকুস সালেহীন বলেন, ‘কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে আসনের যে সংখ্যা পাঠিয়েছিল, তার বাইরে আমরা অতিরিক্ত কোনো শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করি নাই। সুতরাং, ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ওই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘নীতিমালায় আমরা বলেছিলাম- নিজেদের স্কুল শাখার শিক্ষার্থীদেরকে প্রাধান্য দিতে। কিন্তু কোনোভাবেই বাইরে কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানো যাবে না, এ রকমনটা বলা হয়নি। সুতরাং নীতিমালা মেনেই ভিকারুননিসাকে চলতে হবে।’
এ বিষয়ে তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিকের সঙ্গে কথা বলেছেন জানিয়ে বলেন, ‘স্যার বলেছেন- যারা সুযোগ পেয়েছে তাদের প্রত্যেককেই ভর্তি করাতে হবে।’
ভিকারুননিসার সামনের সড়ক অবরোধ
মাইগ্রেট করে আসা ৪৪ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিবাবকরা মঙ্গলবার দুপুরে ভিকারুননিসা কলেজের সামনের সড়ক অবরোধ করেন। তারা সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় ওই এলাকায় সৃষ্টি হয় চরম যানজটের। পরে রমনা থানা পুলিশ এসে তাদেরকে সেখান থেকে উঠিয়ে দেয়। পরে তারা কলেজের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান করে।
এ বিষয়ে রমনা জোনের ট্রাফিক পরিদর্শক সানোয়ার বলেন, ‘ভর্তির সুযোগ চেয়ে তারা সড়ক অবরোধ করেছিল। পরে আমরা তাদেরকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি।’
এখনো অনিশ্চিত ৫২ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ
নানা ভোগান্তির একাদশ শ্রেণীর ভর্তিতে এখনো অনিশ্চিত ৫২ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিল ১১ লাখ ৫৬ হাজার ২৫৩ শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে প্রথম দফায় ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৩৭৪ শিক্ষার্থীর নাম মেধাতালিকায় আসে। বাকি ৬২ হাজার ৮৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় মেধাতালিকায় ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছে ১০ হাজার ৭২৬ জন। কিন্তু বাকি ৫২ হাজার ১২৪ জনকে আবারো আবেদন করতে হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষাবোর্ড।
এ বিষয়ে আশফাকুস সালেহীন বলেন, ‘আসলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই যেসব কলেজকে নিজেদের পছন্দের তালিকায় রেখেছিল, সেখানে আসন সঙ্কট থাকায় ওই ৫২ হাজার শিক্ষার্থীর নাম আসেনি। তবে তারা আবারো কোনো প্রকার ফি ছাড়াই নিজেদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে একাদশ শ্রেণীর ভর্তির ওয়েবসাইটে (www.xiclassadmission.gov.bd) আবেদন করতে হবে। ওয়েবসাইটে শূন্য আসন থাকা কলেজ দেখে নতুনভাবে আবেদন করতে হবে। এর জন্য ৯ ও ১০ জুলাই সময় বেধে দেয়া হয়েছে। তারা ৫টি থেকে সর্বোচ্চ ১০টি কলেজের পছন্দক্রম দিয়ে আবেদন করতে পারবে।’

